আররিযাল একজন সাহাবী ছিলেন। ফলে মুসলমানরা তার কথায় সহজেই আস্থা স্থাপন করে। বনূ হানীফার সাথে আররিযালের ঘনিষ্ট সম্পর্ক ছিল। আররিযালের নতুন ঘোষণা শুনে বনূ হানীফা দলে দলে মুসাইলামাকে আল্লাহ্র রাসূল বিশ্বাস করে তার হাতে বাইয়াত গ্রহণ করতে থাকে।
ঐতিহাসিকদের অভিমত, মুসাইলামা এ কারণে আররিযালকে হত্যা করে না যে, আররিযাল যেমন প্রাজ্ঞ আলেম ছিল তেমনি সাহাবীও ছিল। ফলে তার ধারণা ছিল, এমন ব্যক্তিকে হত্যা না করে তাকে কব্জা করতে পারলে তার ভক্তকুলের সংখ্যা দারুণ বৃদ্ধি পাবে। ফলে মুসাইলামা আররিযালকে হাত করতে বহ্নিদানী এবং জবানের যাদু চালায়। আররিযাল মুসাইলামার যাদুতে এমনভাবে ফেঁসে যায় যে, সে রীতিমত তার দক্ষিণ হস্তে পরিণত হয়। ভণ্ডামীর নয়া দিগন্ত উন্মোচিত হয়।
আররিযালের সুবাদে মুসাইলামার মিথ্যা নবুওয়াতে নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়।
ভণ্ডামী নতুন গতি পায়। মুসাইলামার জনপ্রিয়তা একধাপ এগিয়ে যায়। ভণ্ডামীর ইতিহাস নতুন দিগন্তে মোড় নেয়। আররিযাল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে থাকাকালে দেখেন যে, পিতা-মাতা তাদের নবজাত সন্তানদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আনলে তিনি বাচ্চাদের মাথায় স্নেহভরে হাত বুলিয়ে দিতেন। আররিযাল মুসাইলামাকেও এভাবে বাচ্চাদের মাথায় হাত বুলাতে পরামর্শ দেয়। আররিযালের এই পরামর্শ মূসাইলামার মনঃপুত হয়। সে কয়েকটি শিশুর মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। ঐতিহাসিকগণ লেখেন, শিশুকালে যাদের মাথায় মুসাইলামা হাত বুলিয়ে দেয় তারা বড় হলে তাদের মাথার চুল শীতকালের গাছের পাতার মত ঝরে যায়। চকচকে টাক পড়ে যায় সবার মাথায়। একটি চুলও সেখানে অবশিষ্ট ছিল না। মুসাইলামা ততদিনে মরে ভূত হয়ে গিয়েছিল।
॥ আট ॥
ইসলামের এ ক্রান্তিলগ্নে এক মহিলাও মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। ময়দান উর্বর মনে করে সেও নবুওয়াতের দাবী করে। মহিলার নাম সায্যাহ। জনৈক হারেছের কন্যা। উম্মে সাদরাহ বলেও মহিলাটির পরিচিতি ছিল। তার মাতা ইরাকী এবং পিতা বনূ ইয়ারবু এর অন্তর্গত ছিল। হারেছ ছিল গোত্র প্রধান। সায্যাহ শৈশবকাল থেকেই নির্ভীক এবং স্বাধীনচেতা ছিল। নেতৃস্থানীয় বংশে তার জন্ম ও প্রতিপালন হওয়ায় অন্যদের উপর হুকুম চালানো তার বৈশিষ্ট্য ও স্বভাবের অন্তর্গত ছিল। অস্বাভাবিক মেধা এবং বিচক্ষণ ছিল সে। দু’এক ঐতিহাসিকের মত হলো, সে অদৃশ্য জ্ঞানও রাখত এবং দূর ভবিষ্যতে কি ঘটবে না ঘটবে আগাম বলে দিতে পারত। তার ব্যাপারে ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিভিন্ন প্রসঙ্গে মতান্তর থাকলেও সবাই এ ব্যাপারে একমত যে, সায্যাহ জন্মগতভাবে কবি ছিল। যে কোন কথা ছন্দবদ্ধ আকারে পেশ করতে পারত। তার জবান ছিল অতিশয় সুমিষ্ট এবং আকর্ষণীয়। তার মাতা খ্রিস্টান বংশের থাকায় সায্যাহও খ্রিস্টধর্ম অবলম্বন করে।
তোলাইহা এবং মুসাইলামা নবুওয়াতের দাবী করেছে শুনে এবং মানুষ দলে দলে তাদের হাতে বাইয়াত হচ্ছে জেনে সায্যাহও নবুওয়াতের দাবী করে। কৈশোর পেরিয়ে সে এখন টগবগে তরুণী। অন্যান্য গুণাবলীর সাথে আল্লাহ তাকে অপূর্ব সুন্দরীও করেছিল। তার আপাদমস্তক এবং চেহারায় এমন ঝলক ও দীপ্তি ছিল যে, মানুষ তাকে দেখে সম্মোহনীর মত তাকে নবী বলে মেনে নিত। অনেকে তার কাব্য প্রতিভা দেখেও মোহিত হয়।
সে নবী হয়েই কেবল বসে থাকে না। নিজ অনুসারী এবং ভক্তদের নিয়ে একটি ফৌজ তৈরী করে বনূ তামীমের কাছে যায়। এ গোত্রের নেতারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক নিযুক্ত ছিল। যাবারকান বিন বদর, কায়েস বিন ‘আসেম, ওকী ইবনে মালেক এবং মালিক বিন নাবীরা ছিল তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। সায্যাহ মালিক বিন নাবীরাকে ডেকে বলে যে, সে মদীনা আক্রমণ করতে এসেছে। বনূ তামীমের সহযোগিতা তার একান্ত প্রয়োজন।
মালিক বিন নাবীরা জানায় যে, কয়েকটি গোত্র সায্যাহকে পছন্দ করে না। প্রথমে তাদেরকে অধীন করতে হবে। সায্যাহ অধীন করার অর্থ বুঝতে পারে না। তার অধীনে উল্লেখযোগ্য এবং বাছাইকরা সৈন্য ছিল। মালিক তার সৈন্যের সাথে নিজের সৈন্য মিলিয়ে দেয় এবং যারা তাকে সমর্থন করে না তাদের গোত্রে আক্রমণ করে। গোত্রগুলো এক এক করে তার সামনে হাতিয়ার সমর্পণ করে দেয়। সায্যাহ তাকে নবী বলে মেনে নেয়ার দাবী করার পরিবর্তে অস্ত্রসমর্পণকারীদের ঘর-বাড়িতে অবাধ লুটপাট চালায় এবং তাদের গবাদি পশু ছিনিয়ে নেয়। এই মালে গনিমত পেয়ে তার সৈন্যরা বেজায় খুশী হয়।
তার লুটপাটের খবর দূর-দূরান্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। সায্যাহ নাবায নামক এক এলাকায় পৌঁছে স্থানীয় বসতিতে ব্যাপক লুটতরাজ চালায়। কিন্তু ক্ষণিকের মধ্যে বসতির লোকজন সুসংঘবদ্ধ হয়ে রুখে দাঁড়ায় এবং সায্যাহ বাহিনীকে পরাস্ত করে। সায্যাহ পুনরায় ঘুরে দাঁড়াতে চায় কিন্তু একটি দুর্বলতা তার ইচ্ছা রুখে দেয়। পরাজয়কালে তার কিছু নেতৃস্থানীয় সৈন্যকে নাবায গোত্রের লোকেরা বন্দীশালায় আটকে রেখেছিল। সায্যাহ তাদের মুক্ত করতে এক দূত প্রেরণ করে।
“আগে এই এলাকা ছেড়ে চলে যাও”, গোত্রের শীর্ষ নেতা দূতকে বলে— “এলাকা ছেড়ে গেলেই তোমাদের বন্দীদের মুক্ত দেখতে পাবে।”
