“শুধু তোমাকে নয়; পুরো ইয়ামানকে আমি মুক্ত করতে চাই”—ফিরোজ বলে, “কিন্তু তোমার সাহায্য ছাড়া আমি সফল হতে পারব না।”
“খুলে বল ফিরোজ!” আযাদ বলে—“আমাকে কি করতে হবে?”
‘কোন এক রাতে আমাকে আসওয়াদ পর্যন্ত পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করে দাও।”—ফিরোজ বলে, “তাহলে প্রভাতে তার লাশ ওখান থেকে বের করা হবে।…বল, পারবে এ উপকারটুকু করতে?”
“আগামীকাল রাতে এই সময়ের কিছু পরে এই দেয়ালের অপর প্রান্তে ঐ স্থানে আসবে যার কথা তোমাকে বলছি”—আযাদ বলে, “আমার কক্ষ এই দেয়াল সংলগ্ন। অন্য কোন পন্থায় দেয়াল টপকানো তোমার পক্ষে সম্ভব নয়। রশি ফেলতে হবে। সাথে করে রশি আনবে। দেয়ালের উপর দিয়ে রশি ছুড়ে দিবে। রশির মাথা আমি এদিকে কোথাও বেঁধে দিব। তুমি রশি বেয়ে বেয়ে উপরে উঠবে।”
পরবর্তী রাতে ফিরোজ চুপিসারে দেয়ালের গা ঘেঁষে ঘেঁষে চলতে থাকে। তাকে থেমে থেমে চলতে হচ্ছিল। পাহারাদারদের এড়িয়ে পথ চলতে হয়। অবশেষে সে নির্ধারিত স্থানে এসে পড়ে। সে এসেই রশির একমাথা দেয়ালের উপর দিয়ে ছুড়ে দেয়। অতি সহজে রশির মাথা দেয়ালের অপর প্রান্তের গিয়ে পড়ে। আযাদ যথাস্থানে অবস্থান করছিল। সে জলদি রশির এ প্রান্ত কোথাও শক্ত করে বেঁধে দেয়। রশি বাঁধা হয়ে যেতেই ফিরোজ রশি বেয়ে বেয়ে এবং দেয়ালের সাথে পা চেপে চেপে দেয়ালের উপর উঠে যায়। এরপর রশি দেয়ালের উপর কোথাও বেঁধে রশি বেয়ে বেয়ে অনায়াসে নীচে নেমে আসে।
আযাদ তাকে নিজ কামরায় নিয়ে যায় এবং অর্ধ রাত পর্যন্ত সেখানেই তাকে লুকিয়ে রাখে। এর পূর্বে বের হলে আসওয়াদের টের পাওয়ার আশংকা ছিল।
“অর্ধেক রাতের পর সে অবচেতন এবং নেশায় বুদ হয়ে যায়”—আযাদ আসওয়াদের ব্যাপারে ফিরোজকে জানায়—“লোকটা রীতিমত মানুষরূপী দৈত্য। যে দৈত্য শুধু মদ পিপাসু এবং নারীখোর।… তুমি তার দৈহিক কাঠামো দেখেছো। এত লম্বা-চওড়া শরীরের কাছে তলোয়ারের এক-দু’ আঘাত শরাবের এক-দু’ চুমুকের মত। তাকে শেষ করা সহজসাধ্য হবে না।”
“নিজেকে শেষ করে হলেও তাকে শেষ করতেই হবে”—ফিরোজ বলে।
আযাদ কক্ষের দ্বার মৃদু উন্মোচন করে বাইরে দৃষ্টি প্রসারিত করে। পারিচারিক ভবনের মাথায় এক প্রহরী দাঁড়িয়ে পাহারা দিত। এখন প্রহরীকে ছায়ার মত দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। ছায়া দেখে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, এখন তার মুখ দরজার অপর দিকে। আযাদ পা টিপে টিপে বের হয়ে আসওয়াদের কক্ষের দরজা খুলে। মৃদু রশ্মি ছড়িয়ে একটি ঝাড়বাতি মিটমিট করে জ্বলছিল। আসওয়াদ শয্যায় চিৎ হয়ে শুয়ে জোরে জোরে নাক ডাকছিল।
ঐতিহাসিক বালাজুরী তৎযুগের দু’হস্তলিপির উদ্ধৃতি দিয়ে লেখেন, আযাদ আসওয়াদকে দেখে এত উত্তেজিত হয়ে ফেরে যে, তার চোখ-মুখ দিয়ে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ঠুকরে বের হচ্ছিল। সহজেই অনুমান করা যায় যে, এটা ছিল দীর্ঘ চাপা ক্ষোভের ভয়াল বিস্ফোরণ এবং একরাশ ঘৃণার স্ফুলিঙ্গ।
“এস ফিরোজ!” সে উত্তেজনায় কম্পিত কণ্ঠে বলে—“সে অচেতন পড়ে আছে।”
ফিরোজ আযাদের সাথে কামরা থেকে বের হয় এবং পা টিপে টিপে আযাদের পিছু পিছু আসওয়াদের কামরায় গিয়ে প্রবেশ করে। আসওয়াদ জংলী পড়ের মত দীর্ঘদেহী ছিল। কক্ষ ভরপুর ছিল মদ এবং পাপাচারের বিভিন্ন সামগ্রী দ্বারা। আল্লাহই ভাল জানেন, এমনটি কেন হল! আসওয়াদ হঠাৎ জেগে যায়। মন্ত্রী এবং রূপবতী ইরানী স্ত্রীকে দেখে সে থতমত খেয়ে উঠে বসে। ঐতিহাসিকগণ লেখেন, আযাদের প্রতি তার পূর্ণ আস্থা ছিল। কিন্তু ফিরোজকে দেখে তার মনে সন্দেহের উদ্রেক হয়।
“এ সময় আবার কি মুসিবত এল?” নেশায় ঢুলুঢুলু অবস্থায় আসওয়াদ জিজ্ঞাসা করে।
ফিরোজ এক মুহুর্ত সময় নষ্ট করে না। চোখের পলকে তলোয়ার কোষমুক্ত করে এবং সজোরে আসওয়াদের গর্দান লক্ষ্য করে আঘাত হানে। আসওয়াদ শেষ মুহূর্তে টের পেয়ে গর্দান বাঁচাতে সক্ষম হলেও ভরপুর আঘাত গিয়ে লাগে তার মাথায়। আসওয়াদের মুখ থেকে এক তীব্র আত্মচিৎকার বেরিয়ে যায়। সে চিৎকার দিয়েই শয্যার অন্য পাশে গড়িয়ে পড়ে।
পরিচারক ভবনে ভারী পদশব্দ শোনা যায়। আযাদ দ্রুত এসে দরজা বন্ধ করে দেয়। প্রহরী দৌড়ে আসছিল। আযাদ দ্রুত এগিয়ে এসে প্রহরীর পথ আগলে ধরে। কক্ষ থেকে তখনও আসওয়াদের গোঙানীর মৃদু আওয়াজ ভেসে আসছিল।
“স্বস্থানে ফিরে যাও”—আযাদ প্রহরীকে নির্দেশের ভঙ্গিতে বলে—“রহমানুল ইয়ামানের কাছে ফেরেশতা এসেছে। বর্তমানে ওহী নাযিল হচ্ছে।…যাও, এদিকে আসার প্রয়োজন নেই।”
ঐতিহাসিক বালাজুরী লেখেন, আযাদের কথায় প্রহরী আশ্বস্ত হওয়ার ভঙ্গিতে মাথা নুইয়ে দেয় এবং চলে যায়।
আযাদ প্রহরীকে বিদায় করে এসে দেখে আসওয়াদ নীচের কার্পেটে পড়ে রয়েছে। আর ফিরোজ দ্বিতীয় আঘাত করার জন্য সামনে অগ্রসর হচ্ছে। আসওয়াদ কার্পেটে লুটিয়ে পড়ে। তবে তার মাথা পালঙ্কের সাথে লেগে ছিল এবং তা ষাড়ের মত নড়ছিল।
“তুমি তাকে মেরে ফেলতে পারবে না ফিরোজ!” আযাদ সামনে এগিয়ে এসে বলে এবং আসওয়াদের মাথার লম্বা চুল দুহাত দিয়ে শক্ত করে ধরে নীচের দিকে টান দেয় এবং নিজে বেডে উঠে বসে। যখন আযাদের প্রচেষ্টায় আসওয়াদের গর্দান এমন পর্যায়ে আসে যে, ফিরোজ অতি সহজে তার গর্দানে আঘাত করতে পারে তখন আযাদ বলে—“এবার চালাও ফিরোজ…গর্দান দ্বিখণ্ডিত করে ফেল।”
