হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু মূর্তির দিকে এগিয়ে যেতে থাকলে সম্পূর্ণ বিবস্ত্র এক সুন্দরী যুবতী তার সামনে এসে দাঁড়ায়। বিবস্ত্র নারীটি কাঁদতে থাকে এবং মূর্তি না ভাঙ্গার জন্য অনুনয়-বিনয় করে। ঐতিহাসিকের মতে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে লক্ষ্যচ্যুত করতে এ নারীটি উলঙ্গ হয়ে আসে এবং তার ক্রন্দনের একমাত্র কারণ ছিল, হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর আবেগে ভাটা সৃষ্টি করা। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু উলঙ্গ নারীর প্রতি দৃষ্টি না দিয়ে মূর্তির উদ্দেশে এগিয়ে যান। কিন্তু হতভাগ্য নারী দু’হাত ডানে-বামে প্রসারিত করে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর পথ রোধ করতে থাকে। বাধ্য হয়ে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু খাপ থেকে তলোয়ার বের করেন এবং ঐ নারীর উপর এমন জোরে আঘাত করেন যে, এক আঘাতেই তার নগ্ন দেহ দু’টুকরো হয়ে দুদিকে ছিটকে পড়ে। এরপর তিনি ক্রোধে ফেটে পড়ে মূর্তির কাছে যান এবং আঘাতে আঘাতে তাকে কয়েক টুকরো করে দেন। শক্তি এবং কল্যাণের দেবী নিজেকে একজন মানুষ থেকে বাঁচাতে পারে না।
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু মন্দির থেকে বেরিয়ে দ্রুত ঘোড়া ছুটিয়ে দেন। তার সাথিরাও পেছনে পেছনে আসতে থাকে। মক্কায় পৌঁছে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খেদমতে হাজির হন।
হযরত খালিদ বলেন–“আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। “আমি উযযা মূর্তি গুড়িয়ে এসেছি।”
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন–“হ্যাঁ খালিদ। এবার তুমি উযযার আসল মূর্তি ভেঙ্গেছ। এই অঞ্চলে আর কোনদিন মূর্তিপূজার চর্চা হবে না।”
♣♣♣
কুরাইশদের হার না-মানা সেনাপতি ইকরামা মক্কার পথে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এর সাথে শেষ যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে আত্মগোপন করেছিল। সে এবং সফওয়ান কুরাইশ সরদারের নির্দেশ অমান্য করেছিল। ইকরামা তার ভবিষ্যৎ খুবই অন্ধকার দেখে সে ভাল করেই জানত যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সদ্য অপরাধ আদৌ ক্ষমা করবেন না। কারণ, সে মুসলিম বাহিনীর এক অংশের উপর হামলা করে তাদের দু’জন সৈন্যকে শহীদ করে দিয়েছে। ইকরামা আত্মগোপন করলেও তার স্ত্রী ছিল মক্কায়।
ইতিহাসে লেখা আছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা বিজয়ের পর চারজন মহিলা এবং ছয়জন পুরুষের হত্যার ঘোষণা দেন। তারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন চক্রান্ত করেছিল। এই টপটেনের মধ্যে হিন্দা ও ইকরামা ছিল শীর্ষে। হিন্দার অপরাধ ছিল কল্পনারও বাইরে। কেউ মুসলমান হলেই সে তার রক্ত পান করতে উদগ্রীব হয়ে পড়ত।
ইকরামার স্ত্রী মক্কায় ছিল। মক্কা বিজয়ের দু’তিন দিন পর এক ব্যক্তি ইকরামার গৃহে আসে।
“বোন” আমি তোমার জন্য আগন্তুক। লোকটি ইকরামার স্ত্রীকে বলে– “ইকরামা আমার বন্ধু। আমি বনু বকর গোত্রের মানুষ।… তোমার জানা আছে যে, ইকরামা এবং সফওয়ান মুসলমানদের প্রতিরোধ করতে চেয়েছিল। কিন্তু তাদের সাহায্যকারী ছিল অতি নগণ্য। ঘটনাক্রমে তাদের মোকাবিলা হয় প্রখ্যাত সমর বিশারদ খালিদের সাথে। আর তার বাহিনীর সংখ্যাও ছিল অনেক।”
ইকরামার স্ত্রী বলে– “সবই আমি জানি। সবই আমার কানে এসেছে।… আমার অপরিচিত ভাই! বলো, সে এখন কোথায় আছে? সে জিন্দা আছে তো?
আগন্তুক বলে– “ইয়ামান যাচ্ছে বলে সে আমাকে জানিয়েছিল। সে যেখানেই যাক সেখানেই তোমাকে ডেকে নিবে। সে কার নিকট গেছে তাও আমি জানি। আমি তোমাকে এতটুকু জানাতে এসেছি যে, সে আর মক্কায় ফিরে আসবে না।”
“এখানে না আসাই তার জন্য মঙ্গলজনক” ইকরামার স্ত্রী বলে– সে এলেই সঙ্গে সঙ্গে তাকে হত্যা করা হবে।”
“তুমি তৈরী থাকো।” আগন্তুক বলে– তার সংবাদ এলেই আমি তোমাকে তার কাছে পাঠিয়ে দিব। তুমি তার নিকট গিয়ে পৌঁছলে সে তোমাকে সাথে নিয়ে হাবশায় চলে যাবে।”
আগন্তুক নিজের নাম ও এলাকার পরিচয় দিয়ে চলে যায়।
দু’দিন পর ইকরামার স্ত্রী পূর্ব নির্দেশনা অনুযায়ী বনু বকরের এলাকায় যায় এবং ঐ ব্যক্তির সাথে সাক্ষাৎ করে, যে তাকে ইকরামার সংবাদ জানিয়েছিল।
“তুমি ইকরামার কাছে যেতে এসেছো?” ইকরামার বন্ধু জানতে চায়। ইকরামার স্ত্রী বলে– “আমি তাকে ফিরিয়ে আনতে যাচ্ছি।”
তুমি কি ভুলে গেছ যে, সে এলেই তাকে কতল করা হবে?” লোকটি অবাক হয় এবং বিস্ময়ের সাথে জানতে চায়।
“তাকে কতল করা হবে না।” ইকরামার স্ত্রী বলে– “আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার আবেদনের প্রেক্ষিতে আমার স্বামীকে মাফ করে দিয়েছেন।”
“তুমি মুহাম্মাদকে আল্লাহর রাসূল বলে মেনে নিলে?” লোকটি বিস্ফোরিত নেত্রে জিজ্ঞাসা করে।
ইকরামার স্ত্রী নিঃসঙ্কোচে জবাব দেয় “হ্যাঁ, মেনে নিয়েছি।”
হযরত মুহাম্মাদের সাথে তোমার কোন চুক্তি হয়েছে।” ইকরামার বন্ধু বলে, “হয়ত সে তোমার সামনে এই শর্ত দিয়েছে যে, তুমি আর ইকরামা ইসলাম কবুল করলে…।”
“না।” ইকরামার স্ত্রী তার কথা নাকচ করে বলে– “মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল। তার সাথে আমার এমন কোন চুক্তি হয়নি। আর তিনি তাদের মত নন, যারা চুক্তি করে বশ্যতা মেনে নিতে বাধ্য করেন। আমি স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে তার কাছে আমার স্বামীর দণ্ডাদেশ মওকুফের আবেদন নিয়ে গিয়েছিলাম। মুহাম্মাদ ছিল আমার খুব পরিচিত। কিন্তু এখন তাকে দেখার পর আমার মন বলে তিনি সেই মুহাম্মাদ নন, যিনি একদিন আমাদেরই লোক ছিলেন। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আমি ফরিয়াদ নিয়ে যাওয়ার পর তার চোখে আমি এমন দ্যুতি দেখেছি, যা সাধারণত কারো মধ্যে দেখা যায় না। আমার ভয় ছিল, মুহাম্মাদ হয়ত বলবে, ইকরামার স্ত্রীকে জামানত হিসেবে আটকে রাখ। স্ত্রীর মায়ায় হয়ত ইকরামা ফিরে আসবে অন্যথায় একদিন তাকেই কতল করা হবে। কিন্তু মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে এক অসহায় নারী মনে করে অত্যন্ত সম্মানজনক আচরণ করেন। আমি নিবেদন করি, আমার সন্তানদের ইয়াতিম করবেন না, আমার স্বামীর অন্যায় আচরণের শাস্তি আমাকে এবং আমার সন্তানদের দিবেন না। জবাবে তিনি বলেন, আমি ইকরামাকে ক্ষমা করে দিলাম।… আমি আনন্দের আতিশয্যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হস্ত মোবারকে চুমো খাই। আমি বলতে পারি না, কোন সে অদৃশ্য শক্তি ছিল যা আমাকে এ কথা বলায় যে, “আমি অন্তঃকরণ থেকে স্বীকার করছি যে, মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল। আমি ঐ আল্লাহকে এক বলে স্বীকৃতি দিলাম যিনি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে রেসালাত দান করেছেন।”
