উকায়দার বিন মালিক অত্যন্ত শিকার প্রিয় ছিল। শিকারই ছিল তার শখ। তার এই শিকারপ্রিয়তা এত খ্যাতি লাভ করে যে, যেন তার জন্মই হয়েছে শিকারের জন্য। মরু এলাকায় শিকারের সময় ছিল রাত। দিনের বেলায় পশু-প্রাণী লোকচক্ষুর অন্তরালে এবং আত্মগোপন করে থাকত। ভরা পূর্ণিমা রাত ছিল শিকারের মোক্ষম সময়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শক্তিশালী গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে শত্রুর আচার-আচরণ এবং অভ্যাস সম্পর্কে অবগত হয়েছিলেন এবং হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে উকায়দার সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে জানিয়েছিলেন।
উকায়দার বিন মালিক কয়েকজন অশ্বারোহী নিয়ে বেরিয়ে গেলে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তার উদ্দেশ্য ও মনোভাব যাচাই করেন। তিনি নিশ্চিত হয়ে যান যে, উকায়দার এখনও জানতে পারেনি যে, ৪০০ মুসলমান তার শহরের নিকটে পৌঁছে গেছে। আর সে আমোদ-প্রমোদের সাথে শিকার করতে যাচ্ছে। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু দ্রুত ক্রলিং করে করে সাথীকে নিয়ে পিছনে সরে আসেন। উকায়দার অশ্বারোহীদের নিয়ে চোখের আড়াল হয়ে গেলে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু দৌড়ে লুকানো সৈন্যদের কাছে আসেন। তিনি তাড়াতাড়ি কিছু সৈন্য বাছাই করে নেন। অবশ্য সবাই পূর্ণ প্রস্তুত ছিল। তিনি বাছাই করা এই সৈন্যদেরকে নিজের নেতৃত্বে নিয়ে উকায়দারের পথে রওনা হয়ে যান। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এ ব্যাপারে সতর্ক ছিলেন যে, তিনি উকায়দারকে শহর থেকে এত দূরে যাওয়ার সুযোগ দেন যেখানে তাদের উপর আক্রমণ হলে শহরে তার আওয়াজ পৌঁছবে না।
রাতের পিনপতন নীরবতার মধ্যে এত বেশী ঘোড়ার আওয়াজ চেপে রাখা অসম্ভব ছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই উকায়দার এবং তার সাথীরা টের পেয়ে যায় যে, তাদের পিছনে অশ্বারোহী আসছে। উকায়দারের ভাই হাসসানও তাদের সাথে ছিল। সে বলে, আমি এগিয়ে গিয়ে দেখি, এরা কারা। সে ঘোড়া ঘুরাতেই হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু সৈন্যদেরকে একযোগে আক্রমণের নির্দেশ দেন। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ও তার সৈন্যদের হুঙ্কার থেকেই উকায়দার বুঝতে পারে যে, আক্রমণকারীরা মুসলমান। হাসসান বর্শার সাহায্যে প্রতিরোধ করতে গিয়ে মারা যায়।
উকায়দার অশ্বারোহীদের থেকে কিছুটা পৃথক ছিল। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু দ্রুত ঘোড়া ছুটিয়ে উকায়দারের গতিরোধ করে দাঁড়ান। উকায়দার এমন হতভম্ব হয়ে যায় যে, হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর উপর আক্রমণ করার পরিবর্তে সে রাস্তা হতে এক পাশে সরে যাওয়ার চেষ্টা করে। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু অস্ত্র দ্বারা তাকে আঘাত করলেন না এবং ঘোড়ার গতিও রোধ করলেন না। তিনি নিজ ঘোড়াকে উকায়দারের ঘোড়ার পাশ দিয়ে নিয়ে যান এবং পাশ অতিক্রমের সময় উকায়দারের কোমরে হাত দিয়ে শূন্যে উঁচিয়ে তাকে নিজের ঘোড়ায় তুলে নিয়ে যান।
উকায়দার বিন মালিকের শিকার সঙ্গী এবং বডিগার্ডরা যখন দেখল যে, তাদের নেতা বন্দী এবং তার ভাই মৃত তখন তারা হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বাহিনীর মোকাবিলার পরিবর্তে পলায়নের রাস্তা খুঁজে নিল। স্থানটি গভীর-অগভীর গর্ত এবং টিলা অধ্যুষিত হওয়ায় পলায়নের জন্য বেশ উপযোগী ছিল। ফলে কিছু লোক আহত হলেও সবাই পালিয়ে যেতে সক্ষম হলো। নগরে প্রবেশ করেই তারা দরজা বন্ধ করে দিলো।
হযরত খালিদ বিন ওলীদ রাযিয়াল্লাহু আনহু উকায়দারকে আটকে রাখেন এবং কিছুদূর গিয়ে ঘোড়া থামান। তিনি উকায়দারকে জানান, তার পলায়নের সকল পথ রুদ্ধ। কোন সম্ভাবনা নেই। এরপর তিনি তাকে ঘোড়া থেকে নামান এবং নিজেও নেমে আসেন।
“তুমি নিজেকে অজেয় মনে করতে?” হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে জিজ্ঞাসা করেন।
“হ্যাঁ, আমি নিজেকে একজন অজেয় হিসেবেই মনে করতাম।” উকায়দার বলে—“কিন্তু আপনার নামটা তো এখনও জানতে পারলাম না।
“খালিদ!” হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু জবাবে বলেন—“খালিদ বিন ওলীদ।”
“হ্যাঁ, উকায়দার বলে—“এ নামটা আমি আগেও শুনেছি।…খালিদের পক্ষেই এখানে আসা সম্ভব।”
“না উকায়দার!” হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “আল্লাহর প্রতি প্রগাঢ় ঈমান এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি অনাবিল বিশ্বাস লালন করে এমন প্রত্যেক ব্যক্তিই এখানে আসতে পারে।”
“আমার সাথে কেমন আচরণ করা হবে?” উকায়দার জানতে চায়।
“তোমার সাথে ঐ আচরণ করা হবে না, যা তুমি আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক প্রেরিত দূতের সাথে করেছিলে”—হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু আরো বলেন—“আমাদের পক্ষ হতে উত্তম ব্যবহারের ব্যাপারে নিশ্চিত থাক ইবনে মালিক! আমরা রোমীয় এবং হিরাক্লিয়াসের প্রেরিত হলে আমরা বলতাম, ধন-দৌলত, শহরের সুন্দরী যুবতী এবং শরাবের ড্রাম আমাদের হাতে তুলে দাও। প্রথমে আমোদ-প্রমোদ করতাম এরপর হিরাক্লিয়াসের নির্দেশ মান্য করতাম।”
“হ্যাঁ। উকায়দার বলে—“আপনারা রোমীয় হলে এমনই করতেন। তারা ঠিক এমনটিই করে থাকে। এমন কোন উপঢৌকন নেই যা আমি হিরাক্লিয়াসকে দেইনি। ওলীদের পুত্র! রোমীয়দের সন্তুষ্ট রাখা আমার অস্তিত্বের জন্য অনিবার্য ছিল।”
