মুনাফেক এবং ইহুদীবাদের প্রোপাগাণ্ডা সত্ত্বেও মুসলমানদের সিংহভাগ প্রস্তুতি গ্রহণ করে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সার্বিক প্রস্তুতি নিতে বেশী দিন ব্যয় করেন না। অক্টোবরের শেষ দিকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নেতৃত্বে যে সেনাবাহিনী যুদ্ধযাত্রা করার জন্য চূড়ান্তভাবে তৈরী হয় তার সংখ্যা ছিল ৩০ হাজার। দশ হাজার ছিল আরোহী। এই মুজাহিদ বাহিনীতে মদীনা ছাড়াও মক্কা এবং যে সমস্ত গোত্র আন্তরিকভাবে ইসলাম গ্রহণ করেছিল তারা সক্রিয়ভাবে অন্তর্ভুক্ত ছিল। আসন্ন যুদ্ধ ছিল মক্কা-মদীনা বনাম বিশাল রোম শক্তির অসম লড়াই। জগদ্বিখ্যাত যোদ্ধা রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াসের সামরিক বাহিনী ছিল মুজাহিদ বাহিনীর এবারের প্রতিপক্ষ।
“৬৩০ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর মাসের শেষ সপ্তাহে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নেতৃত্বে মুজাহিদ বাহিনী রওনা হয়ে যায়। সূর্যের তীব্র উত্তাপে ভূ-পৃষ্ঠ জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরিতে পরিণত হয়েছিল। বালু এত গরম ছিল যে, উট-ঘোড়ার পা ঝলসে যাচ্ছিল। এ বছর আরবে দুর্ভিক্ষ এবং মঙ্গা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। যার ফলে খাদ্য রসদেও যথেষ্ট ঘাটতি ছিল। পানিও ছিল কম। মুজাহিদরা এই তীব্র গরমের মাঝেও শুধু এ আশঙ্কায় পানি পান করতেন না যে, না জানি পানি এখান থেকে কত দূরে। কিছুদূর গিয়েই মুসলমানদের ঠোঁট-মুখ শুকিয়ে যায়। পানির অভাবে গলা শুকিয়ে কাষ্ঠ হয়ে যায়। কিন্তু তারপরেও তাদের মুখে আল্লাহর নাম জারী ছিল এবং তারা এমন প্রত্যয়দীপ্ত ছিল যা লেখা কিংবা মৌখিক বর্ণনার ঊর্ধ্বে। কল্পনায় তার একটি নমুনাচিত্র ধারণ করা যেতে পারে মাত্র। নতুবা শব্দের গাঁথুনীতে কাগজের পিঠে তার স্বরূপ তুলে ধরা সত্যই দুরূহ, অসম্ভব। তাদের এহেন বর্ণনাতীত ত্যাগ-তিতীক্ষার প্রতিদান একমাত্র আল্লাহ পাকই দিতে পারেন। কোন মানুষের পক্ষে তার বিনিময় দেয়া সম্ভব নয়। চরম প্রতিকূল এবং অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা সত্ত্বেও মুজাহিদ বাহিনী তীব্র প্রেরণা এবং আরাধ্য সাধনার মন্ত্রে উজ্জিবীত হয়ে আসমান-জমিনের উত্তপ্ত অঙ্গারের বুক চিরে চিরে চলতে থাকে।
দীর্ঘ প্রায় ১৪ দিন পর মুজাহিদ বাহিনী সিরিয়ার সীমান্তবর্তী এলাকা তাবুকে গিয়ে পৌঁছে। ঐতিহাসিকগণ বিস্ময় প্রকাশ করে লেখেন, প্রতিকূল অবস্থার মধ্য দিয়ে মুজাহিদ বাহিনী যে পথ ১৪ দিনে অতিক্রম করে, স্বাভাবিক অবস্থা এবং আবহাওয়া অনুকুল থাকার সময়েই এতদিন লাগত এ পথ অতিক্রম করতে। এ পথটি ১৪ দিন সফরের হওয়ায় রসিক মুসাফিররা একে ‘চৌদ্দ মঞ্জিল’ বলত। কোন কোন ঐতিহাসিক এই চৌদ্দ মঞ্জিলকে ১৪ দিন বলে অভিহিত করেছেন। মুসলিম বাহিনী তাবুকে পৌঁছলে এক গোয়েন্দা এসে সংবাদ দেয় যে, শত্রু সেনাদের যে বাহিনীটি উরদুন অভিমুখে রওনা হয়ে যায় তারা এখন দেমাস্কে অবস্থান করছে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সৈন্যদেরকে তাবুকে ক্যাম্প স্থাপনের নির্দেশ দেন এবং করণীয় নির্ধারণে জরুরী পরামর্শ করতে কমান্ডারদের ডেকে পাঠান। সকলের ধারণা ছিল, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাবুক হতে সামনে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দিবেন এবং দেমাস্ক বা দেমাস্কের আশে-পাশে চূড়ান্ত লড়াই সংঘটিত হবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপস্থিত কমান্ডারদের সামনে পরিস্থিতি তুলে ধরে পরামর্শ আহ্বান করেন। রোমকদের সাথে যুদ্ধ অনিবার্য—এমন বিশ্বাস মাথায় রেখে সবাই পরামর্শ প্রদান করে। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকলকে বিস্ময়ের ঘূর্ণাবর্তে ঠেলে দিয়ে জানান যে, সৈন্য তাবুক থেকে সামনে অগ্রসর হবে না।
ঐতিহাসিকদের অভিমত, সামনে অগ্রসর না হওয়ার এই সিদ্ধান্তের পেছনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রভূত সমর-বিচক্ষণতা কাজ করেছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনা ত্যাগের প্রাক্কালে বলেছিলেন, রোমকদের গতিরোধ করা হবে। তিনি নিজ ভূখণ্ড ছেড়ে এত দূরে এবং তীব্র গরমের মাঝে লড়াই শুরু করতে চান না। তিনি উল্টো হিরাক্লিয়াসের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন যে, সে চাইলে নিজ ভূখণ্ড ছেড়ে তাবুকে এসে লড়াই করতে পারে। মুজাহিদ বাহিনী যুদ্ধ করার অভিপ্রায়ে গিয়েছিল। তাদের অন্তরে কোন বিভ্রান্তি কিংবা কোন ভীতি ছিল না। কিন্তু যুদ্ধ সব সময় পেশীশক্তির দাপটে হয় না। বুদ্ধিবৃত্তিক পদক্ষেপ এবং কুশলী নীতি অনেক সময় গ্রহণ করতে হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এখানে প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতাকে কাজে লাগান। রোমকরা যাতে মদীনায় যেতে না পারে তার জন্য এ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন যে, অত্র এলাকার যারা রোমকদের অধীনে ছিল তাদেরকে নিজেদের অধীনে আনতে প্রতিনিধি দল গঠন করেন। ৪টি উল্লেখযোগ্য স্থানে এই প্রতিনিধি দল পাঠানোর পরিকল্পনা নেয়া হয়। আকাবা তথা ঈলা, মুকনানা, আজরুহ এবং যারবা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুদ্ধের পরিবর্তে বন্ধুত্বের শর্তাবলী নির্ধারণ করে এ সমস্ত স্থানে প্রতিনিধি দল প্রেরণ করেন। একটি শর্ত এই ছিল যে, যারা ইসলাম গ্রহণ করবে না তাদেরকে জোরপূর্বক যুদ্ধে নিয়ে যাওয়া হবে না। আরেকটি শর্ত ছিল, তাদের প্রতি কেউ চড়াও হলে তাদের প্রতিরোধ করাকে মুসলমানরা দায়িত্ব ও কর্তব্য বলে জ্ঞান করবে। এর বিনিময়ে ইসলামী রাষ্ট্র তাদের থেকে কর আদায় করবে।
