আবু সুফিয়ান তার বাহিনীকে মুসলিম বাহিনীর মুখোমুখি নিয়ে গিয়ে দাঁড় করায়। সে প্রথমে অশ্বারোহী সৈন্যদেরকে মুসলমানদের দু’পার্শ হতে আক্রমণ করতে প্রেরণ করে। এক পার্শ্ব হামলার নেতৃত্বে ছিলেন খালিদ নিজে আর অপর পার্শ্ব হামলার নেতৃত্বে থাকে ইকরামা। উভয়ের অধীনে ছিল ১০০ অশ্বারোহীর একটি করে বিশেষ বহর। সব অশ্বারোহীর কমান্ডার ছিল আমর ইবনুল আস। পদাতিক বাহিনীর সামনে থাকে ১০০ সুনিপুণ তীরন্দাজ। তালহা বিন আবু তালহা কুরাইশ বাহিনীর পতাকাবাহী। তৎকালে রণাঙ্গনে পতাকার গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। পতাকা ছিল প্রতিটি সৈন্যের প্রাণ-স্পন্দন। পতাকা যতক্ষণ পতপত করে উড়ত ততক্ষণ সৈন্যরা প্রাণপণ যুদ্ধ চালিয়ে যেত। আর পতাকা ভূপাতিত হলে সৈন্যদের মনোবল ভেঙ্গে যেত এবং বিদ্যুৎ গতিতে ভীত হয়ে সৈন্যরা রণে ভঙ্গ দিত।
♣♣♣
যুদ্ধের সূচনা হয়। কুরাইশদের পক্ষ থেকে আবু আমের নামক এক পাপাচারী কাতার ডিঙ্গিয়ে মুজাহিদদের অদূরে এসে দাঁড়ায়। তার পেছনে কুরাইশ গোলামদের একটি দলও ছিল। আবু আমের মূলত মদীনার বাসিন্দা। সে ছিল আউস গোত্রের সর্দার। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিজরত করে মদীনায় গেলে সে শপথ করে, যে কোন মূল্যে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মুসলমানদেরকে মদীনা থেকে বিতারিত করে ছাড়বে। সে রূপসী সুন্দরী এক ইহুদী নারীর প্রেমে পাগল ছিল। তদুপরি ইহুদীদের অর্থ-সম্পদও তাকে এ ব্যাপারে উত্তেজিত করে তুলে। ইসলাম প্রশ্নে ইহুদীদের পদক্ষেপ ছিল মারাত্মক। অবশ্য বাহ্যিকভাবে তারা মুসলমানদের সাথে আনুগত্য ও শান্তি চুক্তি করে রেখেছিল। আবু আমের ছিল এই ইহুদীদের হাতের পুতুল। ইহুদীরা সুকৌশলে তাকে কুরাইশদের মিত্র হিসেবে প্রস্তুত রেখেছিল।
মুসলিম বাহিনী কুরাইশদের বিরুদ্ধে লড়তে মদীনা থেকে রওয়ানা করলে আবু আমের কুরাইশদের কাছে চলে যায়। আউস গোত্রের অনেকেই ইতোমধ্যে ইসলাম গ্রহণ করেছিল। মুসলিম বাহিনীর পক্ষে যুদ্ধ করতে তারা কাতার বন্দী হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। আবু আমের মুসলিম বাহিনীর মধ্যে তার গোত্রের লোকদের কাছে গিয়ে উচ্চ আওয়াজে তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
‘আউস গোত্রের আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন বীর সন্তানেরা।” আর আমের বলে –“নিঃসন্দেহে আমার পরিচয় তোমরা ভাল করে জান। আমার কথা মন দিয়ে শোন এবং …।”
তার কথা শেষ না হতেই মুজাহিদ বাহিনীর মধ্য থেকে আউস গোত্রের এক বীর মুজাহিদ এই বলে গর্জে ওঠে যে, “পাপীষ্ঠ, নরাধম চুপ কর। তোর নামের উপর আমরা থু থু ফেলি।”
খালিদের দৃষ্টিতে ভেসে ওঠে একটি দৃশ্য। আবু আমের আর তার সাথে গমনকারী গোলামদের প্রতি বৃষ্টির ন্যায় পাথর বর্ষিত হওয়ার কথা তার আবার স্মরণ হয়। ঐতিহাসিকদের মতে, মুসলিম বাহিনী হতে আউস গোত্রের লোকেরাই এই পাথর বর্ষণ করে। পাথরের তীব্র আঘাত সহ্য করতে না পেরে আবু আমের ও তার সাথের গোলামরা দ্রুত চলে যেতে বাধ্য হয়।
ইহুদীরা উত্তেজনায় সময় ক্ষেপণ করছিল। যুদ্ধের গতি ও ফলাফল জানতে তারা ছিল অধীর আগ্রহী। আবু আমের যে ইহুদী রমণীর রূপের জাদুতে বন্দী ছিল সে আবু আমেরের মাধ্যমে তার মিশন সফল হওয়ার সংবাদ শুনতে অত্যন্ত উদগ্রীব ছিল। সে তখনও জানতনা যে, তার রূপ-যৌবনের যাদু মুসলমানরা অনেক আগেই পাথর বর্ষণ করে উড়িয়ে দিয়েছে। তার ইন্তেজার অর্থহীন।
আবু আমেরের এই ঘটনার পূর্বে কুরাইশদের সাথে আগত গায়িকারা সুমধুর সুরে গান পরিবেশন করে। বদরে নিহতদের বীরত্ব আর ত্যাগের বর্ণনায় ভরপুর ছিল গানের কথাগুলো। নর্তকীরা এমন ভঙ্গিতে নিহতদের বিবরণ তুলে ধরে, যার প্রতিটি শব্দই শ্রোতাদের রক্তে আগুন ধরিয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। তাদের অনেকেই জ্বালাময়ী ভাষণের মাধ্যমেও কুরাইশদের বীরত্বে বিস্ফোরণ আর রক্তে তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল।
নর্তকীদের পর্দার অন্তরালে চলে যাবার নির্দেশ হয়। মঞ্চে আসে আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দা। চমৎকার ঘোড়ায় আরোহী। কণ্ঠে আকর্ষণীয় গান। তার কণ্ঠ যেমন ছিল উচ্চকিত তেমনি সুরের মধ্যেও ছিল বেশ আকর্ষণ। ঐতিহাসিকগণ তার গানের কলিগুলো না লিখলেও সবাই এটা বর্ণনা করেছেন যে, তার গান ছিল অশ্লীলতায় ভরপুর। নারী-পুরুষের গোপন বিষয়ের বিবরণ ছিল তার সঙ্গীতে। ইতিহাসে তার গানের কলির মধ্যে আব্দুদ্দার নামক এক ব্যক্তির আলোচনা আছে। এর দ্বারা উদ্দেশ্য বনু আব্দুদ্দার কওম। তৎকালে এই গোত্রটি কুরাইশ বংশের একটি সম্ভ্রান্ত গোত্র হিসেবে পরিগণিত ছিল। বনু উমাইয়া এই গোত্রেরই একটি বিশেষ শাখা। হিন্দা সুরের মূর্ছনায় গেয়ে চলছিল:
আব্দুদ্দারের সূর্য সন্তানেরা
পরিবারের কর্ণধারেরা
আমরা আঁধার রাতের সঙ্গিনী
চার দেয়ালের ভিতরে আমরা জাদু দেখাই
এই জাদু খুবই তৃপ্তিদায়ক এবং দারুণ উপভোগ্য।
শত্রুর উপর ঝাঁপিয়ে পড়লে আমাদের বক্ষ তোমাদের জন্য উৎসর্গিত
পৃষ্ঠ প্রদর্শন করলে আমরা তোমাদের কাছেও আসবনা।
♣♣♣
এরপর আবু আমের আউস গোত্রকে বিভ্রান্ত করতে যায়। কিন্তু আউস গোত্র তীর দ্বারা তাকে জবাব দিলে সে চরম ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসে। সে ফিরে আসতেই কুরাইশরা মুজাহিদদের উপর তীর বর্ষণ করতে থাকে। মুজাহিদরাও তীরের জবাব তীর দ্বারাই দিতে থাকে। খালিদ মুসলিম বাহিনীর উপর আক্রমণ করতে তার অধীনস্থ একশ অশ্বারোহী নিয়ে দ্রুতগতিতে অগ্রসর হন। পাহাড়ের উপরিভাগে মুসলিম তীরন্দাজ বাহিনীর গোপন অবস্থানের কথা তার জানা ছিল না। তীব্রগতিতে অগ্রসর হচ্ছিল তার বাহিনী। সুড়ঙ্গ ছিল সংকীর্ণ। একত্রে এ পথ অতিক্রম করা সম্ভব ছিল না। ফলে বাধ্য হয়ে অশ্বারোহীদেরকে লাইন বেঁধে এক একজন করে পথ চলতে হত।
