হঠাৎ একটি গাছের তলায় স্পন্দনশীল একটি ছায়ামূর্তি চোখে পড়ে এক কমাণ্ডোর। সঙ্গে সঙ্গে হাটু গেড়ে বসে পড়ে সে। অতি সন্তর্পণে হামাগুড়ি দিয়ে পিছনে চলে যায় ছায়াটির। নিকটে গিয়েই ঝাঁপিয়ে পড়ে তার উপর। দু বাহু দ্বারা ঘাড় ঝাঁপটে খঞ্জরের আগা ঠেকিয়ে ধরে তার বুকে। জিজ্ঞেস করে, বল্ল, এখানে কি করছিস্ তুই? আর কে আছে তোর সাথে?
ছায়া মূর্তিটি একজন হাবশী লোক। কমাণ্ডো কথা বলছে আরবীতে। হাবশী আরবী বুঝে না। এমন সময়ে এসে পড়ে আরেক কমাণ্ডো। সে-ও খঞ্জর তাক করে ধরে হাবশীর বুকে। ইংগিতে প্রশ্ন করে তারা হাবশীকে। হাবশীও ইংগিতে জবাব দেয়। তার জবাবে সন্দেহ হয়, এখানে কঠোর পাহারা আছে। দুই কমাণ্ডো ধমনি কেটে দেয় হাবশীর। মাটিতে পড়ে যায় সে। আরো সতর্কতার সাথে সম্মুখে এগিয়ে চলে তারা। গহীন জঙ্গল। সামনে একটি পাহাড়। চাঁদ উঠে এসেছে আরো উপরে। ঘন পাহাড়ের ভেতরটা গাছ-গাছালিতে ঘোর অন্ধকার। তারা পাহাড় বেয়ে উপরে উঠতে শুরু করে।
পাহাড়ের অভ্যন্তরে–যেস্থানে মেয়েটিকে পুরোহিতের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে–চলছে আরেক তৎপরতা। পাথরের মুখের সামনে চবুতরায় একটি জাজিম বিছানো। তার উপর বিশাল এক কৃপাণ । নিকটে-ই বড় একটি পেয়ালা। জাজিমে ছড়িয়ে আছে কতগুলো ফুল। পার্শ্বে একস্থানে আগুন জ্বলছে। চবুতরার চারদিকে জ্বলছে কতগুলো প্রদীপ। ঘোরাফেরা করছে চারটি মেয়ে। পরণে তাদের দুটি করে গাছের চওড়া পাতা। বাকি শরীর নগ্ন। আছে চারজন হাবশী। কাঁধ থেকে পায়ের গোড়ালী পর্যন্ত তাদের সাদা চাদর দিয়ে আবৃত।
উম্মে আরারা পাতাল কক্ষে পুরাহিতের সঙ্গে উপবিষ্ট। তার এলোচুলে বিলি কেটে খেলছেন পুরোহিত। মেয়েটি আচ্ছন্ন কণ্ঠে বলছে–আমি আংগুকের মা। তুমি আংগুকের পিতা। আমার সন্তানরা মিসর ও সুদানের রাজা হবে। তাদেরকে আমার রক্ত পান করিয়ে দাও। আমার লম্বা লম্বা সোনালী চুলগুলো তাদের ঘরে রেখে দাও। তুমি আমার থেকে দূরে সরে গেলে কেন? এসো, আমার কাছে এসো।
পুরোহিত তেলের মত একটি পদার্থ মালিশ করতে শুরু করে উম্মে আরারার গায়ে।
আংগুক এ গোত্রটির নাম। মদের নেশা একটি আরব মেয়েকে এই গোত্রের মা বানিয়ে দিয়েছে। বলীর জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে সে। পুরোহিত সম্পন্ন করছে তার নিয়ম-নীতির শেষ পর্ব।
পদে পদে হোঁচট-ধাক্কা খেতে খেতে চড়াই বেয়ে উপরে উঠছে বারজন কমাণ্ডো সৈন্য। দুর্গম পথ অতিক্রম করতে হচ্ছে তাদের। পাহাড়ের বেশীর ভাগ ঝোঁপ-ঝাড়, কাঁটাল। আকাশের পূর্ণ চাঁদ এখন মাথার উপর। আস্তে আস্তে গাছ-গাছালির ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলোকরশ্মি চোখে পড়তে শুরু করে। সেই কিরণে তারা একস্থানে একজন হাবশীকে দাঁড়িয়ে আছে দেখতে পায়। তার এক–হাতে একটি বর্শা। অপর হাতে ঢলি। লোকটি দেব-জগতের পাহারাদার। নীরবে মেরে ফেলতে হবে তাকেও। কিন্তু লোকটি যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে পিছন দিক থেকে হামলা করার সুযোগ নেই। সামনাসামনি মোকাবেলা করাও ঠিক হবে না। তাই ঝোঁপের মধ্যে নীরবে বসে পড়ে এক কমাণ্ডো। লোকটির ঠিক সম্মুখে একটি পাথর ছুঁড়ে মারে আরেকজন। চমকে ওঠে হাবশী। পাথরটি কোত্থেকে আসলো দেখার জন্য এগিয়ে আসে এদিকে। ঝোঁপের মধ্যে লুকিয়ে থাকা কমাণ্ডোর ঠিক সামনে এসে পৌঁছামাত্র ঘাড়টা তার এসে পড়ে কমাণ্ডোর দু বাহুর মাঝে। সঙ্গে সঙ্গে একটি খঞ্জর বিদ্ধ হয় তার বুকে। প্রহরীকে খুন করে বারজনের কমাণ্ডো বাহিনী খানিকটা বিলম্ব করে সেখানে। পরক্ষণেই এগিয়ে যায় অতি সাবধানে। পা টিপে টিপে অগ্রসর হয় সামনের দিকে।
বলীর জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে উম্মে আরারা। তাকে শেষবারের মত বুকে জড়িয়ে ধরেন পুরোহিত। হাতে ধরে সিঁড়ি বেয়ে হাঁটা দেন তিনি। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা চার হাবশী পুরুষ ও মেয়েরা পাথরের মুখ ও মস্তকে আলোর ঝলক দেখতে পায়। মুখের সামনে সেজদায় লুটিয়ে পড়ে তারা। মুখে কি এক মন্ত্র পাঠ করতে করতে পাথরের মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসেন পুরোহিত। উম্মে আরারা তার সঙ্গে।
উম্মে আরারাকে জাজিমের উপর নিয়ে যান পুরোহিত। হাবশী পুরুষ ও মেয়েরা দাঁড়িয়ে আছে তার চারদিকে। উম্মে আরারা আরবীতে বলে–আমি আংগুকের ছেলে ও মেয়েদের জন্য গলা কাটাচ্ছি। আমি তাদের পাপের প্রায়শ্চিত্ত্ব করছি। আর বিলম্ব না করে এবার আমার গলা কেটে দাও। আমার মাথাটা রেখে দাও আঙ্গুকের দেবতার পায়ে। এই মাথার উপর মিসর ও সুদানের মুকুট রাখবেন দেবতা।
চার হাবশী পুরুষ ও মেয়েরা সেজদায় লুটিয়ে পড়ে পুনর্বার। উম্মে আরারাকে জাজিমের উপর আসন গেড়ে বসিয়ে মাথাটা নত করে দেন পুরোহিত। ঘাড় বরাবর সুতীক্ষ্ম ধারাল কৃপাণ উত্তোলন করেন তিনি।
সকলের সামনে হাঁটছে যে কমাণ্ডো, থেমে যায় সে। হাতের ইশারায় থামতে বলে পিছনের সঙ্গীদের। পাহাড়ের চূড়া থেকে চবুতরা ও পাথরের মাথা দেখতে পায় তারা। চবুতরার উপরে নতমুখে আসন গেড়ে বসে আছে একটি মেয়ে। ধবধবে জোৎস্নালোক। বেশ কটি প্রদীপ ও বড় বড় মশালের আলোয় দিবালোকের ন্যায় উজ্জ্বল করে রেখেছে স্থানটা। মেয়েটির কাছে দণ্ডায়মান লোকটির হাতে কৃপাণ। মেয়েটি সম্পূর্ণ উলঙ্গ। তার দেহের রং-ই বলছে, সে হাবশীদের গোত্রের মেয়ে নয়।
