মালিক বিন আওফ দুরায়দকে বলে– “সৈন্যদের ব্যাপারে আপনার অন্য কোন পরামর্শ থাকলে বলতে পারেন।”
“আমার যা করার তা তোমাকে জানানো ব্যতীতই আমি করব।” দুরায়দ বলে– “আমার মধ্যে যদিও লড়ার শক্তি নেই কিন্তু অন্যদের লড়াতে পারি।”
এরপর দুরায়দ নিজ তাঁবুতে গিয়ে বিভিন্ন গোত্রের নেতাদেরকে ডেকে পাঠায়। তারা একত্রিত হলে তাদের উদ্দেশে শুধু এতটুকু বলে যে– সংঘবদ্ধ হয়ে আক্রমণ করবে। পরস্পর বিচ্ছিন্ন হবে না। সমস্ত সৈন্যকে জানিয়ে দেবে, যদ্ধের পূর্বেই যেন প্রত্যেকে নিজ নিজ তরবারির খাপ ভেঙ্গে ফেলে দেয়।”
তৎকালীন আরবের নিয়ম ছিল, যুদ্ধে তরবারির খাপ ভেঙ্গে ফেললে তার অর্থ ছিল, লোকটি যুদ্ধ করতে করতে প্রাণ দিবে; পৃষ্ঠপ্রদর্শন করবে না। পরাজিত হবে না। তরবারির খাপ ভেঙ্গে ফেলাকে বিজয় বা মৃত্যুর ঘোষণা বলে মনে করা হত।
দুরায়দ গোত্রপতিদের ডেকে স্ত্রী-পরিজন ও চতুষ্পদ জন্তু আওতাসে রেখে শুধু সৈন্যদেরকে মক্কা যেতে বলে একথা কোন ইতিহাসে পাওয়া যায় না। তবে দু’জন ঐতিহাসিকের মতে, মূল যুদ্ধের সময় কেবল হাওয়াযিন গোত্রের পরিজন চতুস্পদ জন্তু সাথে ছিল।
♣♣♣
মুসলমানদের বিরুদ্ধে বহু গোত্রের ঐক্য জোট হওয়ার এটা ছিল দ্বিতীয় ঘটনা। মালিক বিন আওফ এই আশায় সম্মিলিত বাহিনী নিয়ে রওনা হয় যে, তারা অতর্কিতে হামলা করবে। তার বাহিনীর এতদিন মক্কায় চলে যাওয়ার কথা। চলার গতিও হত বেশ দ্রুত। কিন্তু অন্যান্য গোত্রের আওতাসে এসে মূল বাহিনীর সাথে মিলিত হওয়ার কথা থাকায় অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাদের এখানে বিলম্ব হয়ে যায়।
শুধু সৈন্য থাকলেও তারা এতদিন রওনা হতে পারত। কিন্তু সৈন্যসংখ্যার চেয়ে পরিজন এবং চতুষ্পদ জন্তু ও তাদের গৃহস্থালী মালামাল অধিক থাকায় আওতাস হতে তাদের রওনা হতে বেশ দেরী হয়। এ সময় মক্কার অলি-গলিতে একটি আওয়াজ সবাইকে চমকে দেয়।
“মুসলমান! সাবধান প্রস্তুত হও।” এক উষ্ট্রারোহী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাসভবনের দিকে যাচ্ছিল আর এই আহবান করছিল– “আল্লাহর কসম! যা আমি স্বচক্ষে দেখেছি, তা তোমাদের কারো চোখ দেখেনি।”
একজন তাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করে– “কি হৈ-চৈ করে ফিরছ? থাম স্থির হয়ে বল, কি দেখে এসেছ?”
“রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলব।” লোকটি পথে না থেমে যেতে যেতে বলে– “প্রস্তুত হও। হাওয়াযিন এবং ছাকীফের সৈন্যরা”…।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কাছে বিস্তারিত তথ্য পেয়ে যান যে, হাওয়াযিন এবং ছাকীফ গোত্রের সাথে অন্যান্য গোত্রের হাজার-হাজার লোক আওতাসের কাছে জড়ো হয়েছে। তাদের উদ্দেশ্য মক্কা আক্রমণ করা এবং তারা রওনা হওয়ার উপক্রম। ইতিহাসে ঐ ব্যক্তির নাম পাওয়া যায় না। ঐতিহাসিকদের বর্ণনা মতে শুধু এতটুকু জানা যায় যে, বহুজাতিক বাহিনীর সমবেত হওয়ার কথা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগেই অবগত হয়ে যান।
এ সমস্ত ঐতিহাসিক এবং পরবর্তী বিশ্লেষকদের মতে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইচ্ছা ও চেষ্টা এটাই ছিল, যে কোন উপায়ে যুদ্ধ-বিগ্রহ এড়িয়ে চলা এবং যে সমস্ত অমুসলিম শক্তি মুসলমানদেরকে দুশমন ভাবে এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে তাদের প্রতি সহমর্মিতা, শান্তি ভ্রাতৃত্বের পয়গাম প্রেরণ করা।
একদিকে এই ইচ্ছা, অপরদিকে ৬৩০ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারী মাসে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুদ্ধে গমনের মত অবস্থায় ছিলেন না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে পরামর্শ দেয়া হয় যে, শহরের পুনর্গঠন সাময়িকভাবে স্থগিত রেখে শহরের প্রতিরক্ষার দিকে দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন। সকল প্রস্তুতি নিয়ে শত্রুর হামলা প্রতিহত কিংবা অবরোধের অপেক্ষা করা উচিত।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরামর্শদাতাদের পরামর্শ এই বলে আমলে নেননি যে, আমরা এখানে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ করে বসে থাকলে যখন প্রতিপক্ষ টের পাবে যে, আমরা সতর্ক এবং কেল্লা বন্ধ করে বসে আছি, তখন শত্রুরা মক্কা থেকে অনতি দূরে তাঁবু গেড়ে এই অপেক্ষায় বসে থাকবে যে, আমরা প্রতিরক্ষায় সামান্য শৈথিল্য প্রদর্শন করি, আর তারা এই সুযোগে শহর অবরোধ করে ফেলবে অথবা একযোগে হামলা করবে। এটা খাল কেটে কুমির আনার মতই মহাবিপদ হবে। কারণ তারা তখন আমাদের জন্য সার্বক্ষণিক বিপদের কারণ হয়ে থাকবে।
সে যুগের উদ্ধারকৃত বিভিন্ন প্রমাণাদি হতে জানা যায় যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলমানদের জন্য তিনটি যুদ্ধনীতি প্রণয়ন করেন। ১) শত্রু নিজ ভূখণ্ডে থেকে আহ্বান করলে তখন পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া। ২) শত্রুর ইচ্ছা এবং উদ্দেশ্য জেনে গেলে নিজ ভূখণ্ডে বসে থেকে শত্রুর অপেক্ষায় না থাকা; বরং নিজেরা এগিয়ে গিয়ে তাদের উপর হামলা করা এবং ৩) সার্বক্ষণিক যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে থাকা। শত্রুদের মধ্যে এই উদ্বেগ রাখতে হবে যে, যে কোন সময় মুসলমানরা তাদের যুদ্ধের প্রতি আহ্বান করতে পারে অথবা তাদের বিরুদ্ধে কোন ষড়যন্ত্র করলে বিদ্যুৎগতিতে মুসলমানরা তাদের পাল্টা জবাব দিবে।
