“কে হত্যা করবে?”—আরেক মুসলমান জিজ্ঞাসা করে। “আর কোথায়-ই বা তাকে হত্যা করা হবে? সে তো অন্দর মহল থেকে বের-ই হয় না। আর এটাও জানা কথা যে, তার বাসভবনের চারপাশে কড়া ও নিচ্ছিদ্র প্রহরার ব্যবস্থা রয়েছে।”
“আমাদের মধ্য হতে কেউ তার জীবন বাজি রাখার সংকল্প করতে পারে না?” হত্যা পরামর্শদাতা জিজ্ঞাসা করে।
যাকে হত্যা করা হবে তার কাছেই যদি না পৌঁছা যায় তবে এভাবে জীবন খোয়াবার কি অর্থ হতে পারে?”—অপর মুসলমান পাল্টা প্রশ্ন করে, অতঃপর বলে—“মোটকথা গোপনে আমাদের এই আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। কমপক্ষে বিদ্রোহের একটি পরিবেশ সৃষ্টি করে তার ঝুঁকি নিতেই হবে।”
আসওয়াদ আনাসী ইয়ামান অধিকার করে সর্বপ্রথম এই পদক্ষেপ নেয় যে, ইরানের শাহী ও অন্যান্য সম্ভ্রান্ত বংশের যে সমস্ত লোকজনকে আসওয়াদ সানআয় পায়, সবাইকে বিভিন্ন পন্থায় লাঞ্ছিত-অপদস্ত করেছিল। তাদের অবস্থা কেনা গোলামের চেয়েও করুণ করে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু আসওয়াদের রাজত্বে সবচে বড় যে দুর্বলতা ছিল তা হলো, তার অধীনে অভিজ্ঞ কোন সেনাপতি এবং কোন সুদক্ষ প্রশাসকও ছিল না। তারপরে এ আশংকাও তার সবসময় ছিল যে, মুসলমানরা যে কোন আক্রমণ করতে পারে। তার নিজেরও সমরজ্ঞান বলতে কিছু ছিল না। এই দুর্বলতা ও শূন্যতা কাটিয়ে উঠতে তাকে বাধ্য হয়ে ইরানীদের সাহায্য নিতে হয়।
তার দপ্তরে ৩টি নাম জমা পড়ে। ১. গভর্নর বাযানের সময়কার প্রখ্যাত ইরান সেনাপতি কায়েস বিন আব্দে ইয়াগুছ। ২. ফিরোজ ও ৩. দাজওয়াহ। এ দু’জন প্রশাসনিক কাজে অভিজ্ঞ ও দক্ষ ছিলো। ফিরোজ ইতোপূর্বেই ইসলাম গ্রহণ করেছিল। সঠিক অর্থে এবং আন্তরিকভাবেই সে মুসলমান ছিল। আসওয়াদ কায়েস বিন আব্দে ইয়াগুছকে সেনাপ্রধান পদে নিয়োগ দেয়। আর ফিরোজ ও দাজওয়াহকে মন্ত্রী বানায়। তিনজনই আসওয়াদের সর্বাত্মক আনুগত্যের শপথ করে এবং তাকে এই বলে আশ্বস্ত করে যে, তারা যে কোন অবস্থায় তার অনুগত থাকবে।
একদিন ফিরোজ বাইরে কোথাও পায়চারি করছিল। ইত্যবসরে এক ভিক্ষুক এসে তার পথ আগলে ধরে এবং তার দিকে সাহায্যের আশায় হাত বাড়িয়ে দেয়।
“তোমাকে দেখে অক্ষম মনে হয় না”—ফিরোজ তাকে বলে। যদি তোমার মাঝে কোন অক্ষমতা থেকে থাকে তবে সে অক্ষমতা একমাত্র এটাই যে, তোমার মধ্যে আত্মমর্যাদাবোধ এবং ব্যক্তিত্ব বলতে কিছু নেই।”
“তুমি ঠিকই ধরেছ”—ভিক্ষুক তার প্রসারিত হাত ধীরে সরিয়ে এনে বলে— “আমার অসহায়ত্ব এটাই যে, আমার আত্মমর্যাদা বলতে যা ছিল তা আমার থেকে ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে।…আর আমার ধারণা মিথ্যা না হলে বলবো, আমার মত তোমার মাঝে এই অসহায়ত্ব বর্তমান। ভিক্ষার জন্য আমি হাত বাড়াইনি। আমার হারানো আত্মমর্যাদাবোধ ফেরৎ চাচ্ছি মাত্র।
“তুমি পাগল না হয়ে থাকলে তোমার মনের কথা খুলে বল”—ফিরোজ ভিক্ষুকবেশীকে বলে।
“আমার অন্তরে আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নাম রয়েছে, তুমি যার প্রেমিক”। ভিক্ষুক ফিরোজের চোখে চোখ রেখে বলে—“আসওয়াদ আনাসীর শরাব তোমার পেটে জায়গা না পেয়ে থাকলে আমার এ ধারণা মিথ্যা নয় যে, তুমি অন্তরে পাথর চাপা দিয়ে আসওয়াদের মন্ত্রীত্ব গ্রহণ করেছ।”
ফিরোজ এদিক-ওদিক চায়। সে বুঝে ফেলে ভিক্ষুকবেশী মদীনার একজন মুসলমান। কিন্তু এ আশংকাও সে উড়িয়ে দিতে পারে না যে, লোকটি আসওয়াদের ঝানু গোয়েন্দাও হতে পারে, যে কৌশলে তার মনোভাব যাচাই করছে।
ঘাবড়িয়ো না ফিরোজ।” ভিক্ষুক বলে—“আমি তোমার প্রতি আস্থাশীল। তুমিও আমার উপর আস্থা রাখ। আমি তোমাকে আমার নাম জানিয়ে দিচ্ছি…কায়েস বিন হুরায়রা…। আমাকে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রেরণ করেছেন।”
“সত্যই কি আল্লাহ্ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাকে আমার কাছে প্রেরণ করেছেন? ফিরোজ আবেগের সাথে জানতে চায়।
“না”, হযরত কায়েস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন—“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কথা বলেছিলেন যে, সেখানে গেলে আল্লাহর খাঁটি বান্দাদের দেখা পেয়ে যাবে।”
“তুমি কিভাবে জানলে আমি খাঁটি মুসলমান?” ফিরোজ জিজ্ঞাসা করে।
“আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নাম শুনে রাসূল-প্রেমিকদের চোখে যে চমক সৃষ্টি হয় তা আমি তোমার দু’চোখে দেখেছি। হযরত কায়েস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন—“তোমার চোখে সে চমক কিছুটা বেশী দেখা যায়।”
ফিরোজ হযরত কায়েস রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে এখন চলে যেতে বলে। সে হযরত কায়েস রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে আরেক স্থানের ঠিকানা দিয়ে বলে, যেন আগামীকাল সূর্য ডোবার কিছু পূর্বে এই ঠিকানায় এসে ভিক্ষা চাইতে থাকে।
পরের দিন গোধূলী লগ্নে ফিরোজ ঐ স্থান দিয়ে অতিক্রম করে যাচ্ছিল। ফিরোজের ইশারায় হযরত কায়েস রাযিয়াল্লাহু আনহু ভিক্ষুকের মত দাঁড়িয়ে ফিরোজের পিছনে পিছনে হাত লম্বা করে চলতে থাকে।
“আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জানিয়ে দাও যে, তাঁর নামে জীবন উৎসর্গকারী এক ব্যক্তি আসওয়াদ আনাসীর ছত্রছায়ায় রয়েছে”—ফিরোজ চলার গতি পূর্ববত রেখে কোনদিকে না তাকিয়ে ধীর কণ্ঠে বলে—“আর আমি ভেবে পাই না যে, বিশাল সমরশক্তির অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইয়ামানে এখনও হামলা করছেন না কেন?”
