তার দরবার জান্নাতের সাজে সজ্জিত ছিল। সুন্দরী-রূপসী তন্বী তার ডানে-বামে বসা ছিল। পিছনেও ছিল দু’জন দাঁড়িয়ে। মুসাইলামা কোন ললনার রেশমী চুলে আঙ্গুল ঢুকিয়ে কারো নিটোল তুলতুলে রক্তাভ গালে হাত বুলিয়ে এবং কারো উরুতে হাত রেখে কথাবার্তা বলত।
এক ব্যক্তি দরবার কক্ষে প্রবেশ করে। সে না বসে দাঁড়িয়ে থাকে। সকলের দৃষ্টি তার দিকে ঘুরে যায়। মুসাইলামা তার দিকে তাকানোর আদৌ প্রয়োজন অনুভব করে না। তার জানা ছিল, কারো অনুরোধ ছাড়াই লোকটি বসে পড়বে। কিন্তু আগন্তুক দাঁড়িয়েই থাকে।
“তুমি আমাদের পাহারা দিতে এসেছ?” মুসাইলামা আগন্তুককে বলে, “নাকি আল্লাহর রাসূলের অনুমতি ব্যতিরেকে বসাকে তুমি অভদ্রতা মনে করছ।”
“আল্লাহর রাসূল!” আগন্তুক বলে—“আমি একটি খবর দিতে চাই।…মদীনা হতে একজন লোক এসেছে। সে অনেক দিন থেকে এখানে আছে। যারা ইতোপূর্বে কোন সময় ইসলাম গ্রহণ করেছিল লোকটি তাদেরকে এ কথা বুঝতে চেষ্টা করছে যে, একমাত্র সত্য রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। বাকী সমস্ত নবুওয়াতের দাবীদার ভণ্ড এবং মিথ্যুক। আমি নিজ কানে তার কথা শুনেছি। তার নাম নাহারুর রিযাল।”
“নাহারুর রিযাল?” দরবারে উপবিষ্ট দু’ব্যক্তি একযোগে চুমকে উঠে নামটি উচ্চারণ করে। অতঃপর একজন বলে—“সে মুসলমানদের রাসূলের অত্যন্ত প্রিয়পাত্র। আমি তাকে ভাল করে চিনি। লোকটি বড় বিদ্বান।
“এমন ব্যক্তিকে জীবিত রাখা ঠিক নয়”—দরবারে বসা এক ব্যক্তি গর্জে উঠে বলে।
“হে আল্লাহর রাসূল!” আরেক ব্যক্তি বসা থেকে দাড়িয়ে বলে—“আপনি অনুমতি দিলে তার মাথা কেটে এনে আপনার পায়ের কাছে রাখব।”
“না”—মুসাইলামা কাজ্জাব বলে—“সে আলেম হয়ে থাকলে এবং কুরআন সম্বন্ধে জ্ঞান রাখলে আমি তাকে দরবারে এসে আমাকে মিথ্যা প্রমাণিত করতে আহ্বান করব। আমি তাকে নিহত হতে দিব না।…কাল রাতে তাকে আমার কাছে আনবে। তাকে আমার পক্ষ হতে নিশ্চয়তা দিবে যে, তাকে আর যাই হোক হত্যা করা হবে না।”
আররিযালকে মুসাইলামার জনৈক ব্যক্তি জানায় যে, আল্লাহর রাসূল মুসাইলামা বিন হাবীব তার দরবারে তাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে।
“সে আমার হত্যার ব্যবস্থা এদিকে কোথাও করতে পারে না?” আররিযাল বলে—“আমি তাকে আল্লাহর রাসূল বিশ্বাস করি না। তার নির্দেশ পালন করা আমার পক্ষে জরুরী নয়।”
“সে যেখানে ইচ্ছা তোমাকে হত্যা করাতে পারে” মুসাইলামার দূত বলে—“তার এ শক্তিও রয়েছে যে, তার এক ফু-তে তোমার দেহ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে। কিন্তু তার ইচ্ছা তোমাকে হত্যা করা নয়; বরং জীবিত রাখা এবং সম্মানের সাথে বিদায় করা।”
মুসলমানরাও আররিযালকে মুসাইলামা কাজ্জাবের দরবারে না যাবার পরামর্শ দেয়।
“এটা আমার জীবন ও মৃত্যুর কোন প্রশ্ন নয়”—আররিযাল বলে—“এটা সত্য-মিথ্যার প্রশ্ন। এক মিথ্যাবাদীর চোখের সামনে সত্যের পতাকা তুলে ধরতে আমার প্রাণ চলে গেলেও তা বেশী চড়া মূল্যের হবে না।”
“আমি অবশ্যই যাব”—আররিযাল দূতকে জানিয়ে দিয়ে বলে—“আজ রাতেই আসব। মুসাইলামাকে বলবে, সে সত্যবাদী হয়ে থাকলে যেন নিজ অঙ্গীকার থেকে পিছু না হটে।”
দুত মূসাইলামা কাজ্জাবকে সবকিছু জানায়। আররিযাল ইয়ামামাহ এর কেল্লাতেই থাকত। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক আল্লামা তাবারী রাহিমাহুল্লাহ লেখেন, মুসাইলামা তার বিশেষ মেহমানদের জন্য বড়ই চিত্তাকর্ষক তাবু স্থাপন করত। দূর থেকে এটাকে ঘর মনে হত। তাবুটি অভ্যন্তর থেকে অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী করে এবং রঙ-বেরঙের কাপড় দ্বারা সুসজ্জিত করা হত। মরুভূমির রাতে ঠাণ্ডা ঝরে পড়ত। এ কারণে তাঁবুতে দৃষ্টিনন্দন বহ্নিদানীও রাখা হত। এই বহ্নিদানীতে মুসাইলামা এমন কোন পদার্থ ছেড়ে দিত, যা একদিকে সুগন্ধির কাজ দিত অপরদিকে এ সুগন্ধিতে এমন মাদকতা মিশ্রিত ছিল যা তাঁবুতে শায়িত ব্যক্তিকে বাস্তবজগৎ থেকে কাল্পনিক জগতে নিয়ে যেত এবং তার স্বাভাবিক বাহ্যজ্ঞান ও অনুভূতি লুপ্ত করে তার মন-মানসিকতা নবচেতনা ও প্রভাব দ্বারা আচ্ছন্ন করে দিত। লোকটি বেহুঁশ কিংবা অবচেতন হত না ঠিকই কিন্তু স্বাভাবিক বোধশক্তি লুপ্ত হয়ে সে কাঠের পুতুলে পরিণত হত। তখন সে মুসাইলামার ইশারায় চলত। মুসাইলামাকে শিকার করতে এসে নিজেই তার শিকারে পরিণত হত। মুসাইলামা ছিল এক পাক্কা খেলোয়াড় ও শিকারী।
মুসাইলামা কাজ্জাব আররিযাল আসছে জেনে গতানুগতিক বিশেষ তাবু স্থাপনের নির্দেশ দেয়। পূর্বে যে পন্থায় তাঁবু সাজাত ঠিক সেভাবে সবকিছু সুসজ্জিত করে। বহ্নিদানীও সঠিক স্থানে রাখতে ভুলে না।
আররিযাল এলে মুসাইলামা এগিয়ে গিয়ে তাকে সাদর অভ্যর্থনা জানায়।
“একজন রাসূলের প্রেরিত ব্যক্তিত্ব আপনি”—মুসাইলামা তাকে বলে—“আর আমিও একজন রাসূল। ফলে আপনার সম্মান করা আমার কর্তব্য।”
“আমি কেবল তাকেই রাসূল বলে বিশ্বাস করি যিনি আমাকে এখানে পাঠিয়েছেন আররিযাল বলে—“আর একথা বলতেও আমার বুক কাঁপবে না যে, তুমি একজন ভণ্ড ও মিথ্যুক বৈ নও।”
মুসাইলামা মুচকি হাসে এবং আররিযালকে সুসজ্জিত তাবুতে নিয়ে যায়।
ইতিহাস এ ব্যাপারে নিরুত্তর যে, তাঁবুর রুদ্ধদ্বার বৈঠকে মুসাইলামা এবং আর রিযালের মধ্যে কি আলোচনা হয়। কেমন সমঝোতা বা কোন ধরনের যাদু সে তার উপর চালায় যে, আররিযাল আগামী প্রভাতে তাবু থেকে যখন বের হয় তখন তার প্রথম মন্তব্য ছিল—“নিঃসন্দেহে মুসাইলামা আল্লাহর রাসূল। তার প্রতি ওহী অবতীর্ণ হয়। সে একথাও বলে যে—“আমি মুহাম্মাদকেও একথা বলতে শুনেছি যে, মুসাইলামা সত্য নবী।”
