মালিক বিন আওফ লৌহবৎ দৃঢ়তা নিয়ে গেলেও সন্ন্যাসীর কথায় এতই প্রভাবিত হয় যে, মাথা নীচু করে সেখান থেকে বেরিয়ে আসে। মালিক চলে যেতেই নিকটবর্তী কোথাও লুকিয়ে থাকা ছায়াটি সামনে অগ্রসর হতে থাকে।
সন্ন্যাসী তখনও পর্যন্ত খোলা দরজা দিয়ে বাইরে তাকিয়েছিল। সে হঠাৎ ভূত দেখার মত চমকে ওঠে। তার চোখের সামনে এক তরুণী দাড়িয়েছিল। তরুণী তার অপরিচিত ছিল না। ভাল করেই সে তাকে চিনত। যে ছায়ামূর্তিটি সন্যাসীর সামনে এসে তরুণীরূপে প্রকাশিত হয় সে ঐ ইহুদি নারী ছিল, যাকে এক বয়োবৃদ্ধ ইহুদি সন্ন্যাসীকে উপঢৌকন স্বরূপ প্রদান করেছিল। সাথে সাথে স্বর্ণের দু’টি টুকরোও তাকে দিয়েছিল। এটা ছিল সন্ন্যাসীর পুরস্কার বা কাজের প্রতিদান। আর সে কাজ এই ছিল যে, যে করেই হোক হাওয়াযিন ও ছাকীকদেরকে এই বলে আশ্বস্ত করা যে, তাদের হাতেই মুসলমানদের ধ্বংস নিহিত। তাদের তলোয়ারে ইসলাম এবং মুসলমান চিরদিনের জন্য নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।
বৃদ্ধ ইহুদি তরুণীকে এক রাতের জন্য সন্ন্যাসীর কাছে রেখে গিয়েছিল। এই সুসংবাদ শোনার আশায় সে তায়েফে অপেক্ষমাণ ছিল যে, হাওয়াযিন, ছাকীফ এবং তাদের মিত্রগোত্রগুলো ইসলামকে মুসলমানদের রক্তনদীতে চিরতরে ডুবিয়ে দিয়েছে। কিন্তু বিধি বাম! মালিক বিন আওফ নিজেই অবনত মস্তকে তায়েফে ফিরে আসে। তার পিছু পিছু হতাশ-অবসন্ন সৈন্যরাও পা টেনে টেনে দু’চারজন করে তায়েফে এসে পৌঁছতে থাকে। বৃদ্ধ ইহুদির কোমর বয়সের আধিক্যে ন্যূজ হয়ে গিয়েছিল। মালিককে পরাজিত হয়ে ফিরে আসতে দেখে তার কোমর যেন পুরোপুরি ভেঙ্গে গেল। তার ভাঙ্গা কোমরের উপর শেষ ভারী পাথর ঐ ইহুদি তরুণী এনে চাপিয়ে দেয় যাকে সে উপঢৌকন স্বরূপ সন্ন্যাসীর কাছে এক রাতের জন্য রেখে এসেছিল।
“আমি এটা ভেবে বিস্মিত যে, আপনার মত অভিজ্ঞ এবং ঝানু লোক পর্যন্ত ধোঁকা খেয়েছেন?” তরুণী ইহুদিকে বলে—“নরপিশাচ সন্ন্যাসীর একটি কথার উপরেও আমার আস্থা নেই। আমি অযথা আপনার নির্দেশে আমার কুমারিত্ব বিসর্জন দিলাম।”
“আমার নির্দেশে নয় পাগলী!” বৃদ্ধ ইহুদি সান্ত্বনার স্বরে বলে—“ইহুদিবাদের খোদার নির্দেশে। তোমার কৌমার্য বিসর্জন বৃথা যাবে না।”
এ ইতিহাস ইহুদিবাদে প্রাচীনকাল থেকে সংরক্ষণ হয়ে আসছে যে, তারা সর্বদা যুদ্ধের ময়দান এড়িয়ে চলে। তারা শৌর্য-বীর্য দ্বারা কাজ নেয় না; বুদ্ধিবৃত্তিক পন্থাই তাদের প্রধান কৌশল। তারা পর্দার অন্তরালে কূটচাল চালতে অত্যন্ত পারঙ্গম। তাদের কূটচাল দু’ভাইকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়। ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করতে তারা অগাধ ধন-দৌলতের সাথে তাদের কন্যাদের নারীত্বকে সফল যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করত। ইহুদি সমাজ এবং ধর্মে নারীর ইজ্জত সম্ভ্রমের কোন মূল্য ছিল না। কিন্তু এই তরুণীকে এর ব্যতিক্রম দেখা যায়।
সে বৃদ্ধ ইহুদির প্রতি বারবার মারমুখী হয়ে উঠছিল এবং বলছিল, মুসলমানরা পরাজিত এবং পরাভূত হলে সে গর্বের সাথে বলত, সে এই বিরাট লক্ষ্য সাধনে নিজ কুমারিত্ব বিসর্জন দিয়েছে। সাথে সাথে সে এ অভিযোগও করে যে, সন্ন্যাসী তার সাথে প্রতারণা করেছে।
রাতে বৃদ্ধ ইহুদি গভীর নিদ্রায় ডুবে গেলে তরুণী উঠে পড়ে। খঞ্জর বের করে বস্ত্রের অভ্যন্তরে লুকিয়ে ফেলে। অতঃপর পা টিপে টিপে বাইরে বেরিয়ে আসে।
গভীর রাতে গতিরোধ করে তাকে এ কথা জিজ্ঞাসা করার কেউ ছিল না যে, তার পরিচয় কী? গন্তব্য কোথায়? সে রাতে সারা তায়েফবাসী বিনিদ্র ছিল। স্ত্রীরা তাদের পরাজিত স্বামীদের ভর্ৎসনা করছিল আর যাদের স্বামী ফেরে না তারা গুণগুণ করে কাঁদছিল। অলি-গলিতে লোকের যাতায়াত ছিল অবাধ। তরুণী জনতার মাঝ দিয়ে লাতের মন্দিরে গিয়ে পৌঁছে। তার চোখে ছিল খুনের নেশা। সে তৎকালের ঐ সকল মহিলার অন্তর্গত ছিল যাদের দেহে বীরত্ব টগবগ করত। সে উপাসনালয়ের পিছনের দেয়ালের ফাটল গলিয়ে ভিতরে চলে যায়।
আমি জানতাম আমার যাদু একটি বারের জন্য হলেও তোমাকে আমার কাছে আনবে।” সন্ন্যাসী আনন্দে গদগদ হয়ে বলে—“এস, দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা ঠিক নয়।”
তরুণী আস্তে আস্তে এগিয়ে সন্ন্যাসীর কাছে গিয়ে দাঁড়ায়।
“যাদু নয়, প্রতিশোধ বল”—পূতিশোধের যাদু আমাকে এ পর্যন্ত টেনে এনেছে।
“কি আবোল-তাবোল বলছ তরুণী!” সন্ন্যাসী কান্নার চেয়েও করুণ মুচকি হেসে বলে—“মালিক বিন আওফ থেকে প্রতিশোধ নিতে চাও?…সে তো চলে গেছে। সে আমাকে হত্যা করতে এসেছিল। লাতের জ্যোতিষীকে হত্যা করার দুঃসাহস কোন মানুষের হতে পারে কি?”
‘হ্যাঁ’ তরুণী বলে—“একজন মানুষ আছে, সে লাতের সন্ন্যাসীকে হত্যা করতে পারে। লোকটি লাতের পূজারী নয়। আর সে আমিই। ইহুদিবাদের খোদা আমার পূজ্য।”
তরুণী এরপর চোখের পলকে বস্ত্রের অভ্যন্তর হতে খঞ্জর বের করে এবং সোজা সন্ন্যাসীর বক্ষে স্থাপন করে হৃদপিণ্ড এ ফোঁড়-ওফোঁড় করে দেয়। সন্ন্যাসীর আর্তনাদ যাতে বাইরে না যায় তার জন্য তরুণী জ্যোতিষীর মুখ এঁটে ধরে। তরুণী বক্ষ থেকে খঞ্জর বের করে সন্ন্যাসীর শাহরগ কেটে দেয়। তরুণী জিঘাংসা চরিতার্থ করে স্থিরচিত্তে সন্ন্যাসীর কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসে এবং যে পথে ভিতরে ঢুকেছিল সে পথ দিয়ে উপাসনালয়ের চত্বর থেকে নিরাপদে বেরিয়ে যায়।
