♣♣♣
পবিত্র ভূমি মক্কা থেকে কয়েক মাইল দূরে অবস্থিত তায়েফ। ৮ম হিজরীর শাওয়াল মোতাবেক ৬৩০ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারীর এক রজনীতে সেখানে রাতের-বিনোদন চলছিল। শরাবের উৎকট গন্ধে বাতাস ভারী ছিল। নাচের জন্য তায়েফের আশ-পাশ হতে সেরা সেরা নর্তকীর আগমন ঘটেছিল। তাদের উলঙ্গদেহের নৃত্য আর রূপের ঝলক আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দকে মাতাল করে দিয়েছিল।
মক্কার উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের দুর্ধর্ষ ‘হাওয়াযিন’ গোত্রের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ ছিল এই বিনোদন অনুষ্ঠানের মেহমান। তায়েফ ও আশ-পাশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্তভাবে অবস্থানরত সাকীফ গোত্রের সর্দার ছিল এ অনুষ্ঠানের আয়োজক। অতিথিবৃন্দের উপর নিজেদের ক্ষমতা, এবং আন্তরিকতার প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্যে তারা এমন আড়ম্বর এবং বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল।
দুই নর্তকী নৃত্য করছিল। উপস্থিত দর্শকবৃন্দ অপলক নেত্রে অবলোকন করছিল। অতিথিগণও তন্ময় হয়ে যায়। সবাই যখন নৃত্য আর সঙ্গীতের সুরে হারিয়ে যায় ঠিক সেই মুহূর্তে স্বাগতিক গোত্রের নেতা মালিক বিন আওফ আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। হাতে মৃদু তালি বাজায়। নীরব হয়ে যায় বাদ্যযন্ত্র। নর্তকীরা মূর্তির মত দাড়িয়ে যায়। তাদের প্রশ্নবোধক দৃষ্টি মালিক বিন আওফের প্রতি নিবদ্ধ হয়। অতিথিবৃন্দের মধ্যেও নিস্তব্ধতা নেমে আসে। সব অনুষ্ঠান মুহুর্তে নীরব নিস্তব্ধ হয়ে যায়। মঞ্চ থেকে গ্যালারী-সর্বত্র পিনপতন নীরবতা। সবার দৃষ্টি মালিক বিন আওফের দিকে। কোনরূপ আহবান কিংবা দৃষ্টি আকর্ষণ করা ছাড়াই সকলেই তার দিকে চেয়ে থাকে।
মালিক বিন আওফের বয়স আনুমানিক ৩০ বছর হবে। নৃত্য এবং শরাবের আসরের সে ছিল মধ্যমণি। কিন্তু রণাঙ্গনে তার রূপ পরিবর্তন হয়ে যায়। তাকে তখন মনে হত এক জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি। তরবারি চালানো, তীর নিক্ষেপ এবং অশ্বারোহণে কেবল সে দক্ষ ছিলনা; বরং সমর বিষয়েও বড় প্রজ্ঞার অধিকারী ছিল। এ সকল গুণের কারণেই সে গোত্রের সেনাপতির আসনে বসে ছিল। যুদ্ধ ছিল তার অত্যন্ত প্রিয়। যুদ্ধের নাম শুনলেই সে ছুটে যেতে চাইত। ঠাণ্ডা মাথায় এ বিষয়ে চিন্তা করার বিলম্ব সহ্য হত না। তার যুদ্ধ চাল শত্রুর জন্য অত্যন্ত ভয়ঙ্কর হত। কুরাইশ গোত্রে এক সময় হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর যে অবস্থান ছিল, ঠিক তেমনি অবস্থান ছিল মালিক বিন আওফের স্বীয় গোত্রে।
‘আমরা প্রচুর গিলেছি।” মালিক বিন আওফ নৃত্য থামিয়ে সকলকে সম্বোধন করে বলে– “আমরা শরাবের পাত্রগুলো শূন্য করে ফেলেছি। আমরা নৃত্যরত যুবতীদের দ্বারা মোহিত হয়েছি। আমাদের সম্মানিত অতিথিবৃন্দ এই আতিথ্য এবং এই বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠান উদযাপনের কারণ অনুধাবন করতে পেরেছেন?… আমি আপনাদেরকে কেবল আনন্দ বিনোদনের জন্য সমবেত করিনি। আপনাদের আত্মমর্যাদাবোধ চাঙ্গা করার জন্য আমি আপনাদেরকে এখানে আমন্ত্রণ জানিয়েছি।”
“হাওয়াযিনের মর্যাদাবোধ ভূলণ্ঠিত হয়ে পড়েছিল কবে মালিক বিন আওফ?” হাওয়াযিন গোত্রের এক নেতা প্রশ্ন করে– “এসব বাদ দিয়ে বল, আমাদের মর্যাদাবোধে কে আঘাত করেছে?”
মালিক বিন আওফ বলে “মুসলমানরা! মুহাম্মাদ এমন কি করেছে… মুহাম্মাদ সম্পর্কে আপনারা কি জানেননা? ঐ মুহাম্মাদের কথা আপনারা ভুলে গেছেন, যে হাতে গোনা কয়েকজন অনুসারী নিয়ে মক্কা থেকে পালিয়ে ইয়াসরিবে (মদীনায়) গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল?”
“জানি, ভাল করেই চিনি তাকে দু’তিন জন বলে ওঠে– “আমরা এটাও জানি যে, সে নিজেকে খোদার নবী বলে দাবী করে।”
“আমরা তাকে নবী হিসেবে মানি না।”একান্ত কেউ নবী হলে সে ছাকীফ গোত্র থেকে হত, হাওয়াযিন গোত্র থেকে হত।”
মালিক বিন আওফ বলে– “সে নবী হোক বা না হোক। আমি আপনাদেরকে এটা জানাতে চাই, যে মক্কা থেকে একদিন মুহাম্মাদ প্রাণ নিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল, বিস্ময়কর হলেও সত্য যে, সে এখন বর্তমান মক্কার শাসক। সমগ্র মক্কায় এখন তার শাসন চলছে। তার সমরশক্তি দিন দিন বেড়েই চলেছে। কুরাইশরা তার সামনে হাতিয়ার সমর্পণ করেছে। প্রায় সকলেই তার ধর্ম মেনে নিচ্ছে। আবু সুফিয়ান ইকরামা এবং সফওয়ানের মত বিখ্যাত যোদ্ধারাও মুহাম্মাদের ধর্ম মেনে নিয়েছে। খালিদ বিন ওলীদ তো বহু আগেই এই নতুন ধর্মমতের অনুসারী হয়ে গেছে।… মুসলমান মক্কা বিজয় করে সমস্ত মূর্তি ভেঙ্গে মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছে।”
“কুরাইশদের যদি আত্মমর্যাদাবোধ এবং স্বীয় ধর্মের প্রতি টান থাকত তাহলে তারা তাড়াহুড়া করে আত্মসমর্পণ না করে, বরং বীর বিক্রমে লড়ে মরত।” আরেকজন মন্তব্য করে।
“এখন তারকা ভরা আকাশ চেয়ে চেয়ে দেখবে যে, হাওয়াযিন এবং ছাকীফ গোত্রের আত্মমর্যাদাবোধ কেমন লৌহবৎ।” মালিক বিন আওফ বলে।
“আমাদের কেউ মুহাম্মাদের জীবন সংহার করুক, এটাই কি তোমার অভিলাষ?” হাওয়াযিন গোত্রের এক নেতার প্রশ্ন– “তোমার বক্তব্যের সারমর্ম যদি এটাই হয় তাহলে এ দায়িত্ব নিঃশংকোচে আমার কাঁধে অর্পণ করতে পার।”
“এখন মুহাম্মাদকে হত্যা করলে কোন লাভ হবে না।” মালিক বিন আওফ বলে– “তাকে হত্যা করলে তার ভক্তরা তাকে নিজেদের হৃদয়ে ধারণ করে রাখবে। তাদের সংখ্যা এত বৃদ্ধি পেয়েছে যে, এখন একজনকে হত্যা করার দ্বারা তারা ঐ পথ ত্যাগ করবে না। যে পথে তাদের নিক্ষেপ করা হয়েছে।”
