♣♣♣
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সৈন্যদের এ অবস্থা দেখে বিস্ময়ে ‘থ’ হয়ে যান। সৈন্যরা যে রাস্তা দিয়ে পালাচ্ছিল তিনি সে রাস্তায় গিয়ে দাঁড়ান। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে এ সময় নয়জন অশ্বারোহী ছিলেন। উল্লেখযোগ্য চারজন হলেনঃ ১. হযরত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু; ২. হযরত আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু; ৩. হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং ৪. হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু।
“মুসলমানগণ!” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উচ্চ আওয়াজে আহ্বান করতে থাকেন “কোথায় যাচ্ছ তোমরা? আমি এদিকে দাঁড়ানো। আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলছি।… আমার দিকে লক্ষ্য কর। আমি মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ এখানে দাঁড়ানো।”
মুসলমানরা দিক-বিদিক হয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পাশ দিয়েই পালাতে থাকে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আহ্বান কারো কানে পৌঁছে না। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে কোথাও দেখা যায় না। তিনি ওদিকে কোথাও অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন। এ সময় হাওয়াযিন গোত্রের কতক লোককে উট এবং ঘোড়ায় চড়ে পলায়নপর মুসলমানদের পশ্চাদ্ধাবনে আসতে দেখা যায়। তাদের সামনে ছিল এক উষ্ট্রারোহী। শত্রুপক্ষের পতাকাবাহী ছিল সে। হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু এক মুসলমানকে সাথে নেন এবং উষ্ট্ররোহীর পেছনে দৌড় দেন। কাছে গিয়ে হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু ঐ উটের পিছনের পায়ে তরবারি চালিয়ে পা কেটে ফেলেন। উট কাত হয়ে পড়ে গেলে আরোহীও দূরে ছিটকে পড়ে। হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু আরোহীকে সোজা হয়ে বসার সুযোগ না দিয়ে ধড় থেকে মস্তক বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি টিলার উপর গিয়ে দাঁড়ান। এমন সময় শত্রুপক্ষের জনৈক ব্যক্তি তাকে চিনতে পেরে চিৎকার করে বলতে থাকে –“ঐ যে মুহাম্মাদ… তাঁকে হত্যা কর।” এ আহ্বান শুনে ছাকীফ গোত্রের কিছু লোক ঐ টিলার উপর উঠতে থাকে যেখানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়িয়ে ছিলেন। সাহাবায়ে কেরাম একযোগে তাদের উপর আক্রমণ করেন। সংক্ষিপ্ত সংঘর্ষে তারা পালিয়ে যায়। তাদের একজনও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত পৌঁছতে সক্ষম হয়নি।
‘মালিক বিন আওফের নিকট আমি পরাজিত হব না।” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন– “এত সহজে সে কি করে বিজয় লাভ করতে পারে।”
দিক-বিদিক হয়ে ছোটাছুটিরত সাহাবায়ে কেরামকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখেন। শত্রুপক্ষের তৎপরতাও গভীরভাবে লক্ষ্য করেন। তিনি নিজ সৈন্যদের চেয়ে শত্রুপক্ষের সৈন্যদের গতি ও অবস্থান পর্যবেক্ষণ করতে থাকেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সমর জ্ঞানের আলোকে অনুভব করেন যে, প্রাথমিক অবস্থায় সফল হওয়ায় মালিক এত খুশি যে, পরবর্তী চালের কথা তার মাথায় আসেনি। মুসলিম বাহিনীর এলোপাথাড়ি পলায়ন থেকে সে পুরোপুরি ফায়দা লুটতে পারেনি। সমরকুশলী হিসেবে মালিকের নামধাম থাকায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ধরে নিয়েছিলেন যে, একটু পরেই মালিক বাহিনী মুসলমানদের পশ্চাদ্ধাবন করতে আসবে। কিন্তু পশ্চাদ্ধাবনে আগত সৈন্যসংখ্যা যেমনি ছিল কম, তেমনি তারা সুশৃঙ্খলও ছিল না।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অগ্রবর্তী বাহিনীকে পিছু হঁটে আসতে দেখেছিলেন। কতজন শহীদ বা জখমী হয়েছে তারও একটি ধারণা নিয়েছিলেন। আসলে কয়েকটি অশ্ব এবং তার আরোহী তীর বিদ্ধ হয় মাত্র। শহীদ হয়নি একজনও। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনুমান করতে সক্ষম হন যে, শত্রুরা তীরন্দাজীতে পরিপক্ক নয় এবং তারা তাড়াহুড়োর শিকার। তারা দক্ষ এবং বুদ্ধিমান হলে এত তীরের মাঝে একজনেরও বেঁচে থাকার কথা ছিল না।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাশে দাঁড়ানো সাহাবায়ে কেরামের দিকে নজর বুলান। হযরত আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর প্রতি তার চোখ আটকে যায়। হযরত আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর গলায় আওয়াজ অস্বাভাবিক উচ্চ ছিল। অনেক দূর-দূরান্ত হতে শোনা যেত। দৈহিক দিক দিয়েও তিনি দীর্ঘকায় ছিলেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন– “আব্বাস! তোমার প্রতি আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক। মুসলমানদের আহ্বান কর। তাদেরকে এখানে আসতে বল।”
হযরত আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু সর্বোচ্চ আওয়াজে ডাকতে শুরু করেন– “আনসার ভায়েরা! মদীনাবাসী!…. মক্কার জনগণ… এস… আল্লাহর রাসূলের কাছে এস।” হযরত আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বিভিন্ন গোত্র এবং বিশেষ লোকদের নাম ধরে ধরে ডাকতে থাকেন।
সর্বপ্রথম আসে আনসাররা। তাদের সংখ্যা ছিল কম। কিন্তু একে অপরকে দেখে এগিয়ে আসতে থাকে। মক্কার অন্যান্য গোত্রের কিছু লোকেরাও আসে। সর্বমোট একশজনের মত হয়। এ সময় পিছু হঁটা মুসলমানদের পশ্চাদ্ধাবনে অনেক হাওয়াযিনকে আসতে দেখা যায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ একশ সাহাবীকে আগত শত্রুসেনাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশ দেন।
মুজাহিদ বাহিনী পিছন দিক থেকে তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। হাওয়াযিনের লোকেরা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যায়। তারা আক্রমণ ঠেকাতে চেষ্টা করে কিন্তু মুজাহিদ বাহিনী তাদের সে সুযোগ দেয়নি। অধিকাংশই প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যায়। নিহত এবং আহতরা সেখানেই পড়ে থাকে।
