সায্যাহ এ শর্ত মেনে নেয় এবং নেতৃস্থানীয় লোকদের মুক্ত করে ঐ এলাকা থেকে প্রস্থান করে। নেতারা সায্যাহ এর কাছে পরবর্তী গন্তব্য জানতে চায়।
ইয়ামামাহ”—সায্যাহ উত্তরে বলে—“সেখানে মুসাইলামা বিন হাবীব নামে একজন লোক আছে। সেও নবুওয়াতের দাবী করছে। তাকে তরবারীর মাথায় রাখা জরুরী।
“কিন্তু ইয়ামামাহ এর লোকজন যুদ্ধ-বিগ্রহ সম্পর্কে বড় পাকা”—এক নেতা সায্যাহকে বলে—“আর মুসাইলামাও বিরাট শক্তিধর।”
সায্যাহ নেতার কথায় কান না দিয়ে কিছু পংক্তি আওড়ায়। যাতে সে সৈন্যদের জানিয়ে দেয় যে, আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ইয়ামামাহ।
মুসাইলামা কাজ্জাবের গোয়েন্দা বহু দূর এলাকা পর্যন্ত ছড়িয়ে ছিল। চৌকস গোয়েন্দারা যথাসময়ে মুসাইলামাকে অবহিত করে যে, একটি বাহিনী ইয়ামামাহ অভিমুখে ছুটে আসছে। মুসাইলামা অতি শীঘ্র এ ধেয়ে আসা বাহিনীর পরিচয় উদ্ধার করে যে, তারা সায্যাহ এর লস্কর। সে আররিযালকে তৎক্ষণাৎ ডেকে পাঠায়।
“শুনেছ সায্যাহ এর লস্কর আসছে আররিযাল?” মুসাইলামা বলে—“কিন্তু তার সাথে সংঘর্ষে যাওয়ার ইচ্ছা আমার নেই। তোমার জানা আছে যে, এ এলাকায় মুসলিম বাহিনী আছে। হযরত ইকরামা রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদের সিপাহসালার। এ পরিকল্পনা কি যথার্থ নয় যে, সায্যাহ আর ইকরামা বাহিনী পরস্পরের মুখোমুখী হোক। তারা যখন একে অপরের মুণ্ডুপাতে তৎপর হবে ঠিক ঐ মুহূর্তে আমি আমার বাহিনী নিয়ে উভয় পক্ষের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ব এবং চূড়ান্ত বিজয় সূচিত হবে আমাদের।”
“তারা পরস্পরে মুখোমুখী না হলে তখন কি করবেন?” আররিযাল জিজ্ঞাসা করে।
“তখন সায্যাহ এর প্রতি বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিব”—মুসাইলামা নিরুদ্বেগে জবাব দেয়।
আররিযালের ধারণাই সঠিক হয়ে সামনে আসে। সায্যাহ আর ইকরামার ফৌজ পরস্পরের ব্যাপারে অনবহিত ছিল। এদিকে সায্যাহ আসতে আসতে ইয়ামামাহ এর কাছে চলে আসে প্রায়। মুসাইলামা এক দূত মারফৎ সায্যাহ এর বরাবর এই বার্তা প্রেরণ করে যে, পরস্পরের মধ্যে সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য সে যেন মুসাইলামার বাসভবনে আসে। সায্যাহ দূতকে জানায় যে, সে অচিরেই আসছে। সায্যাহ রওয়ানা হতেই মুসাইলামা শক্তিশালী গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে জানতে পারে যে, সে স্বসৈন্যে আসছে। মুসাইলামা তৎক্ষণাৎ সায্যাহ-এর কাছে এ বার্তা প্রেরণ করে যে, সৈন্যদের সাথে নিয়ে এলে বুঝব তুমি মৈত্রী চুক্তির নিয়তে আসছ না। ঊর্ধ্বে কয়েকজন নিরাপত্তা কর্মী আনতে পার মাত্র।
“সম্মানিত রাসূল!” মুসাইলামার এক সভাষদ তাকে বলে—“শুনেছি সায্যাহ এর সৈন্য এত বিশাল যে, তারা ইচ্ছা করলে ইয়ামামাহর একেকটি ইট খুলে ফেলতে পারে।”
“এটাও শুনেছি, আরেক সভাষদ বলে—“যে, সে হত্যা, ত্রাস এবং লুটতরাজ করতে করতে সামনে অগ্রসর হয়। তার করাল গ্রাস থেকে সেই নিরাপদ থাকে যে তার নবুওয়াত মেনে নেয়।”
“তোমরা আমাকে ভয় দেখাচ্ছ?” মুসাইলামা জিজ্ঞাসা করে—“তোমাদের বক্তব্যের উদ্দেশ্য কি আমাকে এই পরামর্শ দেয়া যে, নবুওয়াতের দাবী হতে সরে এসে আমি যেন তার নবুওয়াত স্বীকার করে নিই?”
“না, আল্লাহর রাসূল!” সভাষদের আসন থেকে জওয়াব আসে—“আমরা সতর্কতার কথা বলছি মাত্র। আমাদের অজান্তে সে যেন কোন অঘটন না ঘটিয়ে বসে।”
মুসাইলামা সভাষদের এ কথায় ফিক করে হেসে উঠে বলে—“আমার কদাকার চেহারা দেখে সম্ভবত তোমরা আমাকে এই পরামর্শ দিচ্ছ। এমন কোন নারীর কথা বলতে পার যে আমার কাছে এসেছে অথচ আমার ভক্ত হয়ে যায়নি?…সায্যাহকে আসতে দাও। সে আসবে কিন্তু যাবার নাম বলবে না এবং জীবিতও থাকবে।”
সায্যাহ সৈন্য ছাড়াই এসে পড়ে। ইয়ামামাহ্র জনতা তাকে এক নজর দেখে অভিভূত হয়ে যায় এবং চতুর্দিক হতে আওয়াজ ওঠে—“এত রূপসী এবং লাবণ্যময় নারী ইতোপূর্বে কখনো দেখিনি।…সৌন্দর্যের ভিত্তিতে নবুওয়াত পাওয়ার হলে এ নারী তার যথার্থ উপযুক্ত।”
সায্যাহ-এর সাথে চল্লিশজন দেহরক্ষী ছিল। সকলেই আরবি উন্নত জাতের তাজি ঘোড়ায় আসীন। সবাই সুদর্শন এবং টগবগে। কোমরে তরবারী ঝুলছিল সবার। হাতে শোভা পাচ্ছিল চকচকে বর্শা।
সায্যাহ কেল্লার প্রধান ফটকে পৌঁছলে দরজা বন্ধ ছিল। তাকে দেখেও কেউ দরজা খুলে না।
“মেহমানকে বাড়িতে দাওয়াত দিয়ে ডেকে এনে ঘরের দরজা বন্ধ করে রাখে যে ব্যক্তি সে কিভাবে আল্লাহর রাসূল হতে পারে?” সায্যাহ জোরকণ্ঠে বলে—“তার কি জানা নাই যে, এভাবে সে স্পষ্ট ঐ নারীকে অপমান করছে আল্লাহ্ যাকে নবুওয়াত দান করেছেন?”
“সম্মানিত অতিথিনী!” কেল্লার উপর থেকে একটি কণ্ঠ শোনা যায়—“আপনি সুখী ও দীর্ঘজীবি হউন। আমাদের রাসূল নিরাপত্তা রক্ষীদের বাইরে থাকতে এবং মেহমানদের ভেতরে যেতে বলেছেন।”
“দরজা খুলে দাও”—সায্যাহ নির্ভীকচিত্তে নির্দেশ দিয়ে নিরাপত্তা রক্ষীদের বলে—“তোমরা কেল্লা হতে অনেক দূরে চলে যাও।”
“কিন্তু এক অজানা ব্যক্তির উপর আমরা কিভাবে আস্থা রাখতে পারি?”—নিরাপত্তা বাহিনী প্রধান বলে।
“সূর্যাস্ত নাগাদ আমি না ফিরলে এই কেল্লাকে ছাতু বানিয়ে ফেলবে”— সায্যাহ বলে—“নগরের একটি বাচ্চাকেও জ্যান্ত রাখবে না। মুসাইলামা এবং তার পরিবারবর্গের তাজা রক্তে আমার লাশ স্নাত করে এখানে কোথাও সমাহিত করবে।…তবে আমার বিশ্বাস, আমি কেল্লা হতে বিজয়িনীর বেশে বের হব।”
