“রোমীয়রা এখন কোথায়?” হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন—“বিপদের মুহূর্তে এখন তাদেরকে ডাকতে পার? আমরা তোমার সাহায্য করতে আসব। বন্দী হিসেবে নয়; একজন অতিথি হিসেবে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে তোমাকে নিয়ে যাচ্ছি। তোমার উপর বিন্দুমাত্র জুলুম করা হবে না। জোর করা হবে না।
আমরা শত্রুতা নয়; বন্ধুত্বের বার্তা নিয়ে এসেছি। আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনের গিয়ে অবশ্যই তোমার ভুল ভাঙ্গবে যে, এতদিন তুমি যাকে শত্রু মনে করতে তিনি শত্রু নন, বন্ধুর যোগ্য।”
উকায়দার বিন মালিকের মুখ যেন বোবা হয়ে যায়। তার মুখ থেকে কোন কথা সরে না। তার ঘোড়া লক্ষ্যহীনভাবে কোথাও ঘুরছিল। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু সৈন্যদেরকে উকায়দারের ঘোড়া খুঁজে আনার নির্দেশ দেন। তারা ঘোড়া নিয়ে এলে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু উকায়দারকে তার ঘোড়ায় আরোহণ করান এবং সবাইকে তাবুক অভিমুখে এগিয়ে যাবার নির্দেশ দেন।
তাবুক পৌঁছে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু উকায়দারকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে উপস্থিত করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সামনে সন্ধির শর্তসমূহ পেশ করেন। কিন্তু এমন কোন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ শর্ত ছিল না, যার মধ্যে তার ইসলাম গ্রহণের প্রতি ইশারা ছিল না। তার সাথে মেহমানের মত আচরণ করা হয়। তার উপর কোনরূপ চাপ প্রয়োগ করা হয় না। এই শর্তটি তার খুব মনঃপুত হয় যে, মুসলমানরা তার হেফাজত করবে। উকায়দার কর প্রদানের শর্ত মেনে নিয়ে মিত্রতার সন্ধিপত্র স্বাক্ষর করে। “কেবল মুসলমানরাই আমার সাহায্য করতে পারে”—চুক্তি স্বাক্ষরের পর সে মন্তব্য করেছিল।
উকায়দার বিন মালিক মৈত্রী চুক্তিতে স্বাক্ষর করে মুসলমানদের কর প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কয়েকটি গোত্রপতি নিজেরাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আসে এবং তার বশ্যতা স্বীকার করে। এরূপভাবে অনেক দূর-দূরান্তের এলাকা মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণ ও অধিকারে চলে আসে এবং সকল গোত্র মুসলমানদের মিত্রগোত্রে পরিণত হয়। এদের অধিকাংশ ইসলামও গ্রহণ করে।
এ বিপুল কুটনৈতিক বিজয়ের পর রোমীয়দের সাথে আর যুদ্ধ-বিগ্রহের কোনই প্রয়োজন ছিল না। কারণ, তাদের অগ্রযাত্রার সকল পথ রুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। শুধু তাই নয়; হিরাক্লিয়াসের জন্য এখন এই আশংকা সৃষ্টি হয়ে যায় যে, সে মুসলমানদের সাথে সংঘর্ষের উদ্দেশ্যে মদীনা অভিমুখে রওনা হলে পথের আশে-পাশের গোত্রগুলো তাদের মদীনা পর্যন্ত পৌঁছার অনেক পূর্বেই মরু এলাকায় খতম করে দিবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুজাহিদ বাহিনীকে মদীনা প্রত্যাবর্তনের নির্দেশ দেন। ৬৩০ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে মুসলিম সৈন্যরা মদীনায় এসে উপস্থিত হন।
৩.০৬ নয়া ধর্মমত
॥ ছয় ॥
নয়া ধর্মমত এবং সমর শক্তির দিক থেকেও ইসলাম এমন এক মহাশক্তিতে রূপ নেয় যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক প্রেরিত দূত যেখানেই যেত তাকে রাষ্ট্রীয় অতিথি মনে করা হত এবং তার বয়ে আনা বার্তা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৌখিক দাওয়াতের পাশাপাশি দূরদেশের রাজন্যবর্গের উদ্দেশে দাওয়াতনামা প্রেরণ করতে শুরু করেন। এদের অনেকে ছিল ঔদ্ধত্য, অহংকারী এবং অবিবেচক। তাদের প্রতি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পত্র এ অর্থের হত যে, ইসলাম গ্রহণকে এড়িয়ে যদি সে শক্তি পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে চায়, তবে তা পরীক্ষা করতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে মনে রাখা উচিত, যুদ্ধে পরাজিত হলে তখন বিনা শর্তে মুসলমানদের পূর্ণ আনুগত্য ছাড়া দ্বিতীয় কোন গত্যন্তর থাকবে না।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত খালিদ বিন ওলীদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর নেতৃত্বে এমনি এক প্রতিনিধি দল ইয়ামানের উত্তরে নামরানে প্রেরণ করেন। বনূ হারেছা বিন কা‘ব সেখানকার অধিবাসী ছিল। তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পত্রের জবাব দেয় ঠাট্টা-বিদ্রুপাচ্ছলে। হযরত খালিদ বিন ওলীদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদের বিদ্রুপের সমুচিত জবাব দিতে ৬৩১ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে ৪০০ অশ্বারোহীর এক সুসজ্জিত বাহিনী নিয়ে ইয়ামান রওনা হন। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ইবনে হিশাম লেখেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে যাবার সময় বলে দেন যে, তাদেরকে আক্রমণের জন্য নয়; বরং পয়গাম দিয়ে পাঠানো হচ্ছে মাত্র। যেহেতু বনু হারেছা অবাধ্য প্রকৃতির তাই তাদেরকে পরপর তিনবার দাওয়াত দিতে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে বিশেষভাবে বলে দেয়া হয়। এরপরও যদি তারা ইসলাম গ্রহণ না করে; বরং রক্তপাতের পথই বেছে নেয় তখনই কেবল তাদের উপর চড়াও হওয়ার অনুমতি দেয়া হয়।
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এমন আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে সেখানে গিয়ে পৌঁছান এবং যে অবস্থায় তাদেরকে ইসলামের প্রতি আহ্বান করেন তাতে বনূ হারেছা ভীষণ প্রভাবিত হয়। ফলে তারা কোনরূপ প্রতিরোধ ছাড়াই এক প্রকার বিনা বাক্য ব্যয়ে ইসলাম গ্রহণ করে নেয়। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু সাথে সাথে প্রত্যাবর্তনের পরিবর্তে সেখানেই অবস্থান করতে থাকেন। তাদেরকে ইসলামের বিভিন্ন ধারা ও আহকাম শিক্ষা দিতে থাকেন। ইতিহাস হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে কেবল সমর শাস্ত্রবিদ এবং প্রথম শ্রেণীর সেনাধ্যক্ষ হিসেবে উল্লেখ করলেও নাযরানে এসে তিনি দীর্ঘ ৬ মাস পর্যন্ত শুধু ইসলামের শিক্ষা-দীক্ষায় লিপ্ত থাকেন। যখন তিনি নিশ্চিত হয়ে যান, এখানকার লোকদের অন্তরে ইসলাম বদ্ধমূল হয়ে গেছে তখন ৬৩২ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারী মাসের দিকে তিনি মদীনায় ফিরে আসেন। তার সাথে বনূ হারেছার নেতৃস্থানীয় কিছু লোকও ছিল। তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাতে হাত রেখে পুনঃ ইসলামের উপর বাইয়াত করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের মধ্য হতে একজনকে ‘আমীর’ নিযুক্ত করেন।
