বৃদ্ধ ইহুদী বলে– “আমার একমাত্র লক্ষ্য মুসলমানদের ধ্বংস সাধন করা।”
♣♣♣
ঐতিহাসিকগণ লিখেন, হাওয়াযিন এবং ছাকীফ গোত্রয় বেশ শক্তিশালী ছিল। মুসলমান কর্তৃক মক্কা বিজয় হলে তাদের আশঙ্কা হয় যে, তারা পৃথক পৃথক এলাকায় বাস করে এবং বসতি এলাকার সংখ্যাও প্রচুর। তারা এক জায়গায় থাকে না; বহু দূরে দূরে তাদের আবাস। মুসলমানরা প্রত্যেকটি এলাকা দখল করে তাদেরকে টুকরো টুকরো করে দিতে পারে। নিজেদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার দেখে তারা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছে যে, বিভিন্ন গোত্রকে ঐক্যবদ্ধ করে সম্মিলিতভাবে মুসলমানদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে।
উভয় গোত্র যুদ্ধ করতে সক্ষম লোকদের নিয়ে হুনাইনের কাছাকাছি আওতাস নামক স্থানে চলে যায়। মুসলমানরা তাদের বসতির উপর আক্রমণ করে তাদের সমূলে ধ্বংস করছে– একথা বলে তাদের নেতারা পাশ্ববর্তী আরো কয়েক গোত্রকে নিজেদের সাথে মিশিয়ে নেয়। মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ১২ হাজার। এই সম্মিলিত বাহিনীর সর্বাধিনায়ক নিযুক্ত হয় মালিক বিন আওফ। তার অনুমতি ছিল, কেউ ইচ্ছা করলে তার স্ত্রী, পুত্র-কন্যাসহ গৃহপালিত পশুও সাথে নিয়ে যেতে পারবে। এই অনুমতির পিছনে তার এই যুক্তি ছিল যে, মক্কার অবরোধ বেশ দীর্ঘ হতে পারে। ফলে এ সময় সৈন্যদের স্ত্রী, পুত্র ও গৃহপালিত পশুর ব্যাপারে চিন্তা হতে পারে যে, তারা কেমন আছে। এই ঢালাও অনুমতি হতে প্রায় সকলেই ফায়দা লাভ করে। ফলে সৈন্যদের তুলনায় তাদের স্ত্রী সন্তানদের সংখ্যা ছিল কয়েকগুণ বেশি। উটও ছিল অগণিত।
দুরায়দ বিন ছম্মাহ ছিল অত্যন্ত বৃদ্ধ। যুদ্ধে যাবার সামর্থ্য তার ছিল না। কিন্ত সৈন্যদের প্রয়োজনীয় দিক-নির্দেশনা দিয়ে সময় মত লড়ানোর যোগ্যতা তার মত আর কারুর ছিল না। সর্বাধিনায়ক মালিক বিন আওফের বড় গুণ হল তার আবেগ ছিল অস্বাভাবিক। দুরায়দকে সাথে করে নিয়ে আসা হয় তার অভিজ্ঞতার কারণে।
সৈন্যরা আওতাসে এসে অবস্থান নিলে দুরায়দ বিন ছম্মাহ এসে সৈন্যদের সাথে মিলিত হয়। বেলা তখন অপরাহ্ন। সন্ধ্যা সমাগম। সেনা ছাউনিতে আসা মাত্রই তার কানে ছোট ছোট শিশুদের কান্নার আওয়াজ ভেসে আসে এবং বকরী, গাধার সন্ধ্যাকালীন ডাক। সে একজনের কাছে জানতে চায়, সৈন্যদের সাথে ছোট ছোট শিশুরা এবং বকরী-গাধা কে নিয়ে এসেছে? তখন তাকে জানানো হয় যে, পরিবার-পরিজন এবং চতুষ্পদ জন্তু সাথে করে নিয়ে আসতে সেনাপতি কেবল অনুমতিই দেয়নি; বরং এ ব্যাপারে বেশ উৎসাহিত করেছে।
দুরায়দ বিন ছম্মাহ সেনাপতি মালিক বিন আওফের তাঁবুতে গিয়ে জিজ্ঞাসা করে “এ তুমি কি করলে? এমন সেনাবাহিনী আমার দৃষ্টিতে এই প্রথম, সেনাবাহিনীর পরিবর্তে যাদেরকে বাসস্থান পরিবর্তনকারী কোন কাফেলা বলে মনে হচ্ছে।”
মালিক বিন আওফ বলে– “জনাব। আপনার বিচক্ষণতা ও অভিজ্ঞতার ব্যাপারে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। কিন্তু আমার মাথায় যে পরিকল্পনা এসেছে তা সারা জীবন আপনার কল্পনায় আসেনি। আমি সৈন্যদেরকে একথা বুঝিয়েছি যে, অবরোধ বেশ দীর্ঘ হতে পারে। তখন যেন স্ত্রী-পরিজন ও চতুষ্পদ জন্তুর কথা মনে না পড়ে সে জন্য এদের সাথে আনতে বলেছি। কিন্তু আমার উদ্দেশ্য ভিন্ন। আমি মক্কা অবরোধ করব না। গিয়েই হামলা শুরু করব। মুসলমানদের অজান্তে তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ব। আপনি জানেন যে, মুসলমানরা খুবই সুকৌশলী এবং বিচক্ষণ। তারা অভিনব কৌশলে লড়তে থাকবে। আমাদের সৈন্যরা তাদের বীরত্ব এবং চালের সম্মুখে টিকতে নাও পারে। কিন্তু যখন তাদের মনে পড়বে যে স্ত্রী, পুত্র, স্বজন এবং পশু-প্রাণীর মায়ায় জীবন বাঁচাতে পালাব, আমরা পলায়ন করলে তাদের জীবন ধ্বংসের সম্মুখীন হবে তখন তারা এ চিন্তা না করে জীবন বাজি রেখে বীর বিক্রমে যুদ্ধ করবে।”
“অভিজ্ঞতা বয়সের দ্বারা অর্জিত হয় মালিক।” দুরায়দ বলে, “তোমার মধ্যে প্রেরণা আছে। আছে আত্মমর্যাদাবোধ এবং সাহসিকতা। কিন্তু বুদ্ধি তোমার এখনও পরিপক্ক হয়নি। পরিবার-পরিজনের কারণে সৈন্যদের মনোযোগ এখন সামনে নয়, পেছনে থাকবে। সর্বদা এই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা তাদের মাঝে বিরাজ করবে যে, শত্রুরা সৈন্যদের উপর পাল্টা হামলা চালালে তারা দ্রুত স্ত্রী পরিজনের কাছে এসে দাঁড়াবে, যেন অন্তত তারা শত্রুদের থেকে নিরাপদ থাকে।… এক বিরাট দুর্বলতা তুমি সাথে করে এনেছ। মুহাম্মাদের-নেতৃত্বের ধারণা তোমার নেই। তার অধীনে প্রখ্যাত এবং নামকরা সেনাপতিরা রয়েছে। তারা স্বল্প সময়ে আমাদের দুর্বলতা আঁচ করতে পেরে এই দুর্বল পয়েন্টে আঘাত হানবে। তারা সৈন্যদের চেয়ে স্ত্রী-সন্তান ও চতুষ্পদ জন্তুর উপর হামলা করতে বারবার চেষ্টা করবে। তাদের সাথে না নিয়ে এখানে রেখে যাও আর শুধু সৈন্যদের নিয়ে মক্কায় রওনা হও।”
মালিক বিন আওফ বলে– “সম্মানিত শায়েখ! বর্তমানে বয়সের ভারে একদিকে আপনার অভিজ্ঞতা প্রচুর হলেও অন্যদিকে বোধশক্তিতে কমতি সৃষ্টি হয়েছে। সেনাপতি আমি, তাই নির্দেশ চলবে আমারই। প্রয়োজন মনে করলে আপনার কাছে পরামর্শ চাইব। আপনি এখন আসতে পারেন।”
ঐতিহাসিকগণ লিখেন, মালিক বিন আওফ দুরায়দের পরামর্শ গ্রহণ না করে বরং উল্টো তাকে অপমান করে। মালিকের কাছে তার কথার মূল্য না থাকলেও অন্যদের কাছে যথেষ্ঠ গুরুত্ব ছিল। কিন্তু তিনি শুধু এই কারণে চুপ হয়ে যান যে, এখন নিজেদের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্বের সময় নয়।
