সর্বপ্রথম ঈলার অনুগত নেতা নিজেই এসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বন্ধুত্বের পয়গাম কবুল করে এবং নিয়মিত কর প্রদানের শর্ত মেনে নেয়। এর পরে অতি অল্প সময়ের ব্যবধানে আরো দুটি শক্তিশালী গোত্র মুসলমানদের সাথে মিত্রতার চুক্তিতে আবদ্ধ হয় এবং করারোপের শর্তও মেনে নেয়।
‘আল যাওফ’ নামে একটি স্থান ছিল। তৎকালে তাকে ‘দাওমাতুল জানদাল’ বলা হতো। ভয়ঙ্কর মরুভূমি অধ্যুষিত ছিল এ এলাকা। সে সময়কার বর্ণনা হতে জানা যায় যে, এ স্থানে এমন বালুর টিবি এবং প্রশস্ত প্রান্তর ছিল যাকে অজেয় মনে করা হতো। দাওমাতুল জান্দালের শাসক ছিল উকায়দর বিন মালিক। তার রাষ্ট্রের অবস্থান একটি অজেয় এলাকায় থাকায় সে নিজের এলাকাকে দুর্ভেদ্য ও অজেয় মনে করত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উকায়দর বিন মালিকের কাছে যে প্রতিনিধি পাঠিয়েছিলেন তিনি এ জবাব নিয়ে ফিরে আসেন যে, উকায়দর বন্ধুত্বের রাখি-বন্ধনও গ্রহণ করেনি আবার কর দিতে সম্মত নয়। বরং সে প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছে যে, মুসলমানদেরকে সে বড় শত্রু বলে মনে করে এবং ইসলামের ক্ষতি সাধনে সে কোন ক্রটি করবে না।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত খালিদ বিন ওলীদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে তলব করে বলেন, ৪০০ অশ্বারোহী নিয়ে যাও এবং উকায়দর বিন মালিককে জীবিত ধরে আন।
উকায়দর দরবারে সর্বোচ্চ মসনদে আসীন। তার পশ্চাতে বিবস্ত্রপ্রায় দু’তরুণী দাড়িয়ে পাখা টেনে বাতাস করছিল। অন্যান্য বাদশার মত উকায়দরের চেহারাও ঝলকিত এবং প্রতাপদীপ্ত।
“ইবনে মালিক!” এক সিনিয়র মন্ত্রী এবং সিপাহসালার দাড়িয়ে বলে— “আপনার রাজত্ব দীর্ঘজীবী হোক। ঈলা, যারবা, আজরুহ এবং মুকনানার গোত্রসমূহ মুসলমানদের সাথে মিত্রতার চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়ার খবর আপনি শুনেছেন কি? আজ তারা মিত্রত্ব বরণ করেছে আর ক’দিন পরে শোনা যাবে তারা কুরাইশী মুহাম্মাদের ধর্মমতও মেনে নিয়েছে।”
‘সম্মানিত মন্ত্রী কি এই পরামর্শ দিতে চাচ্ছেন যে, আমরাও মুসলমানদের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে যাই?” উকায়দর বিন মালিক বলে—“এমন কোন পরামর্শ আমরা গ্রহণ করতে প্রস্তুত নই।”
“না, ইবনে মালিক! আমি সে পরামর্শ দিচ্ছি না। আমার উদ্দেশ্য হলো”—প্রবীণ মন্ত্রী বলে, “বয়স বেশী হওয়ায় আমার চোখ যা দেখেছে তা আপনার চোখ দেখেনি। আমি বিশ্বাস করি, আপনি মুসলমানদের সবচে বড় দুশমন। কিন্তু আমার কাছে লাগছে, আপনি শত্রুকে এত তুচ্ছ জ্ঞান করছেন যে, তারা বাস্তবে আমাদের উপর আক্রমণ করলে তাদের হাত থেকে পরিত্রাণের উপায় নিয়ে আপনি কোন পরিকল্পনা গ্রহণ করছেন না।
“পবিত্র ক্রুশের শপথ।” উকায়দর বিন মালিক বলে—“আমাদের প্রাকৃতিক অবস্থানই আমাদের রাজত্ব অক্ষুন্ন রাখবে। মুসলমানরা এখানে আসার দুঃসাহস করলে এখানকার ভয়ঙ্কর মরুর তীষ্ণার্ত বালুরাশি তাদের দেহের রক্ত চুষে নিবে। দাওমাতুল যান্দালের চারপাশে যে সমস্ত বালু ও মাটির টিলা রয়েছে খোদা এগুলোকে আমার রাজত্বের অতন্দ্র প্রহরী রূপে দাঁড় করিয়ে রেখেছেন। এগুলো অক্ষুন্ন থাকতে কেউ আমাদের পরাভূত করতে পারবে না।”
উকায়দারের দরবারে যখন এই আলোচনা চলছে, তখন হযরত খালিদ বিন ওলীদ রাযিয়াল্লাহু আনহু চারশ জানবাজ মুজাহিদ নিয়ে অর্ধেক পথ চলে এসেছেন। পরের দিনই তারা ঐ মরুভূমিতে প্রবেশ করেন ঐতিহাসিকগণ যাকে অজেয় লিখেছেন। এখানে পা দিয়েই মুজাহিদদের চেহারা বালুর ন্যায় শুষ্ক হয়ে যায়। অশ্বের ক্ষীণ গতিই বলে দিচ্ছিল, এই পথচলা এবং তৃষ্ণা তাদের সহ্যসীমার বাইরে। কিন্তু হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর নেতৃত্ব তাদের অন্তরে নয়াপ্রাণ সঞ্চার করেছিল।
দাওমাতুল জান্দাল অত্যন্ত মনোলোভা এবং চিত্তাকর্ষক নগরী ছিল। নগরের চতুর্দিকে সুদৃঢ় প্রাচীর ছিল। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু শ্বাসরুদ্ধকর সফর শেষে এই নগর প্রাচীরের কাছে গিয়ে পৌঁছান। তিনি অশ্বারোহীদেরকে একটি প্রশস্ত নিম্নবর্তী এলাকায় লুকিয়ে রাখেন। সৈন্যদের শারীরিক অবস্থা এত নাজুক ও দুর্বল ছিল যে, কমপক্ষে একদিন একরাত তাদের বিশ্রামের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদেরকে পুরো প্রস্তুত এবং সতর্কাবস্থায় রাখেন।
ইতোমধ্যে সূর্য অস্ত যায়। রাত ক্রমে ঘনীভূত হতে থাকে। শশী দূর আকাশের গায়ে ভেসে ভেসে পূর্ণ ঔজ্জ্বল্য ছড়িয়ে চমকাতে থাকে। মরুভূমির চাদের আলো অত্যন্ত নির্মল, স্বচ্ছ ও পরিষ্কার ছিল। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এক সৈন্যকে সাথে নিয়ে নগর প্রাচীরের দিকে অগ্রসর হন। তিনি ইতোমধ্যে হাল্কা জরিপ চালিয়ে দেখেন যে, এত বড় শহর অবরোধ করতে মাত্র ৪০০ সৈন্য যথেষ্ট নয়। ঊর্ধ্বে তাদের অন্তরীণ কিংবা নজরবন্দী করা সম্ভব মাত্র। দ্বিতীয় আরেকটি পথ ছিল সরাসরি তাদেরকে লড়ার আহ্বান জানানো।
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু কেল্লার ফটকের কিছু দূরে একটি উঁচু স্থানে বসে থাকেন। চাঁদের আলো এত স্বচ্ছ ছিল যে, প্রাচীরের উপর থেকে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে দেখা যাবার সমূহ সম্ভাবনা ছিল।
হঠাৎ কেল্লার ফটক নড়ে চড়ে ওঠে। দরজার পাল্লা ক্রমেই ফাক হয়ে দু’টি দু’দিকে সরে যায়। কেল্লার ফটক এখন উন্মুক্ত। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ফটক উন্মুক্ত দেখে মনে করেন, হয়ত উকায়দার সসৈন্যে বেরিয়ে আসছে এবং তাদের উপর আক্রমণ করবে। কিন্তু উকায়দারের পেছনে মাত্র কয়েকজন অশ্বারোহী বের হয়। তারা বেরিয়ে যেতেই ফটক বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এর মনে পড়ে যায় যে, তাবুক থেকে রওয়ানার সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলেছিলেন, “শিকাররত অবস্থায় তোমরা উকায়দারের সাক্ষাৎ পাবে।”
