ইকরামার বন্ধু জিজ্ঞেস করে– “আর তুমি মুসলমান হয়ে গেলে?”
ইকরামার স্ত্রী বলে– “হ্যাঁ। আমি তখনই মুসলমান হয়ে যাই।… আমাকে তার কাছে নিয়ে চল আমি তাকে ফিরিয়ে আনব।”
ইকরামার বন্ধু বলে– “আমি অবশ্যই বন্ধুর হক আদায় করব। চল, আমি তোমার সাথে ইয়ামানে যাচ্ছি।”
অনেক দিন পর ইকরামা স্ত্রীর সাথে পবিত্র মক্কায় প্রবেশ করে। নিজের বাড়িতে যাওয়ার আগে প্রথমে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খেদমতে হাজির হয়। বিগত দিনের যাবতীয় অপরাধের নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে ইসলাম কবুল করে।
ঠিক ঐ দিন সফওয়ানও এসে হাজির হয়। সে পালিয়ে জেদ্দা পারি জমিয়েছিল। তার এক বন্ধু তার কাছে যায় এবং বুঝায় যে, সে একজন বিখ্যাত সেনাপতি। তার মর্যাদা সম্পর্কে অবশ্যই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবগত। তাকে আরো জানানো হয় যে, কুরাইশদের অবস্থান এখন আগের মত নেই। পরিস্থিতি পাল্টে গেছে।… সফওয়ান যুদ্ধপ্রিয় হলেও খুবই বিচক্ষণ ছিল। সে তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে বন্ধুর সাথে মক্কায় ফিরে এসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে গিয়ে ইসলাম কবুল করে।
হযরত আবু সুফিয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর স্ত্রী হিন্দা ইসলাম কবুল করবে এ কল্পনা কারো ছিল না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার হত্যার হুকুম বলবৎ রেখেছিলেন। সে পলাতক ছিল। হযরত আবু সুফিয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহু এর আগেই ইসলাম কবুল করেছিলেন। হিন্দা পলাতক থাকা অবস্থায়ই জানতে পারে যে, হযরত ইকরামা রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং সফওয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহু ইসলাম কবুল করেছেন, এরপর সে জনসম্মুখে উপস্থিত হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে পেলে নিশ্চিত কতল করে ফেলবেন– একথা জেনেও সে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকেও মাফ করে দেন। অতঃপর সে ইসলাম কবুল করে।
মক্কার আশে-পাশে এবং দুরে-কাছে কিছু গোত্রের বসবাস ছিল। তাদের অনেকেই ছিল মূর্তিপূজক আর অনেকই ছিল নাস্তিক। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে সত্য ধর্মের স্বীকৃতি দিতে আহবান জানান। সৈন্যরা এ সমস্ত আহবান বয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু তাদেরকে কোন প্রকার হামলা না করা এবং যুদ্ধ-বিগ্রহ এড়িয়ে চলতে নির্দেশ দেয়া হয়।
মক্কার দক্ষিণে ছিল তিহামা অঞ্চল। এখানকার বাসিন্দারা অধিকাংশই ছিল দুর্ধর্ষ। তারা একত্রে বসবাস না করে বিক্ষিপ্তভাবে বাসস্থান গড়ে তুলেছিল। তাদের ব্যাপারে এ আশঙ্কা ছিল যে, তারা হয়ত মোকাবিলা করতে আসবে। এ কারণে সে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় একটি বাহিনী প্রেরণ করা হয়। তার কমান্ডার নিযুক্ত করা হয় মহাবীর হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে। সৈন্যরা সকলেই ছিল অশ্বারোহী। মক্কা থেকে প্রায় ৫০ মাইল দূরে ইয়ালামলাম পাহাড় পর্যন্ত ছিল হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সফর।
খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর বাহিনী প্রস্তুত। রওনা হয়ে যায় খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর বাহিনী। ৫০ মাইল দূরে ছিল তাদের গন্তব্য। কিন্তু ১৫ মাইল যেতে না যেতেই আরেকটি দুর্ধর্ষ গোত্র বনু যাজিমা তাদের গতিরোধ করে। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু সৈন্যদেরকে যুদ্ধের জন্য বিন্যস্ত করেন। বনূ যাজিমা পুরো যোদ্ধার বেশে ময়দানে নেমে আসে।
“আমরা যুদ্ধ করতে আসিনি।” হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ঘোষণা করেন– “ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দিতে এসেছি আমরা।”
“ইতোপবেই আমরা ইসলাম গ্রহণ করেছি।” বনু যাজিমার পক্ষ থেকে জবাব দেয়া হয়– “আমরা নামাযও পড়ি।”
“আমরা প্রতারণার ফাঁদে পা দিতে আসিনি।” হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলিষ্ঠ কণ্ঠে বলেন– “বাস্তবেই তোমরা মুসলমান হয়ে থাকলে হাতিয়ার ফেলে দাও।”
‘বনু যাজিমা! সাবধান!” বনু যাজিমার পক্ষ থেকে কার গর্জন শোনা যায়, “তাকে আমি চিনি। সে মক্কার ওলীদের পুত্র খালিদ। তার উপর আস্থা রাখা যায় না। হাতিয়ার সমর্পণ করলে সে আমাদের কতল করবে।… অস্ত্র সমর্পণ করবে না।”
‘আল্লাহর কসম! আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর তরফ থেকে যুদ্ধ না করার নির্দেশ না থাকলে দেখতাম, তোমরা অস্ত্র সমর্পণ কর কি না।” হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “আমরা বন্ধু হয়ে এসেছি। আল্লাহর দ্বীন জোর করে চাপিয়ে দিতে আসিনি। আমাদের বন্ধু মনে কর এবং আমাদের সাথে এসে হাত মিলাও।”
কুরাইশদের সংবাদ কী?” বনু যাজিমার তরফ থেকে জানতে চাওয়া হয়।
“মক্কা গিয়ে দেখবে।” হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন– “আবু সুফিয়ান, ইকরামা এবং সফওয়ান ইসলাম গ্রহণ করেছেন।”
বনু যাজিমা হাতিয়ার সমর্পণ করে। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু অশ্বথেকে নেমে আসেন এবং বনু যাজিমার সর্দারের সাথে আলিঙ্গন করেন। গোত্রের সবাই ইসলামের ছায়াতলে চলে আসে।
মুসলমানদের জন্য মক্কা কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে পরিণত হয়। দৃষ্টান্ত অনেকটা ঐ সূর্যের ন্যায় যার কিরণ দূর-দিগন্তব্যাপী বিকশিত হতে থাকে। তবে পার্থক্য হলো, সূর্যের বিপক্ষে কেউ অবস্থান নেয় না। কিন্তু ইসলামের উত্থানের বিরুদ্ধে শত্রুরা সংগঠিত ও ঐক্যবদ্ধ হচ্ছিল।
