“শোনা যায় মুহাম্মাদের হাতে নাকি জাদু আছে।” হাওয়াযিন গোত্রের এক নেতা বলে– “সে যার দিকে তাকায়, সেই তার ভক্ত হয়ে পড়ে।”
“যেখানে তলোয়ার চলে সেখানে জাদুর অস্তিত্ব থাকতে পারে না।” হাওয়াযিন গোত্রের আরেক নেতা নিজের তরবারির বাটে হাত রেখে বলে– “মালিক! তোমার পরিকল্পনা পরিষ্কার করে বল। আমরা তোমার সাথে আছি।”
“আমি বলতে চাই ঐক্যবদ্ধভাবে আমরা যদি মুহাম্মদের ইসলাম প্রতিহত না করি তাহলে তা প্লাবনের মত বৃদ্ধি পেতে থাকবে এবং একদিন এ প্লাবন আমাদেরও ভাসিয়ে নিয়ে যাবে।” মালিক বিন আওফ বলে– “সেদিন হাওয়াযিন বলতে কেউ থাকবে না, বনু ছাকীফের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে না। কুরাইশ গোত্রকে যারা জোর করে জিম্মী বানিয়ে রেখেছে আমরা তাদেরকে মক্কার ভিতরেই শেষ করে দিব।… জিম্মী হওয়ার অর্থ আপনারা বুঝতে পেরেছেন?”
মালিক বিন আওফ সকলের দিকে চোখ বুলিয়ে বলে, “না বুঝলে আমি বলছি।” – এরপর সে পিছনে ফিরে তাকায়।
মালিক বিন আওফের পিছনের সারিতে মেহমানদের মাঝে শুভ্র দাড়িওয়ালা এক অশীতিপর বৃদ্ধ বসা ছিল। তার গায়ের রং অন্যদের তুলনায় ফর্সা ছিল। অতিশয় দুর্বলতা হেতু তার মাথা কাঁপছিল এবং কোমর বক্র ছিল। তার হাতে দেহ সমান লম্বা লাঠি ছিল। গায়ে ছিল লম্বা জুব্বা, যা কাঁধ থেকে পায়ের গোড়ালী পর্যন্ত। সব মিলিয়ে উপস্থিত দর্শকের চোখে সে ছিল কোন পণ্ডিত নতুবা ধর্মগুরু। মালিক বিন আওফের ইশারায় সে আসন ছেড়ে উঠে মালিকের কাছে আসে।
“স্রষ্টার রহমত বর্ষিত হোক তোমার উপর বৃদ্ধ বলে– “যে দেবতার উপাসনা তুমি কর তিনি তোমার সন্তান-সন্ততির হেফাজত করুন। দাসত্বের তাৎপর্য না বুঝতে পারলে আমাকে জিজ্ঞাসা কর। আমার চার যুবতী কন্যা আজ মুসলমানদের হাতে বাঁদী। দু’যুবক পুত্র মুসলমানদের গোলাম। তারা তরবারি চালনা এবং অশ্বারোহিতে পটু ছিল। কিন্তু তরবারি স্পর্শ করা এবং ঘোড়ার ধারে কাছে যাওয়া তাদের অনুমতি নেই। আমাকে বাড়ী থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে।
তোমরা বোধ হয় ভুলে গেছ, কুরাইশরা মদীনা অবরোধ করলে মুসলমানরা প্রতিরক্ষা হিসাবে শহরের চতুর্দিকে পরিখা খনন করেছিল। কুরাইশদের পক্ষে সে পরিখা অতিক্রম করা সম্ভব হয়নি। এরপর প্রলয়ংকরী তুফানের দরুন প্রথম থেকেই হীনতার শিকার কুরাইশ সৈন্যের মনোবল ভেঙ্গে যায়। ফলে তারা মক্কায় ফিরে যায়।
ছাকীফ গোত্রের এক সর্দার জোরালো কণ্ঠে বলে– “জনাব! আপনার কথাবার্তায় বুঝা যায়, আপনি ইহুদী। আচ্ছা বলুন তো, আপনার ইহুদী গোত্র সে সময় মুসলমানদের সাথে প্রতারণা করেছিল যে কথা আমরা শুনেছিলাম তা কি সত্য?”
“হ্যাঁ, যা শুনেছ সবই সত্য।” বৃদ্ধ বলে– “আমাদের প্রতারণা! আমরা পিছন থেকে মুসলমানদের পৃষ্ঠদেশে খঞ্জর বসাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এর আগেই কুরাইশরা রণে ভঙ্গ দেয়। প্রতারণার ফাঁদে ফেলে মুসলমানদেরকে দুর্বল করে দেয়া ছিল আমাদের প্রধান কর্তব্য ও দায়িত্ব। কিন্তু তাদের তরবারি বড় ধারালো। আমাদের সকল পরিকল্পনা কেটে টুকরো টুকরো করে দিয়েছে।”
ছাকীফ গোত্রের আরেক নেতার স্পষ্টবাদী প্রশ্ন “মাননীয় ইহুদী? আপনার গোত্র হত্যার প্রতিশোধ নিতে আপনি আমাদেরকে প্ররোচিত করতে এসেছেন”?
এ সময় আরেক বয়োবৃদ্ধ আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। তার নাম দুরায়দ বিন ছম্মাহ।
দুরায়দ বিন ছম্মাহ গর্জে উঠে বলে– “চুপ কর। আমরা বনী ইসরাঈলের রক্তের প্রতিশোধ নিব না। এখনও তোমরা দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভোগছ? সন্দেহের আবর্তে নিপতিত? এ বাস্তবতা অনুধাবনের সময় কি এখনও হয়নি যে, মুসলমানদের উপর আক্রমণ করে আমরা যদি আজ তাদের রক্ত আমাদের তরবারিকে পান না করাই এবং তাদের আহতদেরকে ঘোড়ার পদতলে পিষ্ট না করি, তাহলে সেদিন বেশি দূরে নয় যেদিন তারা আমাদেরকে হত্যা করে কন্যা, বোন ও স্ত্রীদেরকে দাসী এবং পুত্রদেরকে গোলাম বানাবে।
“তাদের অশ্ব তায়েফের অলি-গলিতে চিঁহি চিঁহি রবে প্রদক্ষিণ করার আগেই কি এটা সমীচিন নয় যে, আমাদের অশ্ব তাদের লাশগুলো মক্কার অলি-গলিতে পিষ্ট করুক?” মালিক বিন আওফ আবেগ আপ্লুত কণ্ঠে বলে– “বনী ইসরাঈলের এই ভদ্রলোক আমাদের নিরাপত্তার আশ্রয় গ্রহণ করেছেন। তিনি তার গোত্রের যে করুন পরিণতির কথা বর্ণনা করেছেন আমি আপনাদেরকে ঐ পরিণতি হতে বাঁচাতে চাই।… চল, লাত দেবীর নামে শপথ করি যে, মক্কার মূর্তিধ্বংসকারী মুহাম্মাদ ও তার অনুসারীদের খতম করে তবেই আমরা স্ত্রীদের কাছে যাব এবং তাদেরকে আমাদের মুখ দেখাব।”
ইসলাম দিবাকরের আলো যখন চতুর্দিকে প্রসারিত হচ্ছিল তখন আরব ভূখণ্ডে ব্যাপকভাবে মূর্তিপূজা হত। উপাস্য নির্বাচনের ব্যাপারে দল-মত-গোত্র-বর্ণে বিভিন্নতা থাকলেও উপাসনার বেলায় সবাই ছিল এক মতাদর্শী। পূজা আরাধনার ব্যাপক চর্চা চললেও তারা আবার আস্তিক ছিল। তারা আল্লাহর অস্তি ত্ব বিশ্বাস করত। তাদের দোষ ছিল, আল্লাহ্ পর্যন্ত পৌঁছতে তারা মাঝখানে মাধ্যম হিসেবে বিভিন্ন কল্পিত দেব-দেবীদের অস্তিত্ব টেনে আনত। তাদের বিশ্বাস ছিল, এ সমস্ত মূর্তির সন্তুষ্টি ছাড়া আল্লাহকে পাওয়া সম্ভব নয়। মূর্তির মন জয় করতে তারা কিছু প্রথা চালু করেছিল। তায়েফে পূজার মূর্তির নাম ছিল ‘লাত’। এটা কোন মানব বা দানবাকৃতি ছিল না। এটা ছিল মূলত বিরাট একটি পাথর। এটি চতুর্ভুজের মত ছিল। কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে, এই পাথরটি প্রাকৃতিকভাবে একটি বিশাল চত্বরের মত পড়ে ছিল। অতীতে এক সময় হয়ত এখানে কেউ কোন মূর্তি স্থাপন করেছিল। কিন্তু ইসলামের আবির্ভাব কালে এখানে কোন মূর্তি ছিল না। আশে-পাশের লোকেরা এই চত্বরেরই পূজা করত।
