গোত্রের কেউ গুরুতর অপরাধ করলে তাকে পুরোহিতের হাতে তুলে দেয়া হয়। পুরোহিত তাকে জীবন্ত ঝিলে নিক্ষেপ করেন। কুমীররা অপরাধীকে খেয়ে ফেলে।
সেই প্রাসাদেই বাস করেন পুরোহিত। প্রাসাদের এক স্থানে পাথর-নির্মিত বৃহদাকার একটি মুখ ও মাথা আছে। এর-ই অভ্যন্তরে বাস করেন দেবতা। প্রতি পনের বছরের শেষ দিনগুলিতে বাইরে থেকে একটি মেয়ে অপহরণ করে এনে তুলে দেয়া হয় পুরোহিতের হাতে। পুরোহিত মেয়েটিকে একটি ফুল শোকান। সেই ফুলের সৌরভে বিমোহিত হয়ে মেয়েটি ভুলে যায় সে কে ছিলো, কোথা থেকে এসেছে এবং তাকে কে এনেছে। ফুলের সাথে এক প্রকার নেশাকর ঘ্রাণ। মিশিয়ে দেয়া হয়, যার প্রভাবে মেয়েটি পুরোহিতকে দেবতা এবং নিজের স্বামী ভাবতে শুরু করে। ওখানকার পুঁতিগন্ধময় বস্তুও তার চোখে আকর্ষণীয় বলে মনে হয়।
পনের বছর পূর্ণ হওয়ার পথে। এই অল্প কদিন পর-ই মেয়েটিকে বলী দেয়া হবে। আমরা নয়জন লোক মিসরের ফৌজে ভর্তি হয়েছিলাম। নির্ভীক এবং জংলী হওয়ার কারণে আমাদেরকে খলীফার নিরাপত্তা কর্মী হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। দুমাস আগে হেরেমের এই মেয়েটি আমাদের চোখে পড়ে। আমরা এমন রূপসী নারী জীবনে কখনো দেখিনি। আমরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি, একেই অপহরণ করে নিয়ে এবার বলীর জন্য পুরোহিতের হাতে তুলে দেবো। আমাদের এক সঙ্গী–যে গতকাল সান্ত্রীর হাতে মারা গেলো এলাকায় গিয়ে গোত্রের মোড়লকে বলে এসেছিলো, এবার বলীর জন্য আমরা মেয়ে এনে দেবো। মেয়েটিকে আমরাই অপহরণ করে নিয়ে গেছি। বললো হাবশী ।
***
রিপোর্ট শুনে ভাবনার সমুদ্রে ডুবে যান সালাহুদ্দীন আইউবী। আলী বিন সুফিয়ান তার নির্দেশের অপেক্ষায় দণ্ডায়মান। সুলতান আইউবী ম্যাপ দেখলেন। বললেন–জায়গা যদি এটি-ই হয়, তাহলে স্থান তো আমাদের নাগালের বাইরে। শহরের প্রবীণ লোকদের নিকট থেকে তুমি যে তথ্য নিয়েছে, তাতে–প্রমাণিত হয়, ফেরআউনের পতনের পর শত শত বছর অতিবাহিত হলেও ফেরআউনী কালচার এখনো বহাল আছে। মুসলমান হিসেবে আমাদের কর্তব্য, বেশী দূরে যেতে না পারলেও এই নিকট প্রতিবেশী সমাজ থেকে অন্তত কুফর-শিরকের অবসান ঘটাতে হবে। কি জানি, এ পর্যন্ত কত বাবা-মায়ের নিষ্পাপ কন্যা ওদের হাতে বলীর শিকার হয়েছে! কত মেয়ে অপহৃতা হয়ে বিক্রি হয়েছে এ মেলায়! দেবতার বিশ্বাসের-ই মূলোৎপাটন করতে হবে। দেবতার নাম ভাঙ্গিয়ে মেয়ে অপহরণ করিয়ে অপকর্ম আর আমোদ-ফুর্তিতে মেতে ওঠে তথাকথিত ধর্মগুরুরা। এই বর্বরতার অবসান ঘটাতে হবে।
গুপ্তচর মারফত আমি জানতে পেরেছি, আমাদের ফৌজের কয়েকজন কমাণ্ডার এবং মিসরের কিছুসংখ্যক ধনাঢ্য ব্যক্তি এ মেলায় অংশ নেয় এবং মেয়ে ক্রয় করে কিংবা নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য মেয়েদের ভাড়া আনে। বরখাস্তকৃত সুদানী সৈন্যদের বিপুল সংখ্যক লোকও এ মেলায় অংশ নিয়ে থাকে। কাজেই আমি মনে করি, আমাদের ফৌজ এবং বেসামরিক লোকদের ও প্রাক্তন সুদানী ফৌজদের সঙ্গে একত্রিত হওয়া ও একত্রে উৎসব করা ঠিক নয়। এ যৌথ বিনোদন জাতির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর প্রমাণিত হতে পারে। আর বলীর শিকার হওয়ার আগে আগেই মেয়েটিকে উদ্ধার করে খলীফার সামনে এজন্যে পেশ করা প্রয়োজন, যাতে প্রমাণিত হয় যে, খলীফা আপনার উপর অপহরণের যে অপবাদ দিয়েছেন, তা কত ভিত্তিহীন। বললেন আলী বিন সুফিয়ান।
আমার এর বিন্দুমাত্র পরোয়া নেই আলী! আমার দৃষ্টি আমার ব্যক্তিসত্ত্বার উপর নয়। আমাকে যে যতো তুচ্ছ-ই ভাবুক, আমি ইসলামের মর্যাদা ও সমুন্নতির কথা ভুলতে পারি না। আমি নিজে কি আর ছাই! কথাটা তুমি মনে রেখো আলী! নিজের ব্যক্তিসত্ত্বা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে সালতানাতের কর্তৃত্ব রক্ষা, দেশের উন্নতি ও ইসলামের প্রসার-প্রতিষ্ঠার কাজে নিজেকে কোরবান করে দাও। ইসলামের মর্যাদা রক্ষা করার দায়িত্ব ছিলো খলীফার । কিন্তু কালক্রমে খলীফা এখন হয়ে পড়েছেন আত্মকেন্দ্রিক, প্রবৃত্তির দাস। আজ আমাদের খেলাফত ফোলা ও দুর্বল। আমাদের এই দুর্বলতাকে কাজে লাগাচ্ছে খৃষ্টানরা। সফলতার সঙ্গে যদি তুমি নিজের কর্তব্য পালন করতে চাও, তাহলে আত্মকেন্দ্রীকতা পরিহার করে চলতে হবে। খলীফা আমার প্রতি যে অপবাদ আরোপ করেছেন, বড় কষ্টে আমি তা বরদাশত করেছি। ইচ্ছে করলে আমি এর উপযুক্ত জবাব দিতে পারতাম। কিন্তু তখন আমি ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়তাম। আমার তো আশঙ্কা হচ্ছে, কদিন পর আমার আশ-পাশের লোকেরাই ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতি, আত্মপ্রিয়তা ও ক্ষমতার মোহে আচ্ছন্ন হয়ে পড়বে। বললেন সুলতান আইউবী।
গোস্তাখীর জন্য ক্ষমা চাই, মোহতারাম আমীর! বলী হওয়ার আগেই যদি আপনি মেয়েটিকে উদ্ধার করাতে চান, তাহলে আদেশ করুন। সময় বেশী নেই। পরশু থেকে মেলা শুরু হচ্ছে। বললেন আলী বিন সুফিয়ান।
সেনাবাহিনীতে ফরমান জারি করে দিন, এ মেলায় কারো অংশ নেয়ার অনুমতি নেই। বলেই নায়েব সালারকে ডেকে সুলতান বললেন–এ নির্দেশ যে অমান্য করবে, পদমর্যাদা যা-ই হোক, তাকে জনসমক্ষে পঞ্চাশ বেত্রাঘাত করা, হবে। এক্ষুনি এ নির্দেশ সেনাবাহিনীকে জানিয়ে দিন।
পরিকল্পনা শুরু হয়ে যায়। সুলতান আইউবী সংশ্লিষ্ট অফিসারদের ডেকে পাঠান। ঘোষণা দেন, এই জঘন্য কুসংস্কারের আড্ডা আমাদের ভাজতে হবে। স্থানটি ফেরআউনী কালচারের শেষ নিদর্শন বলে মনে হয়। সরাসরি সেনা অভিযানের প্রস্তাব আসে। কিন্তু সে প্রস্তাব এই বলে প্রত্যাখ্যান করা হয় যে, একে গোত্রের মানুষ সরাসরি আক্রমণ মনে করবে। সংঘর্ষ বাধবে। মেলায় অংশ নেয়া নিরীহ মানুষ ও নারী-শিশু মারা যাবে। স্বীকারোক্তি প্রদানকারী সুদানী হাবশীকে রাহবার হিসেবে সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার এবং যে স্থানে মেয়ে বলী দেয়া হয়, সেখানে অতর্কিতে কমাণ্ডে আক্রমণ পরিচালনার প্রস্তাব আসে। সুলতান আইউবী হাবশীকে নিয়ে যাওয়া ভালো মনে করলেন না। তিনি তাকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না।
