তায়েফে যেতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে পথ ধরেন তা মুলীহ উপত্যকার মধ্য দিয়ে এঁকে বেঁকে গিয়ে করণ উপত্যকার সাথে মিলেছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সৈন্যদেরকে করণ উপত্যকার মধ্য দিয়ে না নিয়ে তায়েফের উত্তর-পশ্চিমে সাত মাইল দূরে নাখিব এবং সাবেরা এলাকার অভ্যন্তরে ঢুকে পড়েন। এলাকাটি ছিল অনেকটা সমতল এবং উন্মুক্ত। এখানে পাহাড় এবং প্রান্ত ছিল না বললেই চলে। মুজাহিদ বাহিনী ৬৩০ খ্রিস্টাব্দের ৫ ফেব্রুয়ারি মোতাবেক ৮ম হিজরীর ১৫ শাওয়াল ঐ এলাকা দিয়ে তায়েফের নিকটে গিয়ে পৌঁছায়, যা ছিল তায়েফবাসীদের ধারণা ও চিন্তার বাইরে। মুজাহিদ বাহিনীর চলার গতি যথেষ্ট দ্রুত ছিল। অগ্রভাগে যথারীতি বনু সালীম ছিল। আর তাদের নেতৃত্বে ছিলেন হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু। আশা অনুযায়ী তায়েফের নিকট পর্যন্ত কোন শত্রুসৈন্য নজরে পড়ে না। ঐতিহাসিকদের মতে এর কারণ এই ছিল যে, উন্মুক্ত প্রান্তরে লড়ার ঝুঁকি নেয়ার সাহস মালিক বিন আওফের ছিল না।
হুনায়ন যুদ্ধে বনু হাওয়াযিন অধিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ছাকীফ গোত্রও লড়েছিল। কিন্তু যে ঘোরতর যুদ্ধের সম্মুখীন বনু হাওয়াযিন হলো, বনু ছাকীফ তেমনটি হলো না। তারপরেও বনু ছাকীফ পিছু হটে এসেছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও এ ব্যাপারে পূর্ণ সতর্ক ছিলেন যে, বনু ছাকীফের মনোবল চাঙ্গা এবং তারা ক্লান্তও নয়। তারা নিজ ভূখণ্ড রক্ষার দীর্ঘ লড়াই চালিয়ে যাবে।
এটা কার ভুল ছিল তা জানা যায় না যে, মুসলমানরা নগর প্রাচীরের ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে এসে দাঁড়ায়। তারা সেখানে সেনাছাউনী তৈরীরও পরিকল্পনা করে। কিন্তু হঠাৎ প্রাচীর ফেঁড়ে বনু ছাকীফের উদয় হয় এবং তারা মুসলমানদের উপর মুষলধারে তীরবর্ষণ করে। অতর্কিত এ আক্রমণে অনেকে আহত এবং অনেকে শহীদ হন। মুসলিম বাহিনী পিছু হটে আসে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে অবরোধের কমান্ডার নিযুক্ত করেন। তিনি অতি অল্প সময়ের মধ্যে পুরো নগরের অবরোধ সম্পন্ন করেন। যে পথে শত্রুর পলায়নের বেশী আশঙ্কা ছিল ঐ পথে তিনি অধিক সৈন্য মোতায়েন করেন।
শহরের প্রতিরক্ষা বড়ই মজবুত ছিল। ছাকীফ গোত্র ছিল পূর্ণ প্রস্তুত। তীর চালাচালি ছাড়া দুর্ভেদ্য কেল্লার বিরুদ্ধে মুসলমানদের আর কিছু করার ছিল না। মুজাহিদরা এ নির্ভীক সাহসিকতাও প্রদর্শন করে যে, তারা নগর প্রাচীরের নিকটে গিয়ে বনু ছাকীফের ঐ সমস্ত তীরন্দাজদের প্রতি তীর ছুঁড়ে, যারা প্রাচীরের উপর দাঁড়িয়ে তীর ছুড়ছিল। বনু ছাকীফ প্রাচীরের উপরে এবং নিজেদের আড়াল করার সুব্যবস্থা থাকায় তাদের তীর মুসলমানদের বেশী ক্ষতি করতে থাকে। মুসলিম তীরন্দাজ বাহিনী সামনে অগ্রসর হয়ে আবার পিছে ফিরে আসতে থাকে। মুসলমানদের আহতের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। কমান্ডার হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর পুত্র হযরত আব্দুল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু বনু ছাকীফের তীরে শহীদ হয়ে যান।
৫/৬ দিন এভাবে গড়িয়ে যায়। ইসলামী ইতিহাসের প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব হযরত সালমান ফার্সী রাযিয়াল্লাহু আনহুও সৈন্যদের সাথে ছিলেন। খন্দক যুদ্ধে যে দৈর্ঘ্য পরিখা খনন করা হয়েছিল তা হযরত সালমান ফার্সী রাযিয়াল্লাহু আনহু-এরই সমর বিচক্ষণতা ছিল। ইতোপূর্বে আরবরা পরিখার মাধ্যমে প্রতিরক্ষা সম্বন্ধে অবগত ছিল না। হযরত সালমান ফার্সী রাযিয়াল্লাহু আনহু ৫/৬ দিনেও অবরোধ কার্যকর না হতে দেখে তিনি শহরে পাথর নিক্ষেপের জন্য মিনজানিক পাথর নিক্ষেপণ যন্ত্র তৈরী করান। কিন্তু এতেও কাজ হয় না।
হযরত সালমান ফার্সী রাযিয়াল্লাহু আনহু বৃহদাকার একটি চামড়ার ঢাল তৈরী করান। কয়েকজন লোক লাগত তা নড়াচড়া করতে। এ ঢালের সুবিধা এই ছিল যে, অনেকে এর ছত্রছায়ায় নিরাপদে কেল্লার দরজা পর্যন্ত চলে যেতে পারত। হযরত সালমান ফার্সী রাযিয়াল্লাহু আনহু নির্মীত ঢালটি ছিল একটি গাভীর চামড়া দ্বারা তৈরী। একদল সৈন্য এই ঢালের ছত্রছায়ায় কেল্লার সবচে বড় দরজার দিকে এগিয়ে যায়। শত্রু পক্ষের অসংখ্য তীর এসে ঢালের পিঠে বিদ্ধ হতে থাকে। সৈন্যদের কোন ক্ষতি হয় না। এতে শত্রুরা শিউরে ওঠে। তারাও দ্রুত নব পলিসি গ্রহণ করে। মুসলমানরা চামড়ার বৃহৎ ঢাল নিয়ে যখন কেল্লার প্রাচীরের গা ঘেঁষে দাঁড়ায় এ সময় বনু ছাকীফ প্রাচীরের উপর থেকে জ্বলন্ত অঙ্গার, জ্বলন্ত লৌহটুকরা এত বেশি নিক্ষেপ করে যে, স্থানে স্থানে ঢালের চামড়া পুড়ে যাওয়ায় তা তীর থেকে হেফাজতের আর উপযুক্ত থাকে না। আরবদের জন্য এই চর্মঢাল নতুন আবিষ্কার হওয়ায় এবং তা প্রথম পরীক্ষায় ব্যর্থ হওয়ায় সৈন্যরা ঢালটি অকুস্থলে ফেলে সৈন্যশিবিরে দৌড়ে চলে আসে। বনু ছাকীফ এই সৈন্যদের উপর তীর নিক্ষেপ করলে অনেকে আহত হন।
আরো দশদিন গত হয়। অবরোধ এবং প্রতিরক্ষার ফলাফল এই এসে দাঁড়ায় যে, মুসলমানরা তীর নিক্ষেপ করতে করতে সামনে অগ্রসর হত এবং একটু পরে তীর খেতে খেতে পিছে ফিরে আসত। তবে মুসলমানদের অনমনীয় মনোভাব এবং হার না মানার দৃঢ়তা দেখে বনু ছাকীফের মাঝে এক অজানা আতঙ্ক ও ভীতি ছেয়ে গেল। আর এ কারণেই তারা বাইরে বেরিয়ে মুসলমানদের উপর আক্রমণ করার সাহস করে না। পরিশেষে একদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাধারণ সভা আহ্বান করেন। বিভিন্ন পর্যায়ের কমান্ডারদের নিয়ে অনুষ্ঠিত এই সমাবেশে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন যে, আপাতদৃষ্টিতে অবরোধের সফলতার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে করণীয় বের করতে তিনি অভিজ্ঞ কমান্ডারদের পরামর্শ আহ্বান করেন। হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং হযরত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু অবরোধ তুলে নেয়ার ব্যাপারে অভিমত পোষণ করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও অবরোধ তুলে নেয়ার পক্ষপাতী ছিলেন। কারণ, মক্কার দিকে নজর দেয়ার খুবই প্রয়োজন ছিল তার। মাত্র ক’দিন আগে মক্কা বিজয় হয়। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, এ সময়ে দীর্ঘদিন তায়েফে অবস্থান করলে মক্কায় শত্রুরা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে।
