আসওয়াদ আনাসী দুর্বারগতিতে সামনে এগুতে থাকে। হাজরে মওত, বাহরাইন, এহসা এবং আদন পর্যন্ত সমগ্র এলাকা এক এক করে অধিকার করে সে পুরো ইয়ামানের বাদশা হয়ে যায়।
ইসলামের বিরুদ্ধে এটা ছিল এক খোলা চ্যালেঞ্জ। উত্তর দিক হতে রোমীয়দের আক্রমণের আশংকা সবসময় বিদ্যমান ছিল। এদের প্রতিরোধে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক বিশাল বাহিনী প্রস্তুত করেছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আযাদকৃত গোলাম হযরত যায়েদ বিন হারেছা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর মাত্র ২২ বছর বয়সী পুত্র হযরত উসামা রাযিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন এ বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। ইতোপূর্বে হযরত যায়েদ রাযিয়াল্লাহু আনহুও সেনাধ্যক্ষ ছিলেন এবং তিনি মুতা যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেছিলেন।
স্বঘোষিত এক ভণ্ড নবী হতে ইয়ামানকে মুক্ত করার জন্য এক বিশাল বাহিনী প্রয়োজন ছিল মুসলমানদেরও ছিল তেমন বাহিনী। কিন্তু এ বিশাল বাহিনী প্রস্তুত ছিল রোমীয়দের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য। রোমীয়দের উপর হামলা স্থগিত রেখে ইয়ামানে এ বাহিনী পাঠানো হলে রোমীয়রা এটাকে অপূর্ব সুযোগ মনে করে খোদ মদীনায় হামলা করতে পারে। তাহলে এটা হবে মারাত্মক বিপর্যয় এবং ভরাডুবি। তাই এ পরিকল্পনা বাতিল করে দেয়া হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বিকল্প চিন্তাও করেন যে, যারা অসহায় হয়ে আসওয়াদের আনুগত্য স্বীকার করেছে, আসওয়াদকে মসনদচ্যুত করতে তাদেরকেই কৌশলে ব্যবহার করতে হবে। কমান্ডারগণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এই বিকল্প প্রস্তাব সমর্থন করেন। এ লক্ষ্যে কয়েকজন বিচক্ষণ লোক, ইয়ামানে প্রেরণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর তীক্ষ্ণ নির্বাচনী দৃষ্টি হযরত কায়েস বিন হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর উপর গিয়ে পড়ে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ডেকে নিয়ে ইয়ামানে যাওয়ার উদ্দেশ্য ভাল করে বুঝিয়ে দেন। সাথে সাথে এটাও বলে দেন যে, তাকে খুব সতর্ক এবং গোপনে সেখানকার মুসলমানদের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলে গোপনে একদল জানবাজ মুজাহিদ তৈরী করতে হবে, যারা ভণ্ড নবী এবং বিলাসিতায় আকণ্ঠ ডুবন্ত স্বঘোষিত বাদশাহকে গদীচ্যুত করবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কায়েস বিন হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে আরো বলেন যে, তাকে ইয়ামানে যাবার কথা সম্পূর্ণ গোপন রাখতে হবে এবং সুদূর ইয়ামান পর্যন্ত তাকে এমনভাবে পৌঁছতে হবে যেন কেউ না দেখতে পায়।
এই গোপন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো পদক্ষেপ নেন। তিনি ওবার বিন ইয়াহনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে একটি পত্র দিয়ে ইয়ামানে গিয়ে পত্রটি ইয়ামানের ঐ সমস্ত মুসলিম নেতৃবৃন্দকে শুনাতে বলেন, যারা পরিস্থিতির চাপে পড়ে আসওয়াদ আনাসীর বশ্যতা স্বীকার করেছে। তাকে আরো বলে দেন, পত্রটি পাঠ মাত্রই নিশ্চিহ্ন করে দিবে। বাকী যা কিছু করার তা হযরত কায়েস বিন হুরায়রা করবে।
আসওয়াদ আনাসী সান‘আতে হামলা করলে সেখানকার গভর্নর শাহার বিন বাযান মোকাবিলা করেন। কিন্তু লড়তে গিয়ে তিনি শহীদ হয়ে যান। আযাদ নামে তার এক যুবতী স্ত্রী ছিল। তার এই স্ত্রী আসওয়াদের হস্তগত হয়। আযাদ অসাধারণ রূপবতী ইরানী কন্যা ছিল। আযাদ আসওয়াদকে স্বামী হিসেবে বরণ করতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানায়। কিন্তু আসওয়াদ জোরপূর্বক তাকে স্ত্রী করে নেয়। আযাদ তাকে প্রচণ্ডরূপে ঘৃণা করত, যার ফলে সে বন্দী হয়ে যায়। এক দুর্বল নারীর পক্ষে কিছু করারও ছিল না। আসওয়াদ অত্যন্ত নারীমোদী ছিল। তার অন্দর মহলে কম করে হলেও বিশ রূপসী সব সময় শোভা বর্ধন করত। বিভিন্ন স্থান থেকে হাদীয়া হিসেবেও তার কাছে অসংখ্য তরুণী আসত। সে সর্বক্ষণ নারী এবং মদের নেশায় বুদ হয়ে থাকত।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক প্রেরিত হয়ে হযরত কায়েস বিন হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু অত্যন্ত সংগোপনে এবং বেশ-ভূষা বদল করে অবশেষে সান‘আ পৌঁছান। আসওয়াদ সানআ দখল করে তাকে রাজধানী করেছিল। ওদিকে ওবার বিন ইয়াহনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু এক মুসলিম নেতার কাছে পত্র নিয়ে পৌঁছে যান। ঐ মুসলিম নেতা তাকে এই বলে আশ্বস্ত করেন যে, যারা অন্তর থেকে আসওয়াদের আনুগত্য স্বীকার করেনি এমন কয়েকজন মুসলিম নেতাকে দলে ভিড়ানো মোটেও ব্যাপার নয়। তবে কথা হল, এতে আসওয়াদকে ক্ষমতাচ্যুত করা যাবে কিনা সন্দেহ রয়েছে। কারণ, সে কেবল বাদশা নয়। ইয়ামানবাসী তাকে নবী বলে মান্য করে।
সান‘আ এসে হযরত কায়েস বিন হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু এমন এক স্থানে এসে আস্তানা গাড়েন, যেখানে রাসূল প্রেমিক মুসলমান বিদ্যমান ছিল। তারাও ঐ জবাব দেয় যা মুসলিম নেতৃবৃন্দ দিয়েছিল। তবে তারা এমন কোন কথা বলে না যে, তারা এই যোগসাজোশে শরীক হবে না। তারা পূর্ণ দৃঢ়তার সাথে বলে যে, তারা সর্বোচ্চ গোপনীয়তা রক্ষা করে আস্থাভাজন মুসলমানদেরকে এক প্লাটফর্মে এনে সুসংঘবদ্ধ করে তুলবে।
“আমরা এই মিথ্যুক নবীর ভবলীলা সাঙ্গ করতে অধিক অপেক্ষা করতে পারি না।”—এক মুসলমান মন্তব্য করে। “সময় যত বয়ে যাচ্ছে তার গ্রহণযোগ্যতাও তত বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাকে হত্যা করার কোন পরিকল্পনা করা যায় না?”
