রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কালবিলম্ব না করে আরেকটি অশ্বারোহী বাহিনী প্রস্তুত করে ফেলেন। এ বাহিনীর কমান্ডার নিযুক্ত করেন হযরত আবু আমের রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে আওতাসের নিকটে অবস্থিত সম্মিলিত শত্রবাহিনীর ক্যাম্প আক্রমণ করার দায়িত্ব দেন।
“খালিদ…খালিদ এখানে” অনেক দূর থেকে একজন আওয়াজ দিয়ে বলে “এখানে তিনি পড়ে আছেন।”
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক প্রকার দৌড়ে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর নিকট গিয়ে পৌঁছান। তখনও তিনি অজ্ঞান ছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর ভূলুণ্ঠিত শরীরের পাশে বসে তার মাথা থেকে পা পর্যন্ত ফুঁক দেন। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর চক্ষু খুলে যায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত খালিদের খোলা চোখে দীর্ঘক্ষণ স্বীয় চোখ স্থাপন করেন। অল্পক্ষণপরই হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু উঠে বসেন। তার দেহে বিদ্ধ তীরের আঘাত তেমন গভীর ছিল না। দ্রুত তীর বের করে ব্যান্ডেজ করা হয়।
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন “আল্লাহর রাসূল! আমি যুদ্ধ করব আমি এখন যুদ্ধের সম্পূর্ণ উপযুক্ত।”
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে বলেন যুবাইরের বাহিনীতে শরীক হয়ে যাও। কমান্ড দেয়ার মত স্বাভাবিক অবস্থা তোমার মাঝে এখনও হয়নি।
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু সঙ্গে সঙ্গে একটি ঘোড়ায় চেপে বসেন। তার বস্ত্র ছিল রক্তে রঞ্জিত। তিনি ঘোড়া ছুটিয়ে দ্রুত হযরত যুবাইর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর বাহিনীতে শরীক হয়ে যান। তিনি হযরত যুবাইর রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে জিজ্ঞেস করেন, এখন করণীয় কী? হযরত যুবাইর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাঁকে জানান যে, আওতাসের নিকটবর্তী হাওয়াযিনের তাঁবুতে হামলা করা। কিন্তু এ আক্রমণের নেতৃত্ব দিবেন হযরত আবু আমের রাযিয়াল্লাহু আনহু।
আওতাস হুনাইন উপত্যকা থেকে দূরে ছিল। মালিক বিন আওফ হাওয়াযিন বাহিনীকে এই আওতাস পর্যন্ত তাড়িয়ে নিয়ে যায়। তাদেরকে সেনাক্যাম্পের আশে-পাশে ছড়িয়ে দেয়। প্রতিরোধ দেয়াল হিসেবে মালিক তাদেরকে এভাবে সেনা ক্যাম্পের চতুর্দিকে এনে দাঁড় করায়। কারণ, ক্যাম্পের মধ্যে ছিল সৈন্যদের পরিবার-পরিজন এবং চতুষ্পদ জন্তু। এখন এরাই বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অভিজ্ঞ দুরায়দ বিন ছম্মাহ মালিককে এই বলে বকাবকি করতে থাকে যে, বারবার নিষেধ করা সত্ত্বেও মালিক কেন তাদের নিয়ে আসল। এই নারী, শিশু ও গৃহপালিত জন্তুর প্রাণ রক্ষা করাই এখন তাদের জন্য দায় হয়ে গেছে। মুসলমানদের হাত থেকে কিভাবে এদের রক্ষা করবে?
♣♣♣
হযরত আবু আমের রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর বাহিনী আওতাস অভিমুখে চলছে। ক্যাম্পের কাছা-কাছি পৌঁছলে হাওয়াযিনরা প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলে। যুদ্ধজয় কিংবা মুসলমানদের ছিন্নভিন্ন করে মক্কা দখলের জন্য নয়; বরং মুসলমানদের হাত থেকে নিজেদের পরিবার-পরিজন এবং চতুষ্পদ জন্তুগুলো রক্ষার জন্য লড়ে। এটা ছিল আরেকটি মারাত্মক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। এখানে যুদ্ধ কৌশল অর্থহীন। বাহাদুরীর জয় জয়কার ছিল। অশ্বারোহী এবং পদাতিক বাহিনী লড়তে লড়তে পুরো উপত্যকায় ছড়িয়ে পড়ে।
হযরত আবু আমের রাযিয়াল্লাহু আনহু একাই শত্রুপক্ষের নয় অশ্বারোহীকে জমের ঘরে প্রেরণ করেন। কিন্তু দশম জনের হাতে নিজে শহীদ হয়ে যান। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পূর্বেই হযরত আবু আমের রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর স্থলবর্তী নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন তাঁর চাচাত ভাই হযরত আবু মুসা রাযিয়াল্লাহু আনহু। তিনি সঙ্গে সঙ্গে দায়িত্ব বুঝে নেন এবং নিজ বাহিনীর প্রেরণা বাড়াতে থাকেন।
হাওয়াযিনরা প্রথমে প্রবল প্রতিরোধ সৃষ্টি করলেও এখন তারা বৃক্ষের পাকা ফলের মত টপটপ করে পড়ে যেতে থাকে। তাদের নিহত ও আহতের সংখ্যা ক্রমে বাড়তে থাকে। তাদের দুরবস্থা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। এদিকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত যুবাইর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর ঐ বাহিনীকে দ্রুত হযরত আবু মুসা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর বাহিনীর সাহায্যে এগিয়ে যেতে নির্দেশ দেন, যাদেরকে তিনি গিরিপথ, সংরক্ষণে রিজার্ভ রেখেছিলেন। হাওয়াযিনের দ্রুত পরাজয় ঘটাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুবাইর বাহিনীকে প্রেরণের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন।
হযরত যুবাইর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাঁর বাহিনীকে আক্রমণে এগিয়ে যাবার নির্দেশ দিলে দ্রুতগতিতে ঘোড়া অশ্বারোহীকে নিয়ে ছুটতে থাকে। এ সময় হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর অশ্ব ছিল সকলের আগে।
হাওয়াযিনের মনোবলে আগে থেকেই ফাটল ধরেছিল। মুসলমানদের নতুন এই বাহিনীর বজ্রাঘাত তারা সহ্য করতে পারে না। এর আগেই তাদের আহতদের সংখ্যা বিপুল পরিমাণে হয়ে গিয়েছিল। দুই অশ্বারোহী ইউনিটের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিপাকে হাওয়াযিনের ব্যুহ তছনছ হয়ে যায়। তারা স্ত্রী, পুত্র, পরিজন ছেড়ে পালাতে থাকে। রাস্তা পরিষ্কার হলে মুসলিম বাহিনী সহজেই তাদের ক্যাম্প ঘিরে ফেলে।
