মালিক বিন আওফ শয্যায় মাথা ঝুঁকিয়ে বসা ছিল। সর্বাধিক প্রিয়তমা স্ত্রীও ছিল তার পাশে বসা। এ সময় ভৃত্য এসে জানায় যে, এক অপরিচিত নারী এসেছে। তার পোষাক রক্ত-রঞ্জিত এবং তার হাতে খুনে ভরা একটি খঞ্জরও আছে। মালিক বিন আওফ এ সংবাদে জেগে ওঠে। সে চমকে উঠে বলে, তাকে ভিতরে নিয়ে এস। ভৃত্য চলে যায়। মালিক এবং তার স্ত্রীর দৃষ্টি দরজা মাঝে আটকে যায়।
তরুণী দরজায় এসে দাঁড়ায় এবং বলে—“যে কাজ আপনি করতে পারেন নি তা আমি করে এসেছি। আমি সন্ন্যাসীকে হত্যা করেছি।”
মালিক বিন আওফ থ মেরে যায়। তার চোখে-মুখে আতঙ্ক এবং উদ্বেগের চিহ্ন ফুটে ওঠে। সে মুহূর্তে তলোয়ার তুলে নেয় এবং খাঁপ ছুড়ে ফেলে তরুণীর উদ্দেশে পা বাড়ায়। তার স্ত্রী দৌড়ে উভয়ের মাঝে এসে দাঁড়ায়।
“তরুণী যা করেছে ঠিকই করেছে। স্ত্রী তার গতিরোধ করে বলে—“তোমাকে যে ভুয়া আশ্বাস দিয়েছিল এবং মিথ্যা ইশারার কথা বলেছিল সে মারা গেছে। ভালই হয়েছে।”
“তুমি জান না আমাদের দিকে কি মহাবিপদ ধেয়ে আসছে। মালিক বিন আওফ বলে।
“এর জন্য আপনাদের কোন বিপদ হবে না।” ইহুদি তরুণী বলে— “জ্যোতিষী আপনাকে বলেছিল না যে, সন্ন্যাসীকে কোন মানুষ হত্যা করতে পারে না এবং তার জীবনের শেষ সময় ঘনিয়ে এলে সে দেবতা লাতের অস্তিত্বের মাঝে একাকার হয়ে যায়…আপনার হিম্মত থাকলে মন্দিরের কর্মচারীদের গিয়ে বলুন, সন্ন্যাসীর লাশকে দেবতার মাঝে একাকার করে দিতে। তার শবদেহ বাইরে ফেলে রাখুন, শকুন-কুত্তা কিভাবে তার দেহ ছিঁড়ে-ফেঁড়ে খায় দেখবেন।”
মালিক বিন আওফের স্ত্রী মালিকের হাত থেকে তলোয়ার নিয়ে নেয় এবং পালঙ্কে ছুড়ে ফেলে।
বাস্তবতা অনুধাবন কর আওফের পুত্র!” স্ত্রী তাকে বলে—“নিজের ভাগ্য ঐ ব্যক্তির হাতে সঁপে দিও না, এক সামান্য নারীর হাতে যে নিহত হয়েছে। এরপর সে ভৃত্যকে ডেকে বলে—“তরুণীটি আমাদের মেহমান। তার গোসল এবং আরামের ব্যবস্থা কর।”
মালিক বিন আওফের চেহারা থেকে আতঙ্কের চিহ্ন মুছে যেতে থাকে। স্ত্রী তার চিন্তা-চেতনায় বিপ্লব সৃষ্টি করে দেয়।
পর প্রভাতে মালিকের কাছে দু’টি খবর আসে। একটি হলো, রাতে সন্ন্যাসী খুন হয়েছে। মন্দির কর্মচারীরা বলছে, রাতে মালিক বিন আওফ ছাড়া আর কেউ সন্যাসীর কক্ষে যায়নি। কেউ যাওয়ার সাহসও করতে পারে না। মন্দির কর্মচারীরা এটা রাষ্ট্র করে দেয় যে, জ্যোতিষীকে মালিক বিন আওফ নিজে হত্যা করেছে, নতুবা ভাড়াটে দিয়ে সে হত্যা করিয়েছে।
মালিক বিন আওফের জন্য দ্বিতীয় খবর এই ছিল যে, মুসলমানরা তায়েফ অভিমুখে আসতে আসতে কোনদিকে যেন চলে গেছে। এ সংবাদ মালিকের ধড়ে প্রাণ এনে দেয়। সে তৎক্ষণাৎ দু’তিন অশ্বারোহীকে হুনায়ন টু তায়েফ রুটে পাঠিয়ে দেয়। এরপর সে উপাসনালয়ে গিয়ে হাজির হয়। অনেক কষ্টের পর সে উত্তেজিত লোকদের বুঝাতে সক্ষম হয় যে, শ্রদ্ধেয় সন্ন্যাসীকে হত্যা করার দুঃসাহস সে করতে পারে না। জনতা জানতে চায়, তাহলে হত্যাকারী কে? এ হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত করা হোক। মালিক বিন আওফ তাদেরকে এই বলে আশ্বস্ত করে যে, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে শীঘ্রই খুনীকে চিহ্নিত করা হবে। মালিক চাইলে তরুণীর কথা বলে দিয়ে নিজেকে সন্দেহের ঊর্ধ্বে রাখতে পারত। কিন্তু সে এখনই তরুণীকে সামনে আনতে চায় না। সে মানুষের দৃষ্টি এদিক থেকে ফিরিয়ে মুসলমানদের দিকে করে দেয়, যারা তায়েফ অবরোধ করতে দ্রুতগতিতে আসছিল। সে ক্ষণিকের জন্য মন্দিরের অভ্যন্তরে যায় এবং কর্মচারীদের সাথে দ্রুত সমঝোতা করে ফেলে।
“লাতের পূজারীগণ!” এক বৃদ্ধ কর্মচারী বাইরে এসে সমবেত জনতার উদ্দেশে বলে—“আমাদের শ্রদ্ধেয় সন্ন্যাসীকে কেউ হত্যা করেনি। যাকে তোমরা নিহত দেখতে পাচ্ছ, তিনি মূলত দেবতা লাতের অস্তিত্বের মাঝে নিজেকে বিলীন করে দিয়েছেন। দেবতা লাতের নির্দেশে এখন থেকে আমি সন্ন্যাসী। যাও, স্বীয় ভূখণ্ডকে আসন্ন শত্রুদের হাত থেকে রক্ষা কর।”
মালিক বিন আওফ মন্দিরের ঝামেলা চুকিয়ে ঘরে ফিরে আসার কিছুক্ষণ পর তার প্রেরিত দূতরা ফিরে আসে। তারা এসে তাকে জানায় যে, হুনায়ন থেকে তায়েফের পথে মুসলমানদের কোন নাম-গন্ধ নেই।
মালিক বিন আওফ নিজেকে ধোঁকার মাঝে রাখে না। সে অন্যান্য নেতাদের জানায় যে, মুহাম্মাদ শত্রুদের এমনিতেই ক্ষমা করে না। সে কোন পন্থায় অবশ্যই পাল্টা হামলা চালাবেই। সে ঘোষণা করে দেয়, শহর প্রতিরক্ষায় যেন বিন্দুমাত্র গাফলতি ও ক্রটি প্রদর্শন না করা হয়।
॥ চার ॥
গোয়েন্দারা মালিক বিন আওফকে সত্য সংবাদই দিয়েছিল যে, তায়েফের রাস্তায় মুসলমানদের কোন নাম-নিশানা নেই। কিন্তু মুসলমানরা তুফানের গতিতে তায়েফ অভিমুখে ঠিকই ধেয়ে আসছিল। সৈন্যরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশে ভিন্ন রাস্তা ধরে চলছিল। পরিবর্তিত রাস্তা ছিল অত্যন্ত দীর্ঘ। তারপরেও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ রাস্তা এ জন্য অবলম্বন করেন যে, বিপরীত যে স্বল্পদূরত্বের রাস্তাটি ছিল তা বিভিন্ন পাহাড়, প্রান্তরের মধ্য দিয়ে এগিয়ে গিয়েছিল। ছোট-বড় অনেক পাহাড়ী খাদও ছিল এ রাস্তায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কমান্ডারদের সতর্ক করে বলেছিলেন, হুনায়নের প্রথম অভিজ্ঞতা ভুলো না। মালিক বিন আওফ বড়ই দুর্ধর্ষ। তিনি আরো বলেন, তায়েফ পর্যন্ত পুরো রাস্তাটাই একটা ফাঁদ। শত্রুর উদ্দেশে ওঁৎ পেতে থাকার জন্য অত্যন্ত উপযুক্ত স্থান। মালিক বিন আওফ আবার ফাঁদ পাততে পারে, যেমনটি হুনায়ন উপত্যকায় পেতে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে তীর মেরে চালনী করে দিয়েছিল।
