নিরাপত্তা রক্ষীরা চলে গেলে কেল্লার মুখ খুলে যায়। কিন্তু সায্যাহ এর অভ্যর্থনার জন্য সেখানে মুসাইলামা ছিল না। তার নির্দেশে দরজায় দাঁড়ানো দুই ঘোড় সওয়ার তাকে কেল্লার আঙ্গিনায় নিয়ে যায়। সেখানে বৃত্তকার একটি তাবু স্থাপিত ছিল। তার আশে-পাশে বড় বড় এবং চারাগাছ ছিল। নিচে ছিল সতেজ শ্যামলিমা ঘাস। সায্যাহকে তাঁবুতে আসন গ্রহণ করতে বলা হয়। অভ্যন্তরের সাজ-সজ্জা তাকে অভিভূত করে দেয়। তবে মুসাইলামা সেখানে ছিল না। সায্যাহ তাঁবুতে বসে পড়ে।
ক্ষাণিক পর মুসাইলামা তাঁবুতে প্রবেশ করে। সায্যাহ তাকে দেখে মুচকি হাসে। সে হাসিতে বিদ্রুপ মাখানো ছিল। মুসাইলামার মত কুৎসিত চেহারার মানুষ ইতোপূর্বে তার নজরে পড়েনি। এমন খর্বাকৃতির মানুষ কালে-ভদ্রে নজরে পড়ে থাকে।
“আপনি নবুওয়াতের দাবী করেছেন?”—সায্যাহ তাকে বিদ্রুপের ভঙ্গিতে জিজ্ঞাসা করে।
“দাবীর বিষয়টি ভিন্ন প্রসঙ্গ!”—মুসাইলামা সায্যাহ এর চোখে চোখ রেখে বলে—“তবে এটা নিশ্চিত করে বলতে পারি যে, আমি আল্লাহ্র প্রেরীত রাসূল। মুহাম্মাদকে আমি রাসূল বলে স্বীকার করি না। কিন্তু সে কৌশলে তার নবুওয়াত সুপ্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছে। জনতা তাকে এই জন্য রাসূল মানে যে, কুরাইশদের সংখ্যা বেশী এবং তাদের শক্তিও প্রচুর। তারা এখন অন্যান্য এলাকা অধিকার করতে শুরু করেছে।”
ঐতিহাসিক তাবারী কয়েকটি সূত্রের বরাত দিয়ে লেখেন, মুসাইলামা সায্যাহ-এর চোখে নিজের চোখাস্ত্র নিক্ষেপ করে। ঠোঁটে নাচতে থাকে হৃদয়কাড়া মুচকি হাসি। অনেক দিন পর সায্যাহ মুসাইলামার ঐ দৃষ্টিপাতের ব্যাপারে মন্তব্য করতে গিয়ে খোলামেলা ভাষায় স্বীকার করে যে, মুসাইলামা তার ক্ষুদ্রাকৃতি চোখ আমার চোখে রাখলে আমার মনে হতে থাকে খর্বাকৃতির কোন ছায়া এবং কুৎসিত একটি চেহারা তরল পদার্থ হয়ে চোখের রাস্তা দিয়ে ভেতরে ক্রমে নেমে আসছে। তার এই অদ্ভুত ও অর্থপূর্ণ চাহনী আমাকে নিশ্চিত করে এ লোক আমাকে হত্যা করবে না। আরো কিছুক্ষণ এভাবে থাকলে আমার মনে হচ্ছিল নিজের অস্তিত্ব বিলুপ্ত করে হয়ত এখনই আমি তার মাঝে বিলীন হয়ে যাব।
“আপনি নবী হয়ে থাকলে কোন ঐশী কথা বলুন”—সায্যাহ তাকে বলে।
“আপনার জন্ম বৃত্তান্ত নিয়ে আপনি কখনো ভেবেছেন?” মুসাইলামা কবিতা আওড়ানোর ভঙ্গিতে বলে—“আপনি সম্ভবত এটাও ভাবেননি যে, আপনি যেভাবে সৃষ্টি হয়েছেন আপনার থেকেও এভাবে অনেকে সৃষ্টি হতে পারে। কিন্তু আপনার একার পক্ষে তা সম্ভব নয়…। এ তথ্য আমার প্রভুই আমাকে জানিয়েছেন। মুসাইলামা তাকে কুরআনের আয়াতের মত কিছু শব্দ শোনায়।—“তিনি এক জীবিত সত্তা থেকে আরেক জীবন সৃষ্টি করেন। পেট থেকে, নাড়িভুড়ি থেকে। আল্লাহু তা’আলা আমাকে আরো জানিয়েছেন, নারীরা পাত্রের মত। যাতে কোনকিছু রেখে আবার বের করা হয়। এমনটি না হলে সে পাত্র অনর্থক।”
সায্যাহ অভিভূত হতে থাকে। সে সম্মোহনীর মত তার কথা গিলতে থাকে। মুসাইলামা কবির ভাষা-ভঙ্গিমায় কথা চালিয়ে যায়। সায্যাহ ঘুণাক্ষরেও টের পায় না যে, মুসাইলামা তার আবেগ চাঙ্গা ও উজ্জিবীত করে চলেছে। সে তার কথায় এত তন্ময় হয়ে যায় যে, কখন যে সূর্য ডুবে গেছে তার খেয়ালই করেনি।
“আমার বিশ্বাস, আপনি আজকের রাতটি এখানে থেকে যেতে চাইবেন”— মুসাইলামা বলে—“চেহারার বিচারে নিঃসন্দেহে আপনি দিন আর আমি রাত। কিন্তু ভাবা উচিত, দিনের উপর রাতের প্রাধান্য পাওয়ার কারণ কি? দিন তার বুকের ধন সূর্যকে রাতের কোলে কেন ছেড়ে দেয়। এটা প্রতিদিনের চিত্র। এর জন্য সুনির্দিষ্ট ক্ষণ-সময় রয়েছে। রাতের এ শক্তি নেই যে, সে সূর্যের ঔজ্জ্বলতা আর দীপ্তিকে হজম করে ফেলবে। রাতের কোলে ঘুমিয়ে পড়া সূর্যকে বড় আদর করে জাগিয়ে সে পর প্রভাতের জন্য পূর্বাচলে রেখে আসে। যেন ঠিক সময়ে উঠে দিনের যাত্রা অব্যাহত রাখতে পারে।”
“ঠিক বলেছেন আপনি”—সায্যাহ অভিভূতের মত বলে—“আমার অন্তর চায়, আমি আপনাকে সত্য নবী মেনে নিই। এত কদাকার পুরুষ কখনো এমন সুন্দর ও বাস্তবসম্মত কথা বলতে পারে না। এটা অদৃশ্য কোন শক্তির কারবারই হবে, যে আপনার মুখ থেকে এমন সুন্দর কথা বলাচ্ছে। হঠাৎ সে চমকে উঠে বলে—“সূর্য অস্ত গেছে। এখন আমি কেল্লার প্রাচীরে দাঁড়িয়ে আমার নিরাপত্তা বাহিনীকে যদি না জানাই যে, আমি জীবিত আছি তাহলে তারা এ বসতির অলি-গলিতে রক্তের নদী বইয়ে দিবে।”
মুসাইলামা দু’বডিগার্ড দিয়ে তাকে কেল্লার প্রাচীরে পাঠিয়ে দেয় এবং তাঁবুর বহ্নিদানী জালিয়ে দিতে খাদেমদের নির্দেশ দেয়। রঙিন ঝাড়বাতিও জ্বলে উঠে। অপরূপ আলোর ঝলকে হেসে ওঠে পুরো তাবু। তাঁবুর গাম্ভীর্য ও আকর্ষণশক্তি আরো বৃদ্ধি পায়। যে কোন চোখ ধাধানো এবং হৃদয়ে তোলপাড় সৃষ্টির জন্য তাবুটি ছিল একশভাগ সার্থক। সায্যাহ এর আবেগকে আরো উত্তাল এবং তাকে আরো প্রভাবিত করতে মুসাইলামা বহ্নিদানীতে ক্ষুদ্রাকৃতির কি যেন দেয়।
ক্ষণিকের মধ্যে কামরা মাতাল করা ঘ্রাণে মৌ মৌ করে ওঠে। সারা কক্ষ খুশবুতে ছাপিয়ে যায়।
সায্যাহ তাঁবুতে ফিরে এলে এক অবর্ণনীয় মাদকতায় তার মন মানসিকতা আচ্ছন্ন হয়ে যায়। সে নিজ অবস্থান ভুলে সাধারণ নারীর মত আবেদনপূর্ণ কথা বলতে থাকে। তার কণ্ঠে আগের সেই দৃঢ়তা ছিল না। সেখান থেকে এখন অনুনয় ঝরে পড়ছিল। মুসাইলামা এই অবস্থা থেকে পূর্ণ ফায়দা উঠায়।
