মালিক বিন আওফ!” এক কর্মচারী মালিকের গমন পথে দাঁড়িয়ে বলে— “গোত্রপতি কি ভুলে গেছে যে, ঐ স্থান থেকে সামনে কেউ অগ্রসর হতে পারে না?…আমাদের সাথে কথা বলুন মালিক!”
“তোমরাও কি ভুলে গেছ, কোন নেতার গতিরোধ করলে তার পরিণতি কি হয়? মালিক বিন আওফ তলোয়ারের বাটে হাত রেখে বলে—“আমি সন্ন্যাসীর কাছে যেতে চাই।”
“সন্ন্যাসীর অভিশাপের কথা মনে করেন মালিক!” এক কর্মচারী বলে— “সন্ন্যাসীকে তুমি বাহ্যদৃষ্টিতে শয্যায় শায়িত দেখলেও প্রকৃতপক্ষে তিনি এখন লাত দেবতার দরবারে। এমতাবস্থায় তার কাছে গেলে তোমার…।”
মালিকের মানসিক অবস্থা এত বিধ্বস্ত ছিল যে, তার অন্তরে তখন সন্ন্যাসীর কোন মান-মর্যাদা ছিল না। পূর্বেকার ভীতি এবং শ্রদ্ধাবোধও ছিল না। কারণ, একে তো শোচনীয় পরাজয় বরণ করে এসেছে। দ্বিতীয়ত, তার সর্বাধিক প্রিয় স্ত্রী তাকে চরম ভর্ৎসনা করেছে। মালিক খপ করে মশালধারী কর্মচারীর হাত ধরে বসে এবং চোখের পলকে মশাল ছিনিয়ে নিয়ে সোজা সন্ন্যাসীর কামরায় চলে যায়। কর্মচারীরাও তার পিছন পিছন ছুটে আসে কিন্তু ততক্ষণে সে সন্ন্যাসীর খাস কামরায় পৌঁছে যায়।
সন্ন্যাসী বাইরের চেচামেচিতে জেগে যায়। নিজের কামরায় মশালের আলো দেখে চোখ মুছতে মুছতে উঠে বসে। মালিক বিন আওফ কামরায় প্রবেশ করে মশাল সুনির্দিষ্ট স্থানে স্থাপন করে।
“শ্রদ্ধেয় সন্যাসী!” মালিক বিন আওফ বলে—“আমি জানতে এসেছি যে…”
“আমাদের পরাজয়ের কারণ কী” সন্ন্যাসী তার কথা পূর্ণ করে বলে—একটি ‘হাম’ কুরবানী দেয়ার কথা বলছিলাম না?”
“হ্যাঁ, সন্ন্যাসী!” মালিক বিন আওফ বলে, “আপনি তো এ কথাও বলছিলেন যে, ‘হাম’ পাওয়া না গেলে গোত্রের লোকদের রক্ত এবং জান কুরবান করতে। আমার আরো মনে আছে, আপনি বলছিলেন, ‘হাম’ অন্বেষণে সময় নষ্ট করার দরকার নেই।… মুসলমানদের এখন যুদ্ধ-প্রস্তুতি নেই’-একথাও আপনি বলছিলেন।”
“তুমি কি দেবতার কাছে কৈফিয়ত তলব করতে এসেছ, শত্রুরা কেন তোমাদের পরাজিত করল?” সন্ন্যাসী জিজ্ঞাসা করে—“আমি বলছিলাম কেউ যেন রণাঙ্গনে পৃষ্ঠ প্রদর্শন না করে।…তোমার সৈন্যরা কি পৃষ্ঠ প্রদর্শন করেনি? তোমার সেনাদের মাঝে নিজ নিজ স্ত্রী-পরিজনদের রক্ষা করারও আত্মমর্যাদাবোধ নেই।”
“আমি জানতে চাই, আপনি কি করলেন? মালিক বিন আওফ জিজ্ঞাসা করে, ‘যদি সবকিছু আমাদেরই করতে হয়, তবে আপনার অবদান কি রইল? আপনি কেন এই আশ্বাস দিয়েছিলেন যে, মুসলমানদের ঐ সময় খবর হবে, যখন তোমাদের তলোয়ার তাদের শাহরগ স্পর্শ করবে? আপনি কি আমাদের সাথে প্রতারণা করেননি? এটা কি সত্য নয় যে, মুহাম্মাদের ধর্মই বাস্তব যিনি আপনার ভাগ্য গণনা ভুয়া প্রমাণ করে দিয়েছে। সন্ন্যাসী না হলে আমি তোমাকে হত্যা করে ফেলতাম।…এখন তায়েফ পানে ভয়ঙ্কর বিপদ ধেয়ে আসছে। দেবতা অধ্যুষিত এ বসতি আপনি রক্ষা করতে সক্ষম? মুসলমানদের উপর আপনি গযব নাযিল করতে পারবেন?”
“প্রথমে একটি কথা শুনে নাও আওফের পুত্র।” সন্ন্যাসী বলে—“সন্ন্যাসীকে দুনিয়ার কোন শক্তি হত্যা করতে পারে না। সন্ন্যাসীর আয়ু শেষ হলে সে দেবতা লাতের অস্তিত্বের মাঝে একাকার হয়ে যায়। বিশ্বাস না হলে তলোয়ার চালিয়ে পরীক্ষা করতে পার।…দ্বিতীয় কথা এটাও মনে রেখ, মুসলমানরা তায়েফ পর্যন্ত পৌঁছতে সক্ষম হলেও এখান থেকে জীবন নিয়ে ফিরে যেতে পারবে না।”
॥ তিন ॥
যে সময় মালিক বিন আওফ সন্ন্যাসীর কক্ষে প্রবেশ করছিল ঠিক ঐ সময় এক মানব ছায়া উপাসনালয়ের পিছনের প্রাচীরের পাশে ঘুর ঘুর করছিল। সে যেই হোক না কেন, নিজের জীবনকে চরম ঝুঁকির মুখে নিক্ষেপ করছিল। মালিক বিন আওফ কেবল নেতা হওয়ার প্রভাবে রাতে সন্ন্যাসীর কক্ষ পর্যন্ত যেতে পেরেছিল। মন্দিরটি প্রায় এক শতাব্দীর প্রাচীন ছিল। পিছনের প্রাচীরে ছোট ফাটল দেখা দিয়েছিল। প্রাচীরের ও পাশে পায়চারী রত মানবরূপী ছায়া ঐ ফাটলে নিজেকে ঠেলে দিয়ে মন্দির চত্বরে ঢুকে পড়ে। মন্দিরের খাস কামরা পর্যন্ত যেতে পথিমধ্যে উঁচু উঁচু ঘাস এবং ইতস্তত ঝোপ-ঝাড় ছিল। ছায়াটি ঐ ঘাস এবং ঝোপ-ঝাড়পূর্ণ এলাকা বিড়ালের মত এমন নিঃশব্দে অতিক্রম করে যে, তার পদশব্দ কিংবা হাল্কা খসখস আওয়াজও শোনা যাচ্ছিল না।
ছায়াটি যন্ত্রচালিতের মত এগিয়ে চলে। ঘাস এবং ঝোপ-ঝাড় অধ্যুষিত এলাকা পেরিয়ে সে ঐ চত্বরে উঠে পড়ে যেখানে মন্দিরটি শতাব্দীর স্মৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। পশ্চাৎ দিকের দরজার একটি পাল্লা উই পোকায় খাওয়া ছিল। ছায়াটি নিঃশব্দে ঐ দুর্বল পাল্লা গলিয়ে মন্দিরের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ে। সামনে গাঢ় আঁধার কুণ্ডলী পাকিয়েছিল। মানবরূপী ছায়া এখানে এসে জুতা খুলে ফেলে এবং বিড়ালের মত পা টিপে টিপে সামনে অগ্রসর হতে থাকে।
ঘোরতর অন্ধকারের মধ্য দিয়ে সে এমন স্বাচ্ছন্দে চলে, যেন ইতোপূর্বে কখনও এখানে এসেছিল। ছায়াটি অন্ধকারের আড়ালে আড়ালে অগ্রসর হয়ে সন্ন্যাসীর নিকটে গিয়ে পৌঁছে। এ সময় তার কানে সন্ন্যাসী এবং আরেকজনের তর্ক-বিতর্ক এবং আলোচনার আওয়াজ ভেসে আসে। সন্ন্যাসীর সাথে আলাপরত লোকটি ছিল মালিক বিন আওফ। ছায়াটি চমকে থেমে যায়। সন্ন্যাসীর কক্ষ হতে বের হওয়া মশালের আলো সে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিল।
