ইসলামের শত্রুরা যখন মর্মে মর্মে অনুধাবন করল যে, মুসলমানদেরকে রণাঙ্গনে পরাজিত সম্ভব নয় এবং তারা এটাও হৃদয়ঙ্গম করল যে, ইসলাম মানুষের রক্ত-মাংসের সাথে মিশে গেছে তখন তারা ইসলামের বিরোধিতায় নয়া পদ্ধতি অবলম্বন করে। ইসলামের ছদ্মাবরণে ইসলামের মূলোৎপাটনে এবারের নীলনক্সা প্রণীত হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রেসালাত ও নবুওয়াতের সফলতা দেখে শত্রুপক্ষও বেছে নেয় এ পন্থা। কিছু লোক হুট করে নবুওয়াতের দাবী করে বসে। বনূ আসাদের ‘তুলাইহা’, বনূ হানীফার মুসায়লামা এবং ইয়ামানের আসওয়াদ আনাসী ছিল তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
মূল নাম ছিল আকীলা বিন কা‘ব। কিন্তু অত্যধিক কালো বর্ণের হওয়ায় লোকে তাকে ‘আসওয়াদ’ বলে ডাকতে থাকে। আরবিতে আসওয়াদ মানে কালো। অতঃপর এ নামেই সে পরিচিতি লাভ করে। ইয়ামানের পশ্চিম অঞ্চলে ‘আনাস’ গোত্রের নেতা ছিল সে। এ হিসেবে তাকে আসওয়াদ আনাসী’ বলা হয়। ইতিহাসেও সে এ নামে স্থান পেয়েছে। সে মন্দিরের জ্যোতিষীও ছিল। কুচকুচে কালো হওয়া সত্ত্বেও তার মাঝে এমন আকর্ষণ ছিল যে, মানুষ তার ইশারা পর্যন্ত মেনে নিত অবলীলাক্রমে। তার দেহে মুষ্টিযোদ্ধার মত বিশাল শক্তি থাকায় মহিলারা তার কৃষ্ণবর্ণকে অপ্রিয় জ্ঞান না করে বরং আরো কাছে ভিড়ত। তার সাথে অন্তরঙ্গভাবে মেশার চেষ্টা করত। মন্দিরে থাকার দরুণ সে এই বিশাল জনপ্রিয়তা ও খ্যাতি লাভ করে। কারণ, তৎকালে মানুষ জ্যোতিষীকে দেবতার আশীর্বাদপুষ্ট এবং দূত মনে করত।
ইয়ামানের অধিকাংশ এলাকার লোক ইসলামের ছায়াতলে এসে গিয়েছিল। আসওয়াদের গোত্রেও ইসলাম ঢুকে পড়েছিল। আসওয়াদ ইসলামের বিরোধিতায় টু শব্দটি পর্যন্ত করল না। যেন জনতার সাথে তার কোনই সম্পর্ক নেই। কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে, আসওয়াদ নিজেও মুসলমান হয়ে গিয়েছিল।
তৎকালে ইয়ামানের শাসক ছিল হাসান নামক এক ইরানী। ইরানের সম্রাট ছিল খোসরু পারভেজ (কিসরা)। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দূর দেশে যাদের প্রতি ইসলামের দাওয়াত পত্র পাঠিয়েছিলেন তাদের মধ্যে ইরানের সম্রাট ছিল অন্যতম। তার কাছে পত্র দিতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে হুজাফা রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে প্রেরণ করেন। হযরত আব্দুল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু ইরানপতিকে পত্র হস্তান্তর করলে সে দরবারের দোভাষীকে তার অনুবাদ করে শোনাতে নির্দেশ দেয়।
পত্রের বিবরণ তাকে জানানো হলে সে ক্ষোভে ফেটে পড়ে। দারুণ ক্রুদ্ধ হয়ে সে পত্র টুকরো টুকরো করে বর্জ্যদানিতে নিক্ষেপ করে এবং পত্রবাহক হযরত আব্দুল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে দরবার থেকে বের করে দেয়। হযরত আব্দুল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে মদীনা ফিরে এসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জানান যে, ইরান সম্রাট তাঁর পত্র টুকরো টুকরো করে ফেলে দিয়েছে।
পত্র টুকরো করে ইরান সম্রাটের ক্রোধ প্রশমিত হয় না। ইয়ামান ছিল ইরান সাম্রাজ্যের অন্তর্গত আর সেখানকার গভর্নর ছিল বাযান। ইরান সম্রাট বাযান বরাবর এ নির্দেশ প্রেরণ করে যে, হিজাজে (আরবে) মুহাম্মদ নামে এক ব্যক্তি রয়েছে। সে নিজেকে নবী বলে দাবী করে। তাকে পারলে জীবিত নতুবা তার মাথা কেটে এনে আমার সামনে পেশ কর।
বাযান পত্র পেয়েই দু’জন লোকসহ পত্র মদীনায় পাঠিয়ে দেয়। এ দু’পত্রবাহকের উদ্দেশ্য কি ছিল তা নিয়ে যথেষ্ট মতান্তর রয়েছে। কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জীবিত ধরতে কিংবা হত্যা করে তার মস্তক আনতে বাযান ঐ দু’ব্যক্তিকে প্রেরণ করেছিল। কতিপয় ঐতিহাসিক বলেন, বাযান ইসলাম গ্রহণ না করলেও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ব্যাপারে এতই প্রভাবিত ছিল যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ইরানপতির মতিগতি সম্পর্কে অবগত করাই ছিল বাযানের উদ্দেশ্য। তবে সকল ঐতিহাসিক এ বিষয়ে একমত যে, বাযানের প্রেরিত দু’ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে যায় এবং ইরান সম্রাট যে পত্র বাযানের বরাবর লিখেছিল তা তাকে পেশ করে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পত্র পড়ে একটুও বিচলিত হন না। তিনি পত্র থেকে মুখ তুলে মুচকি হেসে বলেন, ইরান সম্রাট গতকাল রাতেই নিজ পুত্র শেরওয়াহ-এর হাতে নির্মমভাবে নিহত হয়েছে। আজ সকাল থেকে ইরানের সম্রাট শেরওয়াহ।
“গতরাতের হত্যার খবর এত দ্রুত এখানে কিভাবে পৌঁছল?” বাযান কর্তৃক প্রেরিত দু’জনের একজন জিজ্ঞাসা করে এবং বলে—“এটা কি আমাদের সম্রাটের সুস্পষ্ট অবমাননা নয় যে, এই ভুল খবর ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে যে, ইরান সম্রাট তার পুত্রের হাতে নিহত?”
“আমার আল্লাহই এ খবর জানিয়েছেন”—রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “যাও, বাযানকে গিয়ে বল, তার সম্রাট এখন আর খসরু নয়; শেরওয়াহ”। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর পক্ষ হতে এটা জেনেছিলেন।
বাযানের দূত ফিরে গিয়ে তাকে সমস্ত ঘটনা খুলে বলে। তিন-চারদিন পর বাযান ইরান সম্রাট শেরওয়াহ-এর পত্র পায়। পত্রে লেখা ছিল, খসরুকে অমুক রাতে হত্যা করা হয়েছে। এটা ঐ রাতই ছিল, যে রাতের কথা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন। এর কিছুদিন পর বাযান ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত সম্বলিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পত্র পান। বাযান পূর্ব হতে প্রভাবিত ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ‘ইলহাম’ তাকে আরো বেশী প্রভাবান্বিত করে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে এটাও জানান যে, ইসলাম গ্রহণের পরেও সে যথারীতি ইয়ামানের শাসক থাকবে। তার ভূখণ্ডের নিরাপত্তা মুসলমানরা নিশ্চিত করবে।
