৬৩০ খ্রিস্টাব্দের ২৩ ফেব্রুয়ারী। ৮ম হিজরীর ৪ জিলক্বদ। এ দিনে তায়েফের অবরোধ উঠিয়ে নেয়া হয়। অবরোধ প্রত্যাহার হওয়ায় বনু ছাকীফদের মাঝে আনন্দ প্রতিক্রিয়া পড়ার দরকার ছিল। কিন্তু বাস্তবে হয় এর বিপরীত। তাদের মাঝে নতুন এই উদ্বেগ ও আতঙ্ক দেখা দেয় যে, মুসলমানরা এখন চলে গেলেও যে কোন সময় আবার আসতে পারে এবং তখন এমন প্রতিশোধ নিবে যে, ইট থেকে ইট পৃথক করে ফেলবে। খোদ মালিক বিন আওফের চিন্তা-চেতনায় পরিবর্তন আসে। জ্যোতিষীর মিথ্যা ভবিষ্যদ্বাণী এবং হুনায়নে মুসলমানদের অগ্নিঝরা আক্রমণ তাকে নিজের আকীদা-বিশ্বাস দ্বিতীয়বার নিরীক্ষণ করতে বাধ্য করে।
অবরোধ তুলে মুসলমানরা ২৬ ফেব্রুয়ারী যাঅরানা নামক স্থানে গিয়ে পৌঁছে। হুনায়ন যুদ্ধের গনীমতের মাল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এখানে জমা করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। এই যুদ্ধলব্ধের মধ্যে ৬ হাজার নারী, বাচ্চা এবং হাজার হাজার উট, বকরী ছিল। যুদ্ধ সাজ-সরঞ্জামও ছিল প্রচুর। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সমস্ত নারী, বাচ্চা এবং উট, বকরী সৈন্যদের মাঝে বণ্টন করে দেন।
মুজাহিদ বাহিনী যাঅরানা থেকে রওনা হওয়ার উপক্রম. এমন সময় হাওয়াযিন গোত্রের কতিপয় নেতা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সকাশে এসে ঘোষণা করে যে, হাওয়াযিনের সমস্ত গোত্র ইসলামের আনুগত্য স্বীকার করেছে। সাথে সাথে তারা যুদ্ধ সম্পদ হিসেবে যা ছেড়ে গিয়েছিল তা ফেরৎ দানেরও আহ্বান জানায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞাসা করেন, সহায়-সম্পদ তোমাদের বেশী প্রিয়, নাকি স্ত্রী-স্বজন? নেতারা উত্তরে জানায়, স্ত্রী-পুত্র ফেরৎ পেলেই তারা সন্তুষ্ট। সহায়-সম্পদ মুসলমানরা ভোগ করুক।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামকে ডেকে হাওয়াযিনদের স্ত্রী-বাচ্চাদের ফিরিয়ে দিতে বলেন। সাহাবায়ে কেরাম স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাদের ফিরিয়ে দেন।
হাওয়াযিনদের ধারণায় ছিল না যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন অভাবিত উদারতা প্রকাশ করবেন কিংবা সৈন্যরা প্রাপ্ত মালে গনিমতের অংশ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ফিরিয়ে দিবেন। মুসলমানদের এই অসাধারণ উদারতার ফল এই হয় যে, হাওয়াযিনরা ইসলামকে মনে-প্রাণে গ্রহণ করে। হাওয়াযিন নেতারা গোত্রের নারী ও শিশুদের আজাদ করে নিয়ে যায়। মুসলমানদের বিশাল এই উদারতার ঢেউ তায়েফের কেল্লা পার হয়ে মালিক বিন আওফের খাস মহলে গিয়েও পৌঁছে। মুসলিম বাহিনী যাঅরানা ছাড়ার আগেই একদিন মালিক বিন আওফ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে এসে হাজির হয় এবং কলেমা পড়ে মুসলমান হয়ে যায়।
আরব ভূখণ্ড হতে দেবতা লাতের প্রভুত্ব এবং খোদাত্ব চিরদিনের জন্য মুছে যায়।
॥ পাঁচ ॥
ইসলাম সীমিত পরিমণ্ডলে অবস্থান করাকালীন তার শত্রুও ছিল ধারে-কাছের। মক্কায় থাকা অবস্থায় কুরাইশরা আর মদীনায় চলে গেলে মক্কাবাসী ও তার আশে-পাশের গোত্রসমূহ। মদীনার পর ইসলাম মক্কায়ও ছড়িয়ে পড়লে এবং বৃহত্তর মক্কা-মদীনার সিংহভাগ মানুষ ইসলামের ছায়াতলে এসে গেলে অর্থাৎ ইসলাম একটি বৃহৎ শক্তি ও ধর্মে রূপ নিলে এবং আরব ভূখণ্ডে এর বিরোধিতা করার মত কেউ না থাকলে আরব ভূখণ্ডের বহু দূর-দূরান্তের রাষ্ট্রগুলো ইসলামের নতুন শত্রুতে পরিণত হয়। এর প্রধান কারণ ছিল ইসলামের ক্রম বিস্তার। ইসলামের এহেন দ্রুত প্রচার-প্রসার দেখে দূর-দূরান্তের রাজা-বাদশাহদের মসনদ কেঁপে উঠে। অবশ্য ইতোমধ্যে মুসলমানরাও বিপুল সমর শক্তিতে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু তাই বলে ইসলামের ব্যাপক প্রচার-প্রসারে সমরশক্তির অবদান ছিল না; বরং খোদ ইসলামের মধ্যেই এমন এক আকর্ষণ ও সম্মোহনী শক্তি ছিল যে, যে-ই আল্লাহর কালাম শুনত মুসলমান হয়ে যেত।
মুসলমানরা তাদের গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক দূর-দূরান্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে রেখেছিল। চৌকস গোয়েন্দারা গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থান করত। ৬৩০ খ্রিস্টাব্দে এক গোয়েন্দা টিম এসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এ রিপোর্ট প্রদান করে যে, রোমীয়রা সিরিয়ায় সৈন্য সমাবেশ করছে। যার অর্থ হচ্ছে, তারা মুসলমানদের সাথে যুদ্ধ করতে চায়। ক’দিন পর আরেক গোয়েন্দা জানায়, রোমীয়রা কিছু সৈন্য উরদুন অভিমুখে পাঠিয়ে দিয়েছে।
৬৩০ খ্রিস্টাব্দ অক্টোবর মাস। ভরা গ্রীষ্ম মৌসুম। চামড়া দগ্ধকারী লু-হাওয়া অনবরত বয়ে চলছে। দিনের বেলায় রৌদ্রের প্রখর তাপে অল্পক্ষণ অবস্থানও অসম্ভব ছিল। এমনি প্রতিকূল আবহাওয়া সত্ত্বেও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন যে, রোমক বাহিনী এখানে এসে আমাদের উপর আক্রমণ করার আগেই আমরা এগিয়ে গিয়ে তাদের গতিরোধ করব।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এই ঘোষণায় ইসলাম বিদ্বেষী কুচক্রী মহল স্বরূপে ময়দানে আবির্ভূত হয়। তারা বিভিন্ন প্রোপাগাণ্ডা এবং গুজব ছড়াতে চেষ্টা করে। মুসলমানরা যাতে মদীনা হতে না বের হয় তার জন্য এই বিদ্বেষী মহল নানা অপতৎপরতায় মেতে ওঠে। এদের মধ্যে অন্যতম ছিল কিছু নামধারী মুসলমান। এরা বাহ্যিকভাবে নিজেদের মুসলমান বলে পরিচয় দিলেও আসলে তারা ছিল কাফের। বিভীষণ কপটচারী। মুসলমানরা যুদ্ধ-প্রস্তুতিতে সর্বাত্মক আত্মনিয়োগ করলে এই ঘৃণ্য মুনাফিক শ্রেণী তাদেরকে এই বলে হীনবল ও আতঙ্কিত করে যে, চলতি আবহাওয়ার মধ্যে যুদ্ধযাত্রা করলে প্রখর গরম এবং পানির স্বল্পতায় পথিমধ্যেই সবাই মারা পড়বে। যুদ্ধবিরোধী এ অপতৎপরতার সাথে ইহুদীবাদের গভীর যোগসাজোশ ছিল। দাবার গুটি মূলত এদের হাতেই ছিল। পর্দার অন্তরাল হতে কলকাঠি এরাই নাড়াত।’
