সুলতান আইউবীর নির্দেশে আগেই একটি দুর্ধর্ষ কমাণ্ডে বাহিনী গঠন করে রাখা হয়েছিলো। দীর্ঘদিন যাবত প্রশিক্ষণ দিয়ে অভিজ্ঞরূপে গড়ে তোলা হয়েছে । তাদের। একটি সুইসাইড স্কোয়াডও আছে তাদের সঙ্গে। ঈমানদীপ্ত এই স্কোয়াড এততাই চেতনা-সমৃদ্ধ যে, কোন অভিযান থেকে জীবিত ফিরে না আসতে পারাকে তারা গৌরবের বিষয় মনে করে।
নায়েব সালার আন-নাসের ও আলী:বিন সুফিয়ানের পরামর্শে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, যে স্থানে পুরোহিত বাস করেন এবং মেয়ে বলী হয়, সেই দুর্গম পাহাড়ী এলাকায় মাত্র বারজন কমাণ্ডো সেনা ঢুকে পড়বে। হাবশীর দেয়া তথ্য মোতাবেক বলীর রাতে মেলা বেশ জমে ওঠে। কারণ, এটি মেলার শেষ দিন। গোত্রের লোকদের ছাড়া মেয়ে বলির ঘটনা আর কেউ জানে না। জানলেও এই বলি কোথায় হয়, বলতে পারে না কেউ।
এসব তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়া হলো, পাঁচশত মিসরী সৈন্য অস্ত্র-সজ্জিত হয়ে দর্শক হিসেবে এদিন মেলায় ঢুকে পড়বে। তাদের দুশ জনের কাছে থাকবে তীর-ধনুক। সে যুগে সঙ্গে এসব অস্ত্র রাখা ছিলো স্বাভাবিক ব্যাপার। এসবের উপর কোন পাবন্দি ছিলো না। কমান্ডো সদস্যদের বলির স্থানটি স্পষ্টরূপে চিহ্নিত করে দেয়া হবে। তারা সরাসরি আক্রমণ করবে না। তারা কমাণ্ডো স্টাইলে পাহাড়ে ঢুকে পড়বে। অতর্কিতে প্রহরীদের হত্যা করে পৌঁছে যাবে আসল জায়গায়। মেয়েটিকে যখন বলির জন্য বেদীতে নিয়ে আসা হবে, হামলা করবে তখন। অন্যথায় তারা আক্রান্ত হয়ে মেয়েটিকে পাতাল কক্ষে গুম কিংবা খুন করে ফেলতে পারে।
তথ্য পাওয়া গেছে, মধ্য রাতের পূর্ণ চন্দ্রালোকে বলীপর্ব সম্পন্ন করা হয়। পাঁচশত সিপাহীকে এ সময়ের পূর্বে বলীর স্থান সংলগ্ন পাহাড়ের আশে-পাশে পৌঁছে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। তাদের জানিয়ে দেয়া হয়, কমাণ্ডো সেনারা যদি প্রতিপক্ষের ঘেরাওয়ে পড়ে যায় কিংবা অভিযান ব্যর্থ হয়ে পড়ে, তাহলে তারা একটি সলিতাওয়ালা অগ্নিতীর উপর দিকে নিক্ষেপ করবে। এ তীরের শিখা দেখে তারা হামলা চালাবে।
নির্বাচন করে নেয়া হয় চারজন জানবাজ। দু বছর আগে নুরুদ্দীন জঙ্গী সুলতান আইউবীর সাহাযার্থে যে বাহিনী প্রেরণ করেছিলেন, তাদের থেকে নেয়া হয় বাছা বাছা পাঁচশত সৈন্য। এরা এসেছিলো আরব থেকে। এদের উপর মিসর ও সুদানের রাজনীতি এবং তাদের ভ্রান্ত আকীদা-বিশ্বাসের কোন প্রভাব ছিলো না। ইসলাম পরিপন্থী আকীদার বিরুদ্ধে ছিলো তারা উচ্চকণ্ঠ। কুসংস্কার নির্মূলে ছিলো তারা বদ্ধপরিকর। তাদেরকে ধারণা দেয়া হয়, তারা এক ভ্রান্ত বিশ্বাসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে যাচ্ছে এবং নিজেদের তুলনায় অধিক সৈন্যের মোকাবেলা করতে হতে পারে। লড়াই হতে পারে রক্তক্ষয়ী। আবার এমনও হতে পারে যে, তাদের সামনে দাঁড়াতেই পারবে না কেউ, যুদ্ধ ছাড়াই অভিযান সফল হয়ে যাবে। তাদেরকে পরিকল্পনা বুঝিয়ে দেয়া হয়। সেখানকার পরিবেশ-পরিস্থিতি সম্পর্কে সম্যক ধারণা দেয়া হয়। পাহাড়ে আরোহণ, মরুভূমিতে দৌড়ানো এবং উটের মত দীর্ঘ সময় পিপাসায় অতিবাহিত করেও অকাতর লড়াই চালিয়ে যাওয়ার প্রশিক্ষণ আছে তাদের পূর্ব থেকেই।
বলীর রাত আসতে আর ছয় দিন বাকী। কমাণ্ডো বাহিনী ও পাঁচশত সৈন্যকে মহড়া দেয়া হয় তিনদিন তিনরত। চতুর্থ দিন কমান্ডোদের উটে চড়িয়ে রওনা করানো হয়। উটের মধ্যম গতিতে গন্তব্যে পৌঁছতে সময় লাগবে একদিন একরাত। উট চালকদের নির্দেশ দেয়া হয়, তারা কমাণ্ডোদের পাহাড়ী অঞ্চল থেকে দূরে কোথাও নামিয়ে দিয়ে ফিরে আসবে।
পাঁচশত সৈন্যের বাহিনীটি মেলার দর্শক বেশে দুজন দুজন চারজন চারজন করে লরি ও উটে চড়ে মেলার দিকে রওনা হয়। তাদের কমাণ্ডারও একই বেশে তাদের সঙ্গে রওনা হয়েছে। তাদের পশুগুলো থাকবে তাদের সঙ্গে।
***
মেলার শেষ রাত।
আকাশের ঝলমলে চাঁদ পূর্ণতা লাভ করতে আর অল্প বাকি। স্বচ্ছ কাঁচের মত পরিষ্কার মরুর পরিবেশ। মেলায় বিপুল দর্শকের ভীড়। পিনপতনের স্থান নেই যেন কোথাও। একধারে অর্ধনগ্ন মেয়েরা নাচছে-গাইছে। সুন্দরী মেয়েদের দেদারছে বেচা-কেনা চলছে এক জায়গায়। বেশী ভীড় সেখানেই। একটি মঞ্চ পাতা আছে সেখানে। একটি করে মেয়ে আনা হয় মঞ্চে। চারদিক থেকে খুটিয়ে। খুটিয়ে দেখে ক্রেতা। মুখ হা করিয়ে দাঁত দেখে। নেড়ে চেড়ে দেখে মাথার চুল। দেহের কোমলতা-কঠোরতাও পরখ করা হয়। তারপর শুরু হয় দর-দাম নিয়ে আলোচনা। অবশেষে বেচা-কেনা। জুয়ার আসরও আছে মেলায়। আছে মদের, আড়া। মেলার চার ধারে বহিরাগত দর্শকদের থাকার আয়োজন।
উৎসবে যোগদানকারী লোকদের ধর্ম ও চরিত্রের কোন বালাই নেই। আদর্শিক অনুশাসন থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত তারা। মেলাঙ্গন থেকে খানিক দূরের পাহাড়ী অঞ্চলের কোন এক নিভৃত ভূখণ্ডে যে সুন্দরী নারী বলির আয়োজন চলছে, তাদের তা অজানা। একজন মানুষ যে সেখানে দেবতা হয়ে বসে আছে, তাও তারা জানে না। তারা শুধু এতটুকুই জানে, পাহাড়-বেষ্টিত এ এলাকাটি তাদের দেবতাদের আবাস। জিন-ভূত পাহারা দেয় তাদের। সেখানে যাওয়ার কল্পনাও করতে পারে না কোন মানুষ।
তাদের এ-ও জানা নেই যে, আল্লাহ্র পাঁচশত সৈনিক তাদের মাঝে ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং বারজন রক্ত-মাংসের মানুষ তাদের দেবতাদের রাজত্বের সীমানায় ঢুকে পড়েছে। পাহাড়ের অভ্যন্তরে কিভাবে প্রবেশ করতে হবে, সালাহুদ্দীন আইউবীর চার জানবাজকে আগেই তা বলে দেয়া হয়েছিলো। কঠোর পাহারার কারণে তারা সে পথে ঢুকতে পারেনি। অন্য এক দুর্গম পথ দিয়ে ঢুকতে হয়েছে তাদের। তাদের বলা হয়েছিলো, পাহাড়ের আশেপাশে কোন মানুষ থাকবে না। কিন্তু এসে তারা দেখতে পায়, মানুষ আছে। তার মানে ধৃত হাবশীর দেয়া তথ্য ভুল । পাহাড়টি দৈর্ঘ্য-প্রস্থে এক বর্গমাইলের বেশী নয়। অতি সাবধানে বিক্ষিপ্তভাবে এগিয়ে যায় তারা।
