৬৩০ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারী মাসে হাওয়াযিন গোত্র ছাকীফ গোত্রের অতিথি হয়ে তায়েফে এসেছিল। এবং ছাকীফ গোত্রকে মক্কা আক্রমণের জন্য উত্তেজিত করেছিল এ সময় হাওয়াযিনের এক নেতা প্রস্তাব করে যে, জ্যোতিষী ডেকে ভাগ্য গণনা করা হোক আমাদের আক্রমণ সফল হবে কি-না। ভাগ্য নির্ধারক তীর দ্বারা এই ফলাফল নির্ণয় করা হত। মূর্তির হাতে একটি থলে থাকত। তাতে অনেকগুলো তীর থাকত। কিছু ‘হা’ না– কি ‘না’। চিহ্নিত তীরই হত ফলাফল; ভাল-মন্দ নির্ণয়।
ভাগ্য নির্ণয়ের ক্ষেত্রে পুরোহিতের তুলনায় জ্যোতিষীর মর্যাদা ছিল বেশি। জ্যোতিষী হত জ্ঞানী-বিচক্ষণ। সহজে হৃদয় জয় করার অনেক দুর্বোধ্য মন্ত্র তাদের জানা থাকত। জ্যোতিষী ভাগ্য নির্ণয় ছাড়াও অদৃশ্যের খবর জানত। মানুষ তাদের প্রতিটি কথা সত্য বলে বিশ্বাস করত।
পরদিন ভোরে হাওয়াযিন এবং ছাকীফ গোত্রের দু শীর্ষ নেতার সামনে জনৈক জ্যোতিষী বসা ছিল। তারা কোন কথা বলার পূর্বেই জ্যোতিষী কথা বলে ওঠে।
“আমি গায়েবের খবর নিতে পারি এবং ভূত-ভবিষ্যতে ডুব দিয়ে বলে দেব যে, ভবিষ্যত কেমন হবে এবং তাতে কি কি ঘটবে অন্তরে কি আছে তাও বলতে পারব” জ্যোতিষী চোখ বন্ধ করেই বলে– “তোমরা কোন কথা না বলে তোমরা কি বলতে এসেছ, আমার মুখে শোন। তোমরা যাদের উপর আক্রমণ করতে মনস্থ করেছ তাদেরকে এক প্রকার ঘুমন্ত মনে করতে পার। তারা মক্কা দখল করে এখন তার শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় ব্যস্ত। মক্কায় কর্তৃত্বের ভিত্তি মজবুত করতে ব্যস্ত। মক্কায় এখনও তাদের শত্রু আছে। মুহাম্মাদের ধর্ম সবাই মেনে নেয়নি।”
দুরায়দ বিন ছম্মাহ বলে– “সম্মানিত জ্যোতিষী! আপনি দয়া করে বলুন, মুহাম্মাদের অগোচরে আমরা তাকে বাগে আনতে পারব কি-না? আমাদের অতর্কিত আক্রমণ মুসলমানদের কোমড় গুড়িয়ে দেবে কি-না?”
জ্যোতিষী আকাশের দিকে চায় এবং কিছুক্ষণ দুর্বোধ্য ভাষায় মন্ত্র পড়ে বলে– “ভবিষ্যতের পর্দা ফাঁক করে দেখলাম।… তোমাদের হামলা হবে অতর্কিতে। তোমাদের তরবারি যখন তাদেরকে কচুকাটা করতে থাকবে তখনই তারা টের পাবে, শাহরগ স্পর্শিত তলোয়ারের আঘাত থেকে কে নিজেকে রক্ষা করতে পারে?… এটাই উপযুক্ত সময়, এটাই অপূর্ব সুযোগ। মুসলমানরা একবার নিজেদেরকে গুছিয়ে নিতে পারলে তোমাদের আশা আর পূর্ণ হবে না। উল্টো মুসলমানরাই তোমাদের পিছু ধাওয়া করে তোমাদের ধন-সম্পদ এবং নারীদেরকে তোমাদের লাশের উপর দিয়ে টেনে হেঁচড়ে নিয়ে যাবে।… এখন শুভাশুভ যাচাই করার আর দরকার নেই। ‘লাত’ দেবী নিজেই হামলার পক্ষে ইঙ্গিত দিয়ে জিজ্ঞাসা করেছে, আমার পূজারীদের তরবারি এখনও কোষাবদ্ধ কেন?”
এক নেতা জিজ্ঞাসা করে “কোন নজরানা লাগবে?”
জ্যোতিষী বলে, “তোমাদের কাছে ‘হাম’ থাকলে তা নজরানা হিসেবে দিতে পার। আর না থাকলে দরকার নেই। তবে স্বীয় গোত্রকে জোর দিয়ে বলবে, তারা যেন রণাঙ্গনে পৃষ্ঠপ্রদর্শন না করে। এ যুদ্ধে রক্ত এবং প্রাণ উৎসর্গ করতে হবে।… হামের খোঁজে সময় অপচয় করো না।… যাও, আমি তোমাদেরকে সব কিছু জানিয়ে দিলাম। মক্কায় মুসলমানরা খুবই ব্যস্ত। তারা এখন রণসাজে সজ্জিত নয়। এটা মোক্ষম সুযোগ। এ সুযোগের সদ্ব্যবহার কর। সুযোগ একবার হাতছাড়া হয়ে গেলে তখন আফসোস ছাড়া আর কিছুই করার থাকবে না।”
যে উটের বংশধারা চতুর্থ স্তরে উন্নীত হয় তাকে ‘হাম’ বলে। সে সময় মানুষ এ ধরনের উট উপাস্যের নামে ছেড়ে দিত। এ উটকে অতি পবিত্র ভেবে কেউ তাকে কোন কাজেই ব্যবহার করত না। এদের দেহে সাংকেতিক চিহ্ন থাকত এ ধরনের উট যার সামনেই পড়ত সে তাকে সম্মান করত এবং ভাল খাদ্য দ্বারা তাকে আপ্যায়ন করাত।
হাওয়াযিন এবং ছাকীফ গোত্রের শীর্ষনেতারা জ্যোতিষীর সুবাক্য নিয়ে চলে গেলে জ্যোতিষী অন্তপুরে চলে যায়। সেখানে আগে থেকেই ঐ ইহুদী বসা ছিল, গতকাল অনুষ্ঠান চলাকালে মালিক বিন আওফ যাকে ইঙ্গিতে বলেছিল যে, সে যেন সকলের জিম্মী হয়ে থাকার তাৎপর্য বুঝিয়ে দেয়।
“আমি তোমার দায়িত্ব পালন করেছি।” জ্যোতিষী ঐ ইহুদীকে বলে– “এরা মক্কায় রওনা হতে আর বিলম্ব করবে না।”
বৃদ্ধ ইহুদী জানতে চায় তারা কি সফল হতে পারবে?”
“বীরত্ব এবং বিচক্ষণতার মধ্যে সফলতা রয়েছে।” জ্যোতিষী বলে, “যদি তারা কেবল আবেগের উপর নির্ভর করে লড়াই করে এবং বুদ্ধিমত্তার পরিচয় না দেয়, তাহলে মুহাম্মাদের সুশিক্ষিত সৈন্যেরা তাদেরকে শোচনীয়ভাবে পরাস্ত করবে।… আমার পুরস্কার কই?”
“তোমার পুরস্কার সাথে করেই নিয়ে এসেছি।” বৃদ্ধ ইহুদী তার এ কথা বলে একজনকে ডাক দেয়।
অপর কামরা থেকে এক সুন্দরী নারী বের হয়ে আসে। বৃদ্ধ ইহুদী তার জোব্বার পকেট থেকে দু’টি স্বর্ণের টুকরো বের করে এনে জ্যোতিষীকে দেয়।
“আমি আগামীকাল সকালে এসে এই যুবতীকে নিয়ে যাব।” বৃদ্ধ ইহুদী বলে।
“আমি তোমাকে একটি কথা বলতে চাই।” জ্যোতিষী বলে, “আমি তোমার অনুরোধে সাড়া দিয়ে তাদেরকে এখনই মক্কা আক্রমণ করতে উস্কে দিয়েছি। কিন্তু তাদের নেতারা খুবই অভিজ্ঞ এবং বুদ্ধিমান। তারা পরিস্থিতি অনুধাবন করতে সক্ষম। তাদের বৃদ্ধ সর্দার দুরায়দ বিন ছম্মাহ পূর্ব থেকে অবগত যে, মক্কায় মুসলমানরা এখনও সবকিছু সামাল দিতে পারেনি। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বিধানসহ অনেক কাজ এখনও তাদের সামনে রয়েছে। তাদের উপর হামলা করার এটাই উপযুক্ত সময়। হাওয়াযিন এবং ছাকীফ গোত্রের শীর্ষ নেতারা এ বিষয়ের সত্যতা যাচাই করতে আমার নিকট এসেছিল। খুব ভাল হয়েছে যে, তাদের আসার পূর্বেই তুমি গোপনে আমার কাছে এসে সবকিছু অবগত করিয়েছ।”
