আকস্মিক বাঁধার সম্মুখীন হওয়ায় ক্ষণিকের জন্য মুজাহিদ বাহিনীর মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল মাত্র। এর আগে তারা প্রতিপক্ষ হতে কয়েক গুণ কম সৈন্য নিয়েও বীর বিক্রমে লড়াই করে বিজয়ের মুকুট ছিনিয়ে এনেছে। মুজাহিদগণ বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নেয়ার পর যখন দেখে যে, হযরত আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর আহ্বানে মুসলমানরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পাশে এসে জড়ো হচ্ছে এবং শত্রুরা মুসলমানদের এক ক্ষুদ্র দলের পাল্টা আক্রমণে টিকতে না পেরে পালিয়ে গেছে এবং তারা এটাও দেখে যে, হাওয়াযিন ও ছাকীফরা তাদের পশ্চাদ্ধাবন করতে আসছে না তখন কয়েক হাজার মুজাহিদ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে ফিরে আসে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দ্রুত তাদের মাঝে শৃঙ্খলা বিধান করে যুদ্ধের জন্য বিন্যস্ত করেন এবং শত্রুর উপর হামলা করার নির্দেশ দেন।
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন লাপাত্তা। উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠায় কারো মাথায় এই খেয়াল আসে না যে, একটু তালাশ করে দেখবে, কে কোথায় এবং কিভাবে আছে।
যে সংকীর্ণ গিরিপথে এক সময় মুজাহিদদের উপর বজ্রের আঘাত পড়েছিল এখন সে স্থানটিই সম্মিলিত বাহিনীর জন্য মৃত্যু ফাঁদে পরিণত হয়। হাওয়াযিন গোত্র খুব দুর্ধর্ষ হেতু তাদেরকে রণাঙ্গনে সামনে রাখা হয়। সন্দেহ নেই যে, তারা যুদ্ধবাজ ছিল। কিন্তু মুসলমানদের বজ্র আক্রমণের সামনে তারা দাঁড়াতেই পারে না। মুসলমানরা সর্বোচ্চ বীরত্ব প্রকাশের মাধ্যমে ঐ ভীতিবোধও নিরসন করতে চায়, একটু ভুলের কারণে যার সম্মুখীন ইতোপূর্বে তাদের হতে হয়েছিল।
এটা ছিল সরাসরি যুদ্ধ। মুসলমানরা তরবারি চালনায় এমন চমক সৃষ্টি করে যে, একের পর এক পড়তে থাকে হাওয়াযিনদের লাশ। আর তাদের অধিকাংশ পলায়নের আয়োজন করছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রণাঙ্গনের নিকটবর্তী একটি উঁচু স্থানে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তার পাক জবানে বার বার উচ্চারিত হচ্ছিল।
“আমি সত্য নবী; কোন সন্দেহ নেই,
আমি আব্দুল মুত্তালিবের পৌত্র; কোন ভুল নেই।”
হাওয়াযিন প্রচণ্ড মার খেয়ে পিছনে হাঁটতে থাকে। তারা আক্রমণাত্মক অবস্থা থেকে রক্ষণাত্মক অবস্থায় চলে আসে। তারা ক্রমেই দুর্বল হতে থাকে। তাদের পেছনে ছাকীফ গোত্রের সৈন্যরা প্রস্তুত ছিল। মালিক বিন আওফ চিৎকার করে করে হাওয়াযিনদের পশ্চাতে সরিয়ে নেয়। ছাকীফ গোত্রের নতুন বাহিনী দ্রুত হাওয়াযিনদের শূন্যস্থান পূরণ করে। এ সময় মুসলমানরা বেশ ক্লান্ত কিন্তু বনু ছাকীফ সতেজ। শুরু হয়ে যায় আবার অগ্নিপরীক্ষা। শক্তি এবং ক্লান্তির বিচারে মুসলমানদের পাল্লা নিচু হলেও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপস্থিতি এবং তার উৎসাহ মুসলমানদের শক্তি বৃদ্ধি এবং ক্লান্তি দূর করে তাদের মাঝে দৃঢ়তা ও জিহাদী জযবা সরবরাহ করেছিল।
মুসলমানদের তরবারি ও বর্শার আঘাতে যে বজ্র নিচু ছিল এবং উচ্চকিত শ্লোগানে যে হুঙ্কার ছিল ছাকীফ গোত্রের উপর তা ভয়ানক ত্রাস সৃষ্টি করে। ছাকীফের যুদ্ধবাজ সৈন্যদের যুদ্ধ-খ্যাতি থাকলেও তারা দ্রুত পিছু হটতে থাকে। এক সময় তাদের উট ও ঘোড়া নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এতে শত্রু-শিবিরে সেই তাণ্ডব শুরু হয়, যা প্রভাতে গিরিপথে মুসলমানদের মধ্যে হয়েছিল। ইতোপূর্বে হাওয়াযিনরাও শোচনীয়ভাবে পিছু হটেছিল। এবার ছাকীফদের পিছু হাঁটতে দেখে অন্যান্য ছোট গোত্রগুলোর মনোবল যুদ্ধ ছাড়াই হুড়মুড় করে ভেঙ্গে যায়। তারা জীবন বাঁচাতে এলোপাথাড়ি পালাতে থাকে।
মালিক বিন আওফ সংকীর্ণ রাস্তার অদূরে দলছুট সৈন্যদের একত্রিত করছিল। তার অবস্থা বলছিল, সে আক্রমণাত্মক পজিশন থেকে নিজ বাহিনীকে আত্মরক্ষামূলক প্রাচীরে পরিণত করতে সৈন্য বিন্যস্ত করছিল।
মালিকের এই সৈন্যবিন্যাস রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখে দ্রুত নিজ সৈন্যদের কাছে আসেন। তিনি দেখতে পান যে, পূর্বে যারা গিরিপথের শিকার হয়ে আতঙ্কিত হয়ে চলে গিয়েছিল তারাও ইতোমধ্যে চলে এসেছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অশ্বারোহীদের সম্মুখে আসতে বলেন। মুহূর্তে অশ্বারোহী বাহিনী পদাতিক বাহিনী হতে আলাদা হয়ে যায়। তিনি তাদেরকে বিশেষভাবে বিন্যস্ত করে নির্দেশ দেন যে, হাওয়াযিনদেরকে দাঁড়াতে এবং সংগঠিত হওয়ার সুযোগ দেয়া যাবে না। বিদ্যুৎ গতিতে তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়।
এ অশ্বারোহী বাহিনীতে বনু সালীমের ঐ সকল অশ্বারোহীও ছিল, গোপন স্থান থেকে যাদের লক্ষ্যে সর্বপ্রথম তীর বর্ষিত হয়েছিল। আর সে তীর বর্ষণে মুসলমানদের সংঘবদ্ধতা লণ্ডভণ্ড হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এবার তাদের সাথে পূর্বের কমান্ডার হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন না। তিনি তখনও কোথাও অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন।
এবার এ অশ্বারোহী বাহিনীর নেতৃত্ব অর্পণ করা হয় হযরত যুবাইর বিন আওয়াম রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর কাঁধে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে এ নির্দেশ দেন যে, সামনের গিরিপথটি মালিক বিন আওফের কব্জায়। তাকে ওখান থেকে বেদখল দাও।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নতুনভাবে আবার যুদ্ধের ডোল হাতে তুলে নেন। তার ইঙ্গিতে হযরত যুবাইর বাহিনী টর্নেডো বেগে হাওয়াযিন বাহিনীতে আঘাত হানে। তার বাহিনীর তলোয়ারে বিদ্যুতের স্ফুরণ ঘটতে থাকে। ফলে হাওয়াযিনের হতবিহ্বল বাহিনী অল্পসময়ও টিকতে পারে না। যে যার পথে প্রাণ নিয়ে পড়ি মরি করে গিরিপথ ছেড়ে চলে যায়। গিরিপথটি ছিল বেশ দীর্ঘ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুবাইর বাহিনীকে গিরিপথে অবস্থানের নির্দেশ দিয়ে বলেন, এখন থেকে এটাই হবে আমাদের যুদ্ধক্যাম্প।
