“হিরাক্লিয়াসের বাহিনী উরদুনে আমাদের মাথার উপর দাঁড়ানো।”—হযরত কায়েস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “আমাদের বাহিনী রোমীয়দের উপর আক্রমণ করতে যাচ্ছে। আমরা দু’জনই কি পুরো সৈন্যের কাজ করতে পারি না?”
তুমি ভেবে দেখেছ, আমাদের মত দু’জন আর কিইবা করতে পারে?” ফিরোজ জিজ্ঞাসা করে।
“হত্যা”—হযরত কায়েস রাযিয়াল্লাহু আনহু জবাব দিয়ে বলেন, “এ প্রশ্ন না করলে খুশী হব যে, আসওয়াদকে কিভাবে হত্যা করা যেতে পারে। চাচাত বোন আযাদের কথা তুমি বেমালুম ভুলে গেছ।
ফিরোজ চলতে চলতে দাঁড়িয়ে পড়ে। আচমকা তার চেহারায় ভিন্ন রংয়ের স্ফুরণ ঘটে। যেন হঠাৎ রক্ত টগবগিয়ে ওঠে।
“অমানিশার ঘোরে তুমি আমাকে আলোর ঝিলিক দেখিয়েছ”—ফিরোজ বলে, ‘হত্যা ছাড়া দ্বিতীয় কোন পথ নেই। আমার চাচাত বোনের নাম উচ্চারণ করে তুমি আমার মিশন সহজ করে দিয়েছ। এ কাজ আমি সম্পন্ন করবই।… তুমি নিজের কাজে মনোযোগ দাও।… এখন যাও কায়েস। জীবিত থাকলে পরে আবার সাক্ষাৎ হবে ইনশাআল্লাহ।
ঐতিহাসিকগণ লেখেন, ফিরোজের অন্তরে আসওয়াদের প্রতি যে ক্ষোভ দানা বেঁধেছিল এবং যে ঘৃণা এতদিন চাপা ছিল তা উথলে ওঠে। সে আসওয়াদ আনাসীর ইরানী সেনাপতি কায়েস বিন আব্দে ইয়াগুছ এবং মন্ত্রী দাজওয়াহকে নিজের সমমনা ও সাথী বানিয়ে নেয়। আসওয়াদকে হত্যা করা এক মন্ত্রীর জন্যও সহজসাধ্য ছিল না। আসওয়াদের নিরাপত্তাকর্মী ও দেহরক্ষী বাহিনী সর্বক্ষণ তার চারপাশে থাকত। অনেক ভেবে-চিন্তে এই তিন ইরানী এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে, আযাদকে এই কাজে শরীক করা হবে তবে সে নিজে হত্যা করবে না।
আযাদের সাথে যোগাযোগও সহজ ছিল না। এরই মধ্যে আসওয়াদের কেমন যেন সন্দেহ হয়ে যায় যে, তিন ইরানী তাকে অন্তর থেকে সমর্থন করে না। সে তাদের উপর আস্থা কমিয়ে দেয়। ইতোপূর্বে আযাদ আর ফিরোজের মধ্যে কখনও সাক্ষাৎ হয়নি।
আযাদ পর্যন্ত পৌঁছার জন্য প্রয়োজন ছিল একজন নারীর। একজন মন্ত্রীর জন্য একটি মেয়েলোক যোগাড় করা কোন কঠিন কাজ ছিল না। ফিরোজ মহলের আধা বয়ষ্কা এক মহিলাকে তলব করে। সেও মুসলমান ছিল। ফিরোজ তাকে নিজের বাড়িতে কাজের প্রস্তাব দেয়। সে চাইলে ফিরোজ তাকে নিজের বাড়ি নিয়ে যেতে পারে। ফিরোজ তাকে কিছু টোপও দেয়। সে তাকে জানায় যে, বর্তমানে তার থেকে যত কাজ নেয়া হচ্ছে এত কাজ নেয়া হবে না। মহিলা সহজেই রাজি হয়ে যায়। ফিরোজ সেদিনই তাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে আসে।
একদা আযাদ একাকী বসা ছিল। সে সর্বক্ষণ ক্রুদ্ধ ও অগ্নিশর্মা থাকত। পরিত্রাণের কোন পথ সে খুঁজে পাচ্ছিল না। এমতাবস্থায় ফিরোজের সদ্য নিয়োগকৃত বুয়া তার কাছে আসে।
“আমি কাজের বাহানায় এখানে এসেছি”—চাকরানী বলে, “কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আমি এসেছি আপনার কাছে।…রহমানুল ইয়ামানের বর্তমান মন্ত্রী আপনার চাচাত ভাইয়ের সাথে কখনো আপনার সাক্ষাৎ হয়েছে।”
“তুমি গোয়েন্দাগিরি করতে এসেছ?” আযাদ রাগান্বিত কণ্ঠে বলে।
“না”—চাকরানী বলে, “আমার ব্যাপারে এই সন্দেহ রাখবেন না যে, আমি ঐ ভণ্ড নবীর গোয়েন্দা। আসওয়াদের প্রতি আমার অন্তরে ততখানি ঘৃণা যতখানি আপনার অন্তরে রয়েছে।”
“আমি বুঝতে পারছি না তুমি আমার কাছে কেন এসেছ?” আযাদ বলে।
“ফিরোজ আমাকে পাঠিয়েছে”—চাকরানী বলে।
“ফিরোজের নামও আমি শুনতে চাই না”—আযাদ বলে, “তার মাঝে আত্মমর্যাদাবোধ বলতে কিছু থাকলে সে ঐ ব্যক্তির মন্ত্রীত্ব গ্রহণ করত না, যে তার চাচাত বোনকে বিধবা করে তাকে জোরপূর্বক স্ত্রী বানিয়েছে।”
আযাদ শাহী খান্দানের মহিলা ছিল। চাকর-চাকরানী সম্পর্কে তার যথেষ্ট অভিজ্ঞতা রয়েছে। এতটুকু কথায় আযাদ নিশ্চিত হয়ে যায় যে, এই পরিচারিকা গোয়েন্দাগিরি করতে আসেনি। আযাদ তাকে জিজ্ঞাসা করে যে, ফিরোজ তার জন্য কি বার্তা প্রেরণ করেছে? পরিচারিকা জানায় যে, তিনি একবার আপনার সাথে দেখা করতে চান মাত্র। আযাদ তাকে একটি নির্দিষ্ট স্থানের কথা জানিয়ে বলে, ফিরোজকে রাতে এখানে আসতে বলবে।
“তবে আমাদের মাঝে একটি দেয়ালের পার্থক্য থাকবে।”—আযাদ বলে, “দেয়ালের এক স্থানে একটি বাতায়ন আছে। এখানে একটি খাম্বাও আছে। ফিরোজ এই খাম্বার অপর দিকে মুখ করে কথা বলতে পারে।”
পরিচারিকা আযাদের বার্তা ফিরোজকে পৌঁছে দেয়।
ঐ দিন রাতেই ফিরোজ মহলের পার্শ্বস্থ দেয়ালের ঐ স্থানে পৌঁছে যায় যেখানে খাম্বাবিশিষ্ট ছোট বাতায়ন ছিল। আযাদ ফিরোজের অপেক্ষায় দাড়িয়ে ছিল।
“তোমার প্রেরীত পরিচারিকার উপর আমার অগাধ আস্থা এসে যায়”—আযাদ কথা শুরু করে, “তা তোমার প্রতি কিভাবে আস্থা রাখতে পারি? আমার বিশ্বাস হয় না যে, তুমি আমাকে ঐ বর্বর-জংলী থেকে মুক্ত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছ।”
“তবে কি তুমি ঐ বর্বরের সাথে সুখেই আছ।” ফিরোজ জিজ্ঞাসা করে।
“তার মত ঘৃণ্য দ্বিতীয় আর একটিও আমার চোখে পড়েনি”—আযাদ বলে, “এখানে তোমার বেশীক্ষণ থাকা উচিত নয়। তাড়াতাড়ি বল, এতদিন পর আমার কথা তোমার কেন মনে পড়ল?”
“এ মুহূর্তে আসওয়াদ এদিকে আসার আশংকা রয়েছে?” ফিরোজ জানতে চায়—“না কি সে এখনই তোমাকে…।”
“না”—আযাদ বলে, “প্রহরীদের এসে পড়ার আশংকা করছি আমি। আসওয়াদ এখন মদের নেশায় চুর হয়ে পড়ে আছে। তার অধীনে নারীর সংখ্যা কম নয়।”
