এখানে একটি ঘটনা উল্লেখযোগ্য আর তা হলো, বিশাল এ বাহিনী দেখে কোন কোন সাহাবী গর্ব ভরে বলেন, “আজ এমন কে আছে যে আমাদের পরাজিত করতে পারে।” দুজন ঐতিহাসিক লিখেন, এই গর্বের মধ্যে অহংকারের আভাষও ছিল।
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন সর্বাগ্রে। হুনাইন উপত্যকার সংকীর্ণ স্থানে তিনি যখন প্রবেশ করেন তখন দিবাকর সবেমাত্র উঠছিল। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু দ্রুত অশ্ব ছুটিয়ে দেন এবং অশ্বের গতি তীব্র থেকে তীব্রতর করেন। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন আবেগতাড়িত যোদ্ধা। নিজের নেতৃত্বের প্রতি তার শতভাগ আস্থা ছিল। অমুসলিম অবস্থায় কুরাইশ সরদার হযরত আবু সুফিয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর প্রতি তার যে প্রধান অভিযোগ ছিল যে তিনি তাকে ইচ্ছেমত লড়তে দেননি। তাঁর ইসলাম গ্রহণের পেছনে এটাও একটি বড় কারণ ছিল যে, তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সৈন্য পরিচালনায় এক ব্যতিক্রমধর্মী নৈপুণ্য দেখেছিলেন, যা তাকে খুবই মোহিত করেছিল। খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ইসলাম গ্রহণের পূর্বে ইকরামা রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে বলেছিলেন, আমার যুদ্ধাবেগ এবং যুদ্ধক্ষেত্রে আক্রমণাত্মক ভঙ্গির মূল্যায়ন শুধু মুসলমানরাই করতে পারে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সমর দক্ষতার যে যথেষ্ট মূল্যায়ন করেছিলেন তার উত্তম প্রমাণ হল, তিনি এই বিশাল বাহিনীর অগ্রগামী বাহিনীর অধিনায়ক ছিলেন।
পূর্বগগনে সূর্যোদয়ের সময় হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর বাহিনী ছিল গিরিপথের সংকীর্ণ জায়গায়। আচমকা আসমান-জমিন ভেঙ্গে পড়তে থাকে। হাওয়াযিন, ছাকীফ ও অন্যান্য গোত্রের সম্মিলিত বাহিনীর গগনবিদারী শ্লোগানে বজ্রধ্বনির ন্যায় কানফাটা আওয়াজ ওঠে এবং বৃষ্টির ন্যায় তীরের ঝাঁক আসতে থাকে। ডান-বামের চত্বর এবং অনতি দূরের পর্বত শৃঙ্গ হতে এ সমস্ত তীর ছুটে আসে।
এটা ছিল প্রতিপক্ষের কৌশলী ফাঁদ। মালিক বিন আওফ এবং দুরায়দ বিন ছম্মাহ দিনের বেলায় ক্যাম্পে কোনরূপ তৎপরতা প্রকাশ হতে দেয়নি। তাদের নীরবতার কারণে মনে হতে থাকে এটা কোন সেনাক্যাম্পই নয়। কোন কাফেলার যাত্রাবিরতি শিবির মাত্র। সন্ধ্যার পর মালিক বিন আওফ সৈন্যদেরকে হুনাইনের সংকীর্ণ গিরিপথে তীরন্দাজ বাহিনীকে রাস্তার দু’পাশের গোপন স্থানে অবস্থান করতে বলে।
তীরের বর্ষণ যেমনি ছিল অতর্কিত তেমনি পরিমাণেও ছিল অসংখ্য। মুজাহিদদের অশ্ব তীরের আঘাতে আহত হয়ে নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে এলোপাথাড়ি দৌড়তে থাকে। তীরের আঘাত থেকে যারা রক্ষা পায় তারাও পিছনে চলে আসার চেষ্টা করে। ফলে এতে তীর বর্ষণ তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে ওঠে। অশ্ব ও সওয়ারী উভয়ই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করে হুলস্থুল পড়ে যায়।
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তীর বর্ষার মাঝে দাঁড়িয়ে চিৎকার দিয়ে বলছিলেন, “পালিয়ো না; পৃষ্ঠপ্রদর্শন করো না। মোকাবিলা কর। আমরা শত্রুদেরকে…।” অশ্ব এবং অশ্বারোহীদের হুলস্থুল এমন ভয়ানক অবস্থার সৃষ্টি করেছিল যে, হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর আহবান কেউ শুনতে পায়নি। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর দেহে মোট কতটি তীর বিদ্ধ হয়েছে এটা দেখারও কারো সুযোগ ছিল না। অথচ তিনি একটুও পিছু না হঁটে তীর-বৃষ্টির মাঝে দাঁড়িয়ে তার বাহিনীকে মোকাবিলার জন্য চিৎকার করে আহ্বান করেছিলেন। অবশেষে তিনিও পলায়নপরদের ভীড়ে পড়ে যান এবং ভীড় তাকে ঠেলতে ঠেলতে এমনভাবে দূরে সরে আসে যেন কোন প্রবল স্রোত তাঁকে ভাসিয়ে এনেছে।”
পলায়নপর বাহিনীর বেশামাল ধাক্কা একদিকে সরে যায়। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর দেহে এত আঘাত লাগে যে, তিনি ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে যান এবং অজ্ঞান হয়ে জমিনে লুটিয়ে পড়েন।
মূল বাহিনী আসছিল অগ্রগামী বাহিনীর পিছনে। এই বাহিনীতে উশৃঙ্খল সেচ্ছাসেবক দলও ছিল। অগ্রগামী বাহিনী পেছনে পালিয়ে এলে মূল বাহিনীতেও ছোটাছুটি শুরু হয়ে যায়। অগ্রগামী বাহিনীর অনেকের গায়ে তীর বিদ্ধ ছিল; তাদের পোশাক ছিল রক্তেরঞ্জিত। অশ্বের দেহেও অসংখ্য তীর ছিল। মালিক বিন আওফের সৈন্যদের ফালফাটা শ্লোগান শোনা যাচ্ছিল। এই অবস্থায় মুসলিম বাহিনী বিক্ষিপ্ত হয়ে পিছে সরে যায়।
কোন কোন ঐতিহাসিকের অভিমত, যারা আন্তরিকভাবে ইসলাম গ্রহণ করেনি এবং সৈন্যদের মাঝে তারা এমনভাবে হুলস্থুলকে বৃদ্ধি করে যেমন পেট্রোলের সংযোজন আগুনকে বৃদ্ধি করে। তারা নিজেরা শুধু পলায়নই করেনি অন্যদের মাঝেও আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়। দু’কারণে তারা আনন্দিত ছিল। ১. নিজেদেরকে যুদ্ধ থেকে বাঁচাতে পেরেছে এবং ২. মুসলমানরা পলায়নপর; তাদের পরাজয় ঘটেছে।
কিছু সংখ্যক মুসলমান পালিয়ে যেখান থেকে যাত্রা শুরু করেছিল সেখানে গিয়ে পৌঁছে। পলায়নপর অধিকাংশ সৈন্য এখানে এসে আশ্রয় নেয়। যারা রণাঙ্গন থেকে পালিয়ে ফিরে আসে তাদের বেশির ভাগই জানে না আসল ঘটনা কি? আর শত্রুরাই বা কোথায়, যাদের ভয়ে সৈন্যরা এভাবে পালাচ্ছে? পলায়নের গতি এতই তীব্র ছিল যে উট এবং ঘোড়ার সংঘর্ষ পর্যন্ত হচ্ছিল। পদাতিকরা এ সমস্ত ঘোড়া এবং উটের পদতলে পিষ্ট হওয়া থেকে আত্মরক্ষা করতে রাস্তার দু’পার্শে ছোটাছুটি করছিল।
