বাযান ইসলাম গ্রহণ করে এবং যথারীতি ইয়ামানের শাসক পদে অধিষ্ঠিত থাকে। অল্প কিছুদিন পরে সে মারা যায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরপরে ইয়ামানকে কয়েকটি খণ্ডে বিভক্ত করে প্রত্যেক অংশের স্বতন্ত্র শাসক নির্ধারণ করেন। বাযানের পুত্র শাহারকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সানআ এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের শাসক নিযুক্ত করেন।
এই গুজব ডাল-পালা মেলে বহু শাখা-প্রশাখায় ছড়িয়ে পড়ে যে, আসওয়াদ আনাসী ‘মাজহাজ’ এলাকায় চলে গেছে। খবান নামক এক গুহায় বর্তমানে সে অবস্থান করছে। ক’দিন পর আবার এই গুজব ডানা মেলে সারা ইয়ামানে উড়ে বেড়ায় যে, আসওয়াদ গুহা থেকে বেরিয়ে এসেছে এবং খোদা তাকে নবুওয়াত প্রদান করেছে। এখন সে আর পূর্বের আসওয়াদ আনাসী নয়; ‘রহমানুল ইয়ামান’। সংবাদদাতার কণ্ঠে কোনরূপ সন্দেহের সংমিশ্রণ ছিল না। সে পুরো দৃঢ়তার সাথে সংবাদ পরিবেশন করে ফেরে যে, আসওয়াদ নবুওয়াত লাভ করেছে। সে তাকে নবী বলে মেনে নিয়েছে।
‘গিয়ে দেখে এস”—সংবাদদাতা এ সংবাদ বলে বেড়াতে থাকে—“বিশ্বাস না হলে মাজহাজে নিজে গিয়ে দেখে এস। রহমানুল ইয়ামান মৃতকে জীবিত করেন। অগ্নিস্ফুলিঙ্গকে পুষ্পে পরিণত করেন।…চল, ভাই সবাই চল। আত্মার মুক্তি লক্ষ্যে চল।”
যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিল তাদের গায়েও গুজবের বাতাস লেগেছিল। সংবাদের সত্যতা যাচাই না করে তারাও ইয়ামান অভিমুখে ছুটে চলে। পূর্বে আসওয়াদ জ্যোতিষী থাকায় মানুষ প্রথম থেকেই মনে করত যে, দেবতার পক্ষ হতে সে কোন অলৌকিক শক্তিপ্রাপ্ত। ফলে সে নবুওয়াত দাবী করাতে মানুষ তৎক্ষণাৎ তার দাবী সত্য বলে মেনে নেয়।
খবান গুহার সামনে সর্বক্ষণ মানুষের প্রচণ্ড ভীড় লেগে থাকে। উপচে পড়া জনতা আসওয়াদকে এক নজর দেখার জন্য ভীষণ উদগ্রীব ছিল। সে দিনের বেলায় সামান্য সময়ের জন্য গুহা হতে বের হতো এবং গুহার নিকটবর্তী একটি উঁচু স্থানে দাঁড়িয়ে উপস্থিত জনতাকে কুরআনের আয়াতের মত কিছু আরবি বাক্য শুনাত। সে দাবী করে জানাত যে, তার কাছে এক ফেরেশতার গমনাগমন হয়। আল্লাহর পক্ষ হতে আগত এ ফেরেশতা তাকে একটি করে আয়াত এবং সেই সাথে কিছু গোপন তথ্য জানিয়ে যায়।
আসওয়াদ উৎসুক জনতাকে কিছু অলৌকিক কারসাজিও দেখায়। জ্বলন্ত মশাল মুখে পুরে আবার জ্বলন্ত অবস্থায় তা বের করত। একটি মেয়েকে শূন্যে লটকে রাখে। এমনি আরো কতিপয় ভেল্কিবাজী দেখায় যা মানুষ দেখে তাকে মোজেযা বলত। তার ভাষা যেমন ছিল আবেগী তেমনি কণ্ঠও ছিল বেশ সুরেলা। তার কথার প্রতিটি বর্ণে আকর্ষণ ছিল, যা শ্রোতাকে দারুণ মুগ্ধ করত।
আসওয়াদ ইয়ামানবাসীদের হৃদয় এ শ্লোগানের মাধ্যমে সহজেই জয় করে নেয় যে, ইয়ামানের মালিক ইয়ামানবাসী। এটা কোন করদ রাজ্য নয়। ইতোপূর্বে ইয়ামান এক দীর্ঘ সময় পর্যন্ত ইরানীদের শাসনাধীন ছিল। ইয়ামানের শাসক বাযান ইসলাম কবুল করলে ইরানীদের প্রভাব লুপ্ত হয়ে ইয়ামান হিজাযী মুসলমানদের শাসনাধীনে চলে আসে। এ ছাড়া এখানে ইহুদি, নাসারা এবং অগ্নি-উপাসকরা বাস করত। এরা ইসলামের বিপর্যয় কামনা করত। তারা আসওয়াদ আনাসীর নবুওয়াতের দাবীকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে পর্দার অন্তরালে, কলকাঠি নাড়ায়।
আসওয়াদ তার নবুওয়াতের সত্যতা একটি গাধার মাধ্যমে পেশ করত। তার সামনে একটি গাধা আনা হতো। সে গাধাকে নির্দেশ দিত-“বসো”। গাধা বসে যেত। এরপর বলত—“আমার সামনে মস্তক অবনত কর”—গাধা সেজদার ভঙ্গিতে মাথা নোয়ায়ে দিত। গাধার উদ্দেশে তার তৃতীয় নির্দেশ ছিল—“আমার সামনে হাঁটু গেড়ে বস”—গাধা অমনিই হাঁটু গেড়ে বসে পড়ত।
ইয়ামানবাসী অতি অল্প সময়ে আসওয়াদ আনাসীকে নবী বলে মেনে নেয়। আসওয়াদ তার ভক্তবৃন্দকে সৈন্যদের মত সুসংগঠিত ও বিন্যস্ত করে ফেলে। সে এ ভক্তবাহিনীকে নিয়ে প্রথমে নাযরান অভিমুখে রওয়ানা হয়। সেখানে হযরত খালিদ বিন সাঈদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং হযরত আমর ইবেন হাজম রাযিয়াল্লাহু আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পক্ষ হতে শাসক হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। আসওয়াদের সাথে বিরাট বাহিনী ছিল। বিশাল এ বাহিনী নাযরানে প্রবেশ করলে সেখানকার অধিবাসীরাও তাদের দলভুক্ত হয়ে যায়। পরিস্থিতি এমন ভয়াবহরূপ ধারণ করে যে, মুসলিম শাসকদের জন্য পালিয়ে যাওয়া ছাড়া কোন উপায় ছিল না। পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে দেখে তারা প্রশাসনিক ভবন ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হন।
আসওয়াদ আনাসী প্রথম চোঁটেই বিজয় হাতে পেয়ে উজ্জীবিত ও উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠে। এদিকে তার সৈন্যসংখ্যাও বৃদ্ধি পায়। নাযরানে রাজত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত করে সে এবার সান‘আর দিকে মনোযোগ দেয়। বাযানের পুত্র শাহার ছিল সেখানকার শাসক। সৈন্যসংখ্যা সীমিত থাকা সত্ত্বেও তিনি প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
তার উৎসাহ আর অনুপ্রেরণায় সৈন্যরা দৃঢ়তার সাথে লড়ে যায়। কিন্তু এ জন্যে শাহারকেও যেহেতু একজন সাধারণ সৈন্যের মত লড়তে হচ্ছিল তাই তিনি এক সময় শহীদ হয়ে যান। তার মৃত্যুতে সৈন্যরাও ভেঙ্গে পড়ে। আসওয়াদ যুদ্ধ জিতে নেয়।
আসওয়াদের মোকাবিলায় ঐ সকল ইয়ামানীও যোগ দেয়, যারা মুসলমান ছিল না। কিন্তু পরাজয়ের অবস্থায় কেবল মুসলমানদের জীবন হুমকির সম্মুখীন ছিল। আসওয়াদ বাহিনীর হাতে তাদের মৃত্যু অনিবার্য ছিল। আসওয়াদের হাত থেকে কোন মুসলমান রেহাই পেত না। ফলে মুসলমানরা সুকৌশলে রণাঙ্গন হতে কেটে পড়ে এবং সোজা মদীনায় গিয়ে পৌঁছে।
