ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গোত্রের যোদ্ধারা হাওয়াযিন এবং ছাকীফের মত শক্তিশালী গোত্রকে পালাতে দেখে তারা ক্ষণিকের জন্যও সেখানে বিলম্ব করে না। যুদ্ধ-বাতাস গায়ে না লাগতেই তারা যুদ্ধের ময়দান হতে সটকে পড়ে সোজা নিজ নিজ এলাকায় ফিরে যায়। মালিক বিন আওফকে রণাঙ্গনের কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। তাকে পাওয়া সম্ভব ছিল না। নিজ শহর তায়েফ রক্ষার চিন্তা তাকে পাগল করে তুলেছিল। সে শেষ দিকে এসে তার গোত্রের অন্যান্য সরদারদেরকে বলেছিল, মুসলমানরা যে প্রেরণা নিয়ে আসছে, তা থেকে সহজেই বুঝা যায় যে, তারা তায়েফ আক্রমণ করে সেখানকার প্রতিটি ইট খুলে ফেলবে। এই আশঙ্কাকে সামনে রেখে সে ছাকীফ গোত্রের সমস্ত বাহিনীকে কৌশলে যুদ্ধ থেকে আলাদা করে তায়েফ চলে যায়।
মালিক বিন আওফ যখন তায়েফ রক্ষায় ব্যস্ত তখন হুনাইন প্রান্তরে চলছিল কিয়ামতের বিভীষিকা। হাওয়াযিনের স্ত্রী-সন্তানদের গগনবিদারী কান্না আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। পুরো হুনাইন উপত্যকা মুসলমানদের অধিকারে চলে আসে। মক্কা থেকে আগত বেসামরিক স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী আহত মুজাহিদদের নিয়ে যায়। আহত শত্রুরা মাটিতে পড়ে কাতরাতে থাকে। অনেকে ধুঁকে ধুঁকে মরছিল। এদের দলে বৃদ্ধ দুরায়দ বিন ছম্মাহও ছিল। সে বৃদ্ধ হলেও জাতির ক্রান্তিকালে কম্পিত হাতে তলোয়ার উঠিয়ে নেয় এবং লড়তে লড়তে নিহত হয়।
গনিমতস্বরূপ মুসলমানরা আহত এবং বন্দি শত্রুদের থেকে বিপুল পরিমাণ যুদ্ধাস্ত্র এবং ঘোড়া পায়। এ ছাড়া ৬ হাজার নারী-শিশু, ২৪ হাজার বকরী এবং প্রচুর রৌপ্য তাদের হস্তগত হয়।
চূড়ান্ত বিজয় লাভ করে মুসলমানরা। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বিজয় উদযাপন করতে দেন না। তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে, মালিককে স্থির হতে দাঁড়াবার এবং সৈন্য সুসংগঠিত করার সুযোগ দেয়া হবে না। তিনি বিপজ্জনক সাপের মাথা থেতলে দিতে চান। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশে গনিমতলব্ধ নারী শিশু, চতুষ্পদ জন্তুসহ অন্যান্য সম্পদ একটি বাহিনীর মাধ্যমে যি’ক আরানায় পাঠিয়ে দেয়া হয়। পরবর্তী নির্দেশ না আসা পর্যন্ত তাদেরকে সেখানেই থাকতে বলা হয়। পরদিনই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশে মুজাহিদ বাহিনী তায়েফ পানে অগ্রসর হয়। এখানে ঘোরতর সংঘর্ষের আশঙ্কা ছিল।
হুনাইন যুদ্ধের বিবরণ পবিত্র কুরআনের সূরা তওবায় উল্লেখিত হয়েছে। কতক সাহাবা যুদ্ধ আরম্ভ হওয়ার পূর্বে নিজেদের সংখ্যাধিক্য দেখে মন্তব্য করেছিলেন; আজ আমাদের পরাজিত করতে পারে এমন কে আছে। এই বিশাল শক্তির মোকাবিলা কে করতে পারে? সূরা তাওবায় বর্ণিত :
“আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করেছেন অনেক ক্ষেত্রে বিশেষ করে হুনাইনের দিনে, যখন তোমাদের সংখ্যাধিক্য তোমাদের আনন্দিত করেছিল, কিন্তু তা তোমাদের কোন কাজে আসেনি এবং দুনিয়া প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বেও তোমাদের জন্য সংকুচিত হয়েছিল। অতঃপর পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে পলায়ন করেছিলে।…
অতঃপর আল্লাহ অবতীর্ণ করেন নিজের তরফ থেকে সান্ত্বনা তাঁর রাসূল ও মুমিনদের প্রতি এবং অবতীর্ণ করেন এমন সৈন্যবাহিনী যাদেরকে তোমরা দেখতে পাওনি। আর শাস্তি প্রদান করেন কাফেরদের এবং এটি হল কাফেরদের কর্মফল।” (সূরা তওবাঃ ২৫-২৬)
♣♣♣
অন্তত একবার পড়ুন
ইতিহাস মুক। সমর বিশেষজ্ঞগণ বিস্মিত। সকলের অবাক জিজ্ঞাসা– ইয়ারমুকের যুদ্ধে মুসলমানরা রোমীয়দের কিভাবে পরাজিত করল? রোমীয়দের সেদিন চূড়ান্ত পরাজয় ঘটেছিল। এ অবিশ্বাস্য ঘটনার পর বাইতুল মুকাদ্দাস পাকা ফলের মত মুসলমানদের ঝুলিতে এসে পড়েছিল।
এটা ছিল অভূতপূর্ব সমর কুশলতার ফল। ইয়ারমুক যুদ্ধে হযরত খালিদ বিন ওলীদ রাযিয়াল্লাহু আনহু যে সফল রণ-কৌশল অবলম্বণ করেছিলেন আজকের উন্নত রাষ্ট্রের সেনা প্রশিক্ষণে গুরুত্বের সাথে তা ট্রেনিং দেয়া হয়।
ইসলামের ইতিহাস অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ির সম্মুখীন হয়ছে। বিভিন্ন ঐতিহাসিক এবং জীবনীকার কোন কোন ঘটনায় পদখলনের শিকার হয়েছেন। একই ঘটনা একাধিকরূপে চিত্রিত হয়েছে। ফলে তা হতে সত্য ও বাস্তব তথ্য আহরণ পাঠকের জন্য গলদঘর্মের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।…
এ উপন্যাসের প্রত্যেকটি ঘটনা সত্য-সঠিকরূপে পেশ করতে আমরা বহু গ্রন্থের সাহায্য নিয়েছি। সম্ভাব্য যাচাই-বাছাই করেছি এবং অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তা লিখেছি।
যে ধাঁচে এ বীরত্বগাঁথা রচিত, তার আলোকে এটাকে কেউ উপন্যাস বললে বলতে পারে, কিন্তু এটা ফিল্মি স্টাইল এবং মনগড়া কাহিনী ভরপুর বাজারের অন্যান্য ঐতিহাসিক উপন্যাসের মত নয়। এর পাঠক উপন্যাসের চাটনিতে ‘ঐতিহাসিকতার পথ্য’ গলধঃকরণ করবেন গোগ্রাসে। এতে ঐতিহাসিকতা বেশী, ঔপন্যাসিকতা কম।
এটা কেবল ইতিহাস নয়, ইসলামী ঐতিহ্যের অবয়ব। মুসলমানদের ঈমানদীপ্ত ঝাণ্ডা। পূর্বপুরুষের গৌরব-গাঁথা এবং মুসলিম জাতির জিহাদী জযবার প্রকৃত চিত্র। পাঠক মুসলিম জাতির স্বকীয়তা জানবেন, সাহিত্যরস উপভোগ করবেন এবং রোমাঞ্চ অনুভব করবেন।
বাজারের প্রচলিত চরিত্রবিধ্বংসী উপন্যাসের পরিবর্তে সত্যনির্ভর এবং ইসলামী ঐতিহ্যজাত উপন্যাস পড়ুন। পরিবারের অপর সদস্যদের পড়তে দিন। নিকটজনদের হাতে হাতে তুলে দিন মুসলিম জাতির এ গৌরবময় উপাখ্যান।
