ইসলামের মূলে কুঠারাঘাত করতে যে বিপর্যয় প্রবল তুফানের ন্যায় ধেয়ে আসে তা হলো ধর্মান্তরিতের ফিত্না। এক শ্রেণীর মানুষ ইসলাম ছেড়ে অন্যধর্মে দীক্ষিত হয়ে মুরতাদ হয়ে যেতে থাকে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জীবদ্দশাতেই এ ফিৎনা সর্বপ্রথম মাথাচাড়া দেয়। কতিপয় ভণ্ড নবুওয়াতকে সস্তা জনপ্রিয়তার বাহন মনে করে নিজেকে নবী বলে দাবী করে বসেছিল। তিন দুষ্ট চক্র-রোম, ইরান এবং ইহুদীবাদ তাদের মদদ জোগায়। তাদেরকে নিজ দাবীতে অটল এবং ভণ্ডামী জোরে সোরে অব্যাহত রাখতে তারা সাহস, শক্তি, বুদ্ধি, জনবল, প্রচারণা ইত্যাদি পর্যায়ে সর্বাত্মক সহযোগিতা করে। ভণ্ড নবীদের একেক জন ছিল একেক এলাকার। তথাপি তাদের মধ্যে একটি ব্যাপারে অপূর্ব মিল ছিল। অর্থাৎ সকলের মধ্যে একটি গুণ সমভাবে ছিল। প্রত্যেকে ভেল্কিবাজী এবং নজরবন্দীতে পটু ছিল। ইহুদীবাদ হতে সকলে এ বিদ্যাটি রপ্ত করেই তবে মাঠে নামে। কোমলমতি জনগণকে সহজে প্রভাবিত ও তাদের হৃদয়ে গভীর রেখাপাত করতে ‘যাদুনাটক’ অব্যর্থ অস্ত্র ছিল। ইতোপূর্বে আসওয়াদ আনাসীর আলোচনা চলে গেছে। সেও ভেল্কিবাজী এবং নজরবন্দীতে পারঙ্গম ছিল। জনতাকে অভিভূত ও প্রভাবিত করতে সে অনেক ভৌতিক কারসাজি জনগণকে দেখাত।
নবুওয়াতের অপর দু’দাবীদার ছিল তোলাইহা এবং মুসাইলামা। নজরবন্দীতে মুসাইলামা যথেষ্ট দক্ষ ছিল। সে অদ্ভুত অদ্ভুত অভূতপূর্ব যাদু প্রদর্শন করত। সে পাখীর দেহ থেকে পাখনা পৃথক করে একহাতে পাখী আর অপর হাতে পাখনা নিয়ে উপরে ছুড়ে দিত। আশ্চর্যজনকভাবে পাখনা পাখীর দেহে গিয়ে স্থাপিত হতো আর পাখী দেহে পাখনা পেয়ে উড়াল দিত।
মুসাইলামা কদাকৃতির মানুষ ছিল। তার চেহারা দেখে মনে হত এটা কোন পশুর চেহারা। মুখাকৃতিও ছিল পশুর মত। দেহ খর্বাকৃতির এবং বর্ণ ছিল পীত। দেখতে কদাকার হলেও দেহে ছিল অসুরের শক্তি। চোখ ছোট ছোট এবং নাক চ্যাপ্টা। সব মিলে এত বেঢপ এবং কুৎসিত ছিল তার চেহারা যে, যে কোন কুদর্শন মানুষও তাকে অপছন্দ করত। তবে সুন্দরী ললনা হোক কিংবা বেয়ারা নারী হোক একবার তার সান্নিধ্যে এলেই তার পরশ ভক্ত হয়ে যেত এবং সে তার অঙ্গুলী হেলনে উঠা-বসা করত।
মুসাইলামা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জীবদ্দশাতেই নবুওয়াতের দাবী করেছিল এবং দু’পত্রবাহকের মাধ্যমে নিম্নোক্ত ভাষায় একটি পত্র লিখেছিল”
“মুসাইলামা রসূলুল্লাহ-এর পক্ষ হতে মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ এর প্রতি। আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক। পরবার্তা এই যে, আমাকে রেসালাতের সম অংশীদার করা হয়েছে। এ প্রেক্ষিতে অর্ধ ভূখণ্ড আমার আর বাকী অর্ধাংশ কুরাইশদের। কিন্তু দুঃখের বিষয় কুরাইশরা ইনসাফ করছে না।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পত্র পাঠ করে পত্র বাহকদের কাছে জানতে চান যে, মুসাইলামার এহেন বিচিত্র ও অদ্ভুত বার্তার ব্যাপারে তাদের ব্যক্তিগত অভিমত কি?
“পত্রে যা লেখা আছে আমরা তা সমর্থন ও স্বীকার করি”—এক পত্রবাহক জবাব দেয়।
“আল্লাহর কসম!” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—“দূত হত্যা অপরাধ না হলে এতক্ষণ তোমাদের কর্তিত মস্তক ধূলায় গড়াগড়ি খেত।”
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসাইলামার এই পত্রের জবাব নিম্নরূপ ভাষায় লেখান”
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদের পক্ষ হতে মিথ্যুক মুসাইলামার প্রতি-
বিশ্বের সমস্ত ভূখণ্ড আল্লাহর। তাঁর প্রিয় বান্দাদের মধ্য হতে যাকে ইচ্ছা তার উত্তরাধিকারী করেন।
এরপর থেকে মুসাইলামার নামের সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে যোগ হয় কাজ্জাব তথা মিথ্যুক শব্দটি। ইতিহাসের পাতায়ও সে এ বিশেষণে বিশেষিত।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সময় অন্তিম পীড়ায় শায়িত ছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে ভূখণ্ড দাবী করতে পারে এমন দুঃসাহসী ব্যক্তির অপতৎপরতা এবং তার প্রভাব-প্রতিপত্তি এখনই মিটিয়ে দেয়া জরুরী মনে করেন। তাঁর দৃষ্টি নাহারুর রিযাল নামক এক সাহাবীর উপর পড়ে। লোকটি ইসলাম গ্রহণ করে দ্বীনি শিক্ষা অর্জন করেছিলেন। পবিত্র কুরআনের উপর গভীর জ্ঞান রাখতেন। জ্ঞানী এবং প্রাজ্ঞ ব্যক্তিত্ব হিসেবে তার যথেষ্ট খ্যাতি ছিল।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকটিকে ডেকে ইয়ামামায় যেতে বলেন এবং ইসলামের প্রচার-প্রসারে আত্মনিয়োগের পরামর্শ দেন। তিনি আর রিযালকে ভালভাবে বুঝিয়ে দেন যে, ইয়ামামা থেকে যে কোন মূল্যে মুসাইলামার প্রভাব ও তৎপরতা রুখা চাই। যাতে কোনরূপ রক্তপাত ছাড়াই লোকটি জনমন থেকে হারিয়ে যায় এবং তার দাবীর অসারতাও প্রমাণিত হয়ে যায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশ পালনে আররিযাল ইয়ামামাহ অভিমুখে রওনা হয়ে যান।
মুসাইলামা বিন হাবীব উরফে মুসাইলামা কাজ্জাব রাতে স্বীয় দরবারে আসীন। শরাব পানের জমজমাট আসর চলছিল। তার গোত্রের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ দরবারে বসা। সকলেই মুসাইলামাকে আল্লাহর রাসূল বলে মানত। ইসলামই ছিল তার ধর্মমত। তবে কিছুটা ছাড় ও শিথিলতা প্রদান করেছিল। সে একটি জাল আয়াত বানিয়ে ভক্তদের শুনায় এবং বলে যে, তার উপর ওহী নাযিল হয়েছে যে, এখন থেকে মদ হালাল। এ ছাড়া অন্যান্য আমোদ-প্রমোদ ও বিলাস সামগ্রী ব্যবহারও সে বৈধ বলে ঘোষণা করেছিল।
