মালিক বিন আওফ তায়েফ পৌঁছেই জরুরী বৈঠক আহ্বান করল। সেনাপতি, উপসেনাপতি এবং ইউনিট কমান্ডাররা এসে আসন গ্রহণ করল। মালিক বিন আওফ সভাপতির আসনে সমাসীন। কিন্তু ভীষণ উদ্বিগ্ন এবং আতঙ্কিত। কারো কোন মতামত আহ্বান ছাড়াই নিজেই নির্দেশ দিলো যে, অপরাপর গোত্রদেরও শহরে এনে রক্ষা কর। মুসলমানরা এল বলে… মালিক একটুও বিশ্রাম নেয় না। এসেই তায়েফের প্রতিরক্ষা সুদৃঢ় করতে জরুরী পদক্ষেপ গ্রহণ করল। সরকারী কর্মচারী-কর্মকর্তাদের সাথে নিজেও বিভিন্ন কাজে শরীক হল। উপসেনাপতি এবং কমান্ডাররা পিছু হটা সৈন্যদের সমবেত করার কাজে লেগে গেল।
সারাদিনের বিভিন্ন কর্মব্যস্ততায় মালিক বিন আওফ ঘর্মসিক্ত হয়ে ওঠে। ক্লান্তি আর অবসাদে ভেঙ্গে পড়ে তার শরীর। অবসন্ন দেহটাকে এক প্রকার টেনে নিয়ে শয্যায় ছুড়ে মারে। সবচে সুন্দরী এবং মায়াবী স্ত্রীকে ডেকে পাঠালো। স্ত্রী সাথে সাথে এসে হাজির হলো।
“আপনি না এই অঙ্গীকার করেছিলেন যে, মক্কার মূর্তি-বিনাশী মুহাম্মাদ এবং তার সাঙ্গ-পাঙ্গদের খতম করেই তবে স্ত্রীদের মুখ দেখাবেন?” স্ত্রী তাকে বলে, “আপনি বিজয়ের পরিবর্তে পরাজয়ের কলঙ্ক মাথায় তুলে এনেছেন। আপনার কসম এবং ওয়াদা অনুযায়ী আমার অস্তিত্বই এখন আপনার জন্য হারাম।”
“তুমি আমার স্ত্রী।” মালিক বিন আওফ রাগের স্বরে বলে—“আমার নির্দেশ অমান্যের সাহস করো না। আমি যেমনি ক্লান্ত তেমনি উদ্বিগ্নও। এখন তোমাকে আমার ভীষণ প্রয়োজন। আমার সর্বাধিক প্রিয় স্ত্রী তুমিই।”
“আমারও আপনার প্রয়োজন।” স্ত্রী বলে—“কিন্তু আমার এ মুহূর্তে দরকার এক আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন পুরুষের। আমি ঐ মালিকের প্রয়োজন অনুভব করি, যে এখান থেকে এই অঙ্গীকার করে গিয়েছিল যে, মুসলমানদেরকে মক্কার মাটিতেই খতম করে ফিরব।… সে মালিক এখন কোথায়?… সে মারা গেছে। ঐ মালিক বিন আওফকে আমি চিনি না, যে নিজ গোত্রসহ অন্যান্য মিত্রগোত্রের হাজার হাজার নারী-সন্তানকে শত্রুর তলোয়ারের নীচে রেখে অন্দর মহলে এসে বসে আছে এবং এক নারীকে ডেকে বলছে, আমি তোমাকে চাই।”
মালিকের এ সুন্দরী স্ত্রীর কণ্ঠ উচ্চ হয়ে আবেগের আতিশয্যে রীতিমত কাঁপতে থাকে। সে মালিকের পালঙ্ক থেকে উঠে দাঁড়ায় এবং বলে—“আজ রাতে আমি কেন, কোন স্ত্রীই তোমার শয্যায় আসবে না। আজ রাতে তোমার কোন স্ত্রীকে ঐ সমস্ত নারীদের করুণ ফরিয়াদ এবং বুক ফাটা আর্তনাদ স্বস্তির সাথে ঘুমাতে দিবে না। যারা মুসলমানদের হাতে বন্দী…একটু ভাব…কল্পনা কর ঐ সমস্ত বিপন্ন নারী এবং নব তরুণীদের দুর্দশার দৃশ্য, যাদেরকে তুমি মুসলমানদের হাতে উঠিয়ে দিয়ে এসেছ। এখন তাদের গর্ভে জন্ম নিবে মুসলিম সন্তান। ছোট ছোট সন্তান যারা তাদের কব্জায় রয়েছে, তারাও হয়ে যাবে মুসলমান।”
মালিক বিন আওফ পাহাড় সম বিপদ অতিক্রম করে যাওয়ার মত দুর্বার সাহসী লোক ছিল। যৌবনের উচ্ছ্বাস এবং আবেগ দমিয়ে প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতার সাথে সিদ্ধান্ত নেয়ার যে আহ্বান শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব এবং রণাঙ্গনের অভিজ্ঞ সৈনিক মান্যবর গুরু দুরায়দ বিন ছম্মাহ করেছিল তা সে সেদিন বড় অপমানজনকভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিল। আজ সেই একই প্রসঙ্গকে কেন্দ্র করে মালিক বিন আওফ নিজ স্ত্রীর সামনে অবনত মস্তকে উপবিষ্ট। যেন জ্বলন্ত অঙ্গারে কেউ পানির ছিটা দিয়েছে। তার পৌরুষ আপনাতেই স্তিমিত হয়ে যায়।
“তুমি মুসলমানদের খতম করতে গিয়েছিলে মালিক!” স্ত্রী এমন ভঙ্গিতে কথা বলতে থাকে, যেন এই মুহুর্তে মালিকের মত বাহাদুর এবং সাহসী স্বামীর কোন মূল্য নেই তার কাছে। সে আরো বলে, “মুসলমানদের খতম করতে গিয়ে তুমি তাদের সংখ্যা আরো বৃদ্ধি করে এসেছ।”
“সন্ন্যাসী বলেছিল…” মালিক মুখ তুলে বলে।
“কোন্ সন্ন্যাসী?” স্ত্রী তার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলে—“যে মন্দিরে বসে শুভাশুভ নির্ণয় করে? তোমার মত মানুষ নিজের ভাগ্য নিজের হাতে রাখে। নিজের ভাগ্য নিজ হাতে তৈরী করে আবার নষ্ট করে।…তুমি সন্ন্যাসীর কাছে কৈফিয়ত চাওনি, তার ভাগ্যশর কেন মিথ্যা বলল?
মালিক বিন আওফ উঠে দাড়ায়। নিঃশ্বাসের দ্রুত উত্থান-পতন হয়। চোখে নেমে আসে রক্তের ধারা। সে দেয়ালে ঝুলানো তলোয়ার নামিয়ে আনে এবং স্ত্রীকে কোন কিছু বলা ছাড়াই হনহন করে বাইরে বেরিয়ে আসে।
তায়েফের আকাশেও রাত এসেছিল। কিন্তু সেখানকার মানুষের তৎপরতা ও ছোটাছুটি দেখে দিনের মতোই মনে হচ্ছিল। বাইরে থেকে খবর আসছিল, মুসলমানরা তায়েফ অভিমুখে দ্রুতগতিতে আসছে। সকলে সুদৃঢ় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় কর্মব্যস্ত। খাদ্য এবং পানির সুব্যবস্থা ছিল প্রধান চ্যালেঞ্জ। অনেকে পানি সংরক্ষণের জন্য হাউস তৈরী করছিল।
সকল তৎপরতা এবং হৈ চৈ মাড়িয়ে মালিক হেটে চলছিল। মানুষ অধিক কর্মব্যস্ততার দরুণ খেয়ালই করতে পারল না যে, তাদের মাঝ দিয়ে তাদেরই সেনাপতি অতিবাহিত হলেন।
॥ দুই ॥
যে সন্ন্যাসী হাওয়াযিন এবং ছাকীফদেরকে এই নিশ্চয়তা দিয়েছিল যে, তারা এক প্রকার অজান্তেই মুসলমানদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে সক্ষম হবে, সে মন্দিরের খাস কামরায় শায়িত। গভীর নিদ্রায় বিভোর। তার নিদ্রা হরণের দুঃসাহস কারো ছিল না। অন্দরমহলের কোন এক সুরক্ষিত ও সুসজ্জিত কক্ষে সে নিদ্রা যেত। মন্দিরের অন্য কর্মচারীরা বাইরের সাইডের কোন কামরায় থাকত। কারো পদশব্দে তাদের নিদ্রা টুটে যায়। তাদের অন্যতম দায়িত্ব ছিল, যেন বাইরের কেউ সন্ন্যাসীর অন্দরমহলে তার অনুমতি ব্যতীত যেতে না পারে। পদশব্দ ভেসে এলে দু’তিন কর্মচারী উঠে বাইরে আসে। একজনের হাতে জ্বলন্ত ছিল মশাল।
