ফিরোজ এক কোপে আসওয়াদের গলা কেটে মস্তক ধড় থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। ফিরোজের সাথী কায়েস বিন আব্দে ইয়াগুছ এবং দাজওয়াহ এর জানা ছিল যে, আজ রাতে কি ঘটতে যাচ্ছে। ফিরোজ আসওয়াদের দেহ তুলে নেয় এবং সোজা সাথীদ্বয়ের কাছে গিয়ে পৌঁছে। আযাদ ফিরোজের সাথে সাথে মহল থেকে বের হয়ে গিয়েছিল। নিরাপত্তা বাহিনী ও প্রহরীরা রহমানুল ইয়ামান-এর হত্যার সংবাদ পেয়েই পুরো মহল ঘিরে ফেলে। শান্ত মহল অল্প সময়েই অশান্ত হয়ে ওঠে। পুরো মহলে হুলস্থুল পড়ে যায়। হেরেমের নারীরা আতংকে চিৎকার করতে করতে পালিয়ে যায়।
ওদিকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক প্রেরিত হযরত কায়েস বিন হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং হযরত ওবার বিন ইয়াহনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু নেতৃস্থানীয় মুসলমানদেরকে বিদ্রোহের পর্যায়ে রেখেছিলেন। দিন-রাত অবিরাম তৎপরতা চালিয়ে মুসলমানদের উৎসাহ-উদ্দীপনা চাঙ্গা করে রেখেছিলেন।
সোবহে সাদিকের তখনও কিছু সময় বাকী। মহলের ছাদ থেকে আযানের উচ্চকিত ধ্বনি ইথারে-পাথারে আছড়ে পড়ে। খোদ মহলে আযানের ধ্বনি উঠায় লোকজন বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে যায়। জনতা মহল অভিমুখে ছুটে আসে। আসওয়াদের ফৌজ হুকুমের অপেক্ষায় ছিল। হুকুমদাতা ছিল কায়েস বিন আব্দে ইয়াগুছ। সেই সর্বাধিনায়ক। সে সৈন্যদেরকে ব্যারাক হতে বাইরে আসতে দেয় না।
আসওয়াদের কর্তিত মস্তক বাইরে ঝুলিয়ে দেয়া হয়। মহলের ছাদ থেকে এ আওয়াজ ক্রমেই জোরালো হচ্ছিল—“আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ্র সত্য রাসূল আর আসওয়াদ আনাসী মিথ্যাবাদী।”
আসওয়াদের ভক্তকুল ঘটনার আকস্মিকতায় দারুণ ভড়কে যায়। তাদের চোখে-মুখে নেমে আসে আতংকের পর্দা। ওদিকে মুসলমানরা সশস্ত্র হয়ে চতুর্দিকে বাজের মত ছড়িয়ে পড়ে। তারা ইয়ামানীদেরকে পাইকারী হারে হত্যা করতে শুরু করে।
মিসরের সাবেক মন্ত্রী মা’আরেফ মুহাম্মদ হুসাইন স্বীয় গ্রন্থ আবু বকর সিদ্দীকে আকবর এ ফিরোজের একটি জবানী তুলে ধরেছেন। ফিরোজ বলেছিল:
আসওয়াদের হত্যার পর সেখানকার সকল ব্যবস্থাপনা পূর্ববৎ রাখা হয়। যেমনটি চলছিল আসওয়াদের জীবদ্দশায়। আমরা হত্যার পর সর্বপ্রথম যে কাজ করি তা হলো, হযরত মু’আজ বিন জাবাল রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে ডেকে জামাতের সাথে নামায পড়ানোর অনুরোধ করি।…ইসলামের এক বড় শত্রুকে এভাবে সহজে
নাস্তানাবুদ করতে পেরে আমরা বেজায় খুশি ছিলাম। কিন্তু এ খুশীর হিল্লোল পড়তে না পড়তে খবর আসে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইন্তেকাল হয়ে গেছে। বেদনাবিধুর এ খবরে সারা ইয়ামানে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে। ইয়ামানবাসী শোকে বিহ্বল হয়ে পড়ে। তাদের আনন্দ সম্পূর্ণ উবে যায়। জনজীবনে অঘোষিত অচলাবস্থা সৃষ্টি হয় এবং চরম স্থবিরতা নেমে আসে। সব মিলিয়ে শেষ খবরের ফুৎকারে জনতার আশার প্রদীপ দপ করে নিভে যায় এবং ভবিষ্যতের উজ্জ্বল পাতা সহসা ফিকে হয়ে যায়।”
সান‘আবাসীর মুক্তির জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দুঃসাহসিক অবদান রাখায় মুসলমানরা ফিরোজকে সান’আর গভর্নরের আসনে অধিষ্ঠিত করে।
৬৩২ খ্রিস্টাব্দের মে মাসের ঘটনা এটি। ৬৩২ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসের দ্বিতীয় সপ্তায় হযরত কায়েস বিন হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং হযরত ওবার বিন ইয়াহনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু এই সুসংবাদ নিয়ে মদীনা পৌঁছে যে, ভণ্ড নবীর ভবলীলা সাঙ্গ এবং বর্তমানে পুরা ইয়ামানে ইসলামের পতাকা শোভা পাচ্ছে। কিন্তু মদীনা তখন ছিল শোকে মুহ্যমান। মাত্র ক’দিন পূর্বে ৬৩২ খ্রিস্টাব্দের ৫ই মে মোতাবেক ১১ হিজরীর ১২ই রবিউল আওয়াল আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়ে গিয়েছেন।
॥ সাত ॥
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইন্তেকালের খবর অগ্নিগোলকে রূপ নেয়। যেখানেই এই খবর পৌঁছে সেখানেই আগুনের শিখা ওঠে। এটা ছিল বিদ্রোহের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। ইসলামের শত্রুরা ময়দান খালি পেয়ে সামনে চলে আসে। বিভিন্নমুখী নাশকতামূলক কাজে তৎপর হয়ে ওঠে। নেতার দেখাদেখি মুসলমান হওয়া কিছু গোত্রও নড়েচড়ে ওঠে। যারা আন্তরিকভাবে ইসলাম গ্রহণ করেছিল তাদের সংখ্যা ছিল কম। শুধু মুখে মুখে বা প্রাণ বাঁচাতে যারা মুসলমান হয়েছিল তাদের সংখ্যা ছিল বেশী। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইন্তেকালে এ শ্রেণী কেবল ইসলামচ্যুতই হয় না; তারা মদীনার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ঝাণ্ডা উড়িয়ে দেয় এবং মদীনায় হামলা সংক্রান্ত আলাপ-আলোচনা করতে থাকে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইন্তেকালের পর সর্বসম্মতিক্রমে হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু ইসলামী সালতানাতের কর্ণধার ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্থলাভিষিক্ত নির্বাচিত হন। তাঁর দায়িত্বভার বুঝে নেবার পূর্বেই চারদিকে বিদ্রোহের দাবানল জ্বলে ওঠে। যেন আচমকা কোন ঝড়ে আগুনের উপর থেকে ছাই উড়ে গিয়ে নিচের চাপা আগুন বেরিয়ে আসে। সর্বপ্রথম খলীফা হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু বিদ্রোহী কবিলাগুলো বরাবর ধৈর্য ও সহনশীলতার বার্তা প্রেরণ করেন। তাদেরকে ইসলাম বর্জন না করার আহ্বান জানান। দূত সকল স্থান থেকে কেবল এই জবাব নিয়ে ফেরে যে, আমাদের ইসলাম গ্রহণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ব্যক্তিগত চুক্তির ব্যাপার ছিল মাত্র। যখন তিনি নাই তখন সে চুক্তির কার্যকারিতা অটোমেটিক বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এখন আমরা পূর্ণ স্বাধীন। আমাদের ভবিষ্যৎ আমরা কাদের সাথে জুড়ে দিব সে ব্যাপারে নাক গলানোর অধিকার কারো নেই। এটা সম্পূর্ণ আমাদের ইখতিয়ারভুক্ত। এখানে অন্যের হস্তক্ষেপ অনধিকার চর্চার শামিল।
