তৎকালে তায়েফ ছিল ভূ-স্বর্গ। মরুভূমির শোভা। চারদিকে অথৈ বালুর পাহাড় আর সারি সারি টিলা অধ্যুষিত বিস্তীর্ণ মরুভূমিতে তায়েফ যেন কণ্ঠাহারের লকেট। এই ভূস্বর্গটি আরবের বিখ্যাত যুদ্ধবাজদের দখলে ছিল। এখানেই ছিল দুর্ধর্ষ ছাকীফ গোত্রের হেডকোয়ার্টার। বসতির কাছেই ছিল গোত্রীয় উপাসনালয়। বনু ছাকীফ, হাওয়াযিন সহ আরো কয়েকটি গোত্রের দেবতা ‘লাত’-এর মূর্তি এখানে স্থাপিত ছিল। এটা মূলত কোন আকৃতিগত প্রতীমা ছিল না; বরং একটি প্রশস্ত চত্বর ছিল মাত্র। মানুষ এ প্রান্তরের চত্বরকেই দেবতা মনে করে তার পূজা-অর্চনা করত।
উপাসনালয়ে অত্র এলাকার সন্ন্যাসীও থাকত। মানুষ তাকে খোদা এবং দেবতা ‘লাত’-এর দূত মনে করত। সন্ন্যাসীর কাজ ছিল শুভাশুভ নির্ণয়ের মাধ্যমে অনাগত বিপদ থেকে মানুষকে সতর্ক করা। সে সাধারণ মানুষের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থাকত। কালে ভদ্রে হয়ত কেউ তার দেখা পেত। উপাসনালয়ের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে নিয়োজিত লোকজন ছাড়া সাধারণ মানুষের সাথে তার দেখা হত না। ভাগ্যক্রমে কেউ তাকে দেখলে সে অত্যন্ত আনন্দিত হত। যেন সে স্বয়ং খোদাকেই দেখার দুর্লভ সম্মান অর্জন করেছে। দেবতা তায়েফে থাকায় মানুষের দৃষ্টিতে তায়েফের এক ভিন্ন মর্যাদা ছিল। সবাই এ ভূমিকে পবিত্রভূমি বলে সম্মান করত।
মাত্র এক মাস পূর্বে তায়েফে অত্যন্ত আড়ম্বরের সাথে একটি মনোজ্ঞ অনুষ্ঠান হয়েছিল। স্বাগতিক এলাকার সর্বোচ্চ নেতা মালিক বিন আওফ তার গোত্রের অনুরূপ আরেকটি শক্তিশালী গোত্র হাওয়াযিন এবং আরো কয়েকটি গোত্রের নেতৃবৃন্দকে এক বিরাট ভোজসভায় আমন্ত্রণ করেছিল। আনুষ্ঠানিক মনোজ্ঞ করতে বাছাই করা সুন্দরী নর্তকী এবং শিল্পীদের আনা হয়েছিল। তাদের নৃত্য নৈপুণ্য এবং সুর-লহরী শ্রোতাদের দারুণ মুগ্ধ ও তন্ময় করেছিল। সে রাতে মদের বোতল একের পর এক শুধু খালিই হচ্ছিল।
শ্রোতা মাতানো রাতের সে অনুষ্ঠান মালিক বিন আওফের অঙ্গুলি হেলনে থমকে গিয়েছিল। বিভিন্ন গোত্রের নেতৃবৃন্দ আলোচনা-সমালোচনা এবং পর্যালোচনার পর সে রাতে এই মর্মে অঙ্গীকারাবদ্ধ হয় যে, আচমকা আক্রমণ করে তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং মক্কার মুসলমানদের চিরদিনের জন্য খতম করে দিবে। বয়োবৃদ্ধ এক নেতা দুরায়দ বিন ছম্মাহ সেদিন আহ্বান করেছিল—চল, দেবতা লাতের নামে শপথ করি যে, মক্কার মূর্তিবিনাশী মুহাম্মদ এবং তার চেলা-চামুণ্ডাদের খতম করেই তবে আমরা স্ত্রীর সামনে যাব।
ত্রিশ বছর বয়সী মালিক বিন আওফ সেদিন আবেগে ফেঁটে পড়ছিল। সে বড় দৃঢ়তার সাথে বলেছিল, এবারের বহুজাতিক বাহিনী মক্কায় মুসলমানদের অজ্ঞাতেই তাদের টুটি চেপে ধরবে।
সে রাতে মালিক বিন আওফ, দুরায়দ বিন ছম্মাহ এবং অন্যান্য গোত্রের নেতৃবৃন্দ এলাকার সন্ন্যাসীর কাছে গিয়েছিল। তারা সন্ন্যাসীর কাছে দুটি বিষয় জানতে চেয়েছিল।
১. মক্কায় গিয়ে মুসলমানদের অজ্ঞাতে তাদের টুটি চেপে ধরা তাদের পক্ষে সম্ভব কি-না?
২. আচমকা এবং অকল্পনীয় হামলা মুসলমানদের শির-দাঁড়া ভেঙ্গে দিবে কি-না?
সন্ন্যাসী তাদেরকে এই বলে আশ্বস্ত ও অনুপ্রাণিত করেছিল যে, আপনাদের পরিকল্পনা অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং যথার্থ। আপনারা সাহস করে এগিয়ে যান। স্বয়ং দেবতা লাতের আশীর্বাদ রয়েছে আপনাদের সাথে। সন্ন্যাসী অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে তাদের এটাও জানিয়েছিল যে, “মুসলমানরা আপনাদের আগমনের খবর তখন টের পাবে যখন তারা আপনাদের তলোয়ারে কচুকাটা হতে থাকবে।”
মাত্র এক মাস পরে তায়েফের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। পুরো এলাকায় ভীতি ও আতঙ্ক ছেয়ে গিয়েছিল। দেবতা লাতের আশীর্বাদ নিয়ে এবং জ্যোতিষীর কথা বিশ্বাস করে হাওয়াযিন, ছাকীফ এবং অন্যান্য গোত্রের যে সমস্ত সৈন্য মক্কায় আক্রমণ করতে গিয়েছিল তারা মক্কার অদূরে হুনায়ন উপত্যকায় মুসলমানদের হাতে চরম মার এবং নাকানি-চুবানি খেয়ে ফিরে আসছিল। পলায়নপরদের অগ্রভাগে বহুজাতিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক মালিক বিন আওফ ছিল। সে তায়েফের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সুদৃঢ় ও সুসংহত করতে আগেভাগে তায়েফে চলে এসেছিল। ওদিকে মুসলিম বাহিনী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নেতৃত্বে তায়েফ অভিমুখে দ্রুত আসছিল।
“তায়েফবাসী” তায়েফের রাস্তায় রাস্তায় আতঙ্কিত আওয়াজ অনুরণিত হয়, ‘মুসলমানরা আসছে… তায়েফ অবরোধ হবে… প্রস্তুতি নাও… তরি-তরকারি এবং খেজুর যত পার মজুদ কর। পানির নিরাপদ ব্যবস্থা কর।”
মালিক বিন আওফ ছিল সবচে আতঙ্কিত। তায়েফ হাত ফস্কে যাওয়ার দৃশ্য তার চোখে ভাসতে থাকে। পরাজয় এবং পশ্চাদপসারণের আঘাত তো ছিলই। তারপরে আরো বড় আঘাত পায় শহরে প্রবেশ করার সময়। এ সময় তায়েফের নারীরা মালিকের বিজয় গাঁথা এবং বীরত্বের গীত গাওয়ার পরিবর্তে তার প্রতি ঘৃণার নজরে তাকায়। বেগে আসা সৈন্যদেরকে নারীরা তীব্র ভর্ৎসনাও করছিল।
“স্ত্রী-কন্যারা কোথায় যাদেরকে তোমরা সাথে নিয়ে গিয়েছিলে?” নারীরা সৈন্যদেরকে বিদ্রূপাত্মক ভঙ্গিতে জিজ্ঞাসা করল—“সন্তানদেরও কি মুসলমানদের দিয়ে এসেছ?” এটাও ছিল নারীদের একটি তীক্ষ্ণ খোচা।
