দেবতা কখন আসবেন? জিজ্ঞেস করে উম্মে আরারা।
এখনো তুমি তাকে চিনতে পারোনি? তোমার সামনে কে দাঁড়িয়ে আছেন? বললেন পুরোহিত।
পুরোহিতের পায়ে লুটিয়ে পড়ে উম্মে আরারা। বলে, হ্যাঁ, এবার আমি দেবতাকে চিনতে পেরেছি। তুমি কি সে নও, যাকে আমি উপরে দেখেছিলাম? আমাকে তুমি কবুল করেছো?
হ্যাঁ, আজ থেকে তুমি আমার দুলহান। বললেন পুরোহিত।
***
আমি আপনাকে আর কিছু জানাতে পারছি না। আমার আব্বা আমাকে বলেছিলেন, পুরোহিত মেয়েটিকে একটি ফুল শোকান, যার সৌরভ তাকে ভুলিয়ে দেয়, সে কে ছিলো, কোথা থেকে এসেছে এবং কিভাবে তাকে এখানে আনা হয়েছে। স্বেচ্ছায় সে পুরোহিতের দাসীতে পরিণত হয়ে যায়। জগতের যত্তোসব বিশ্রী বস্তু সুশ্রী হয়ে দেখা দেয় তার চোখের সামনে। পুরোহিত তাকে পাতাল কক্ষে নিজের সঙ্গে রাখেন তিন রাত।
খলীফার নিরাপত্তা বাহিনী থেকে নিয়ে আসা পাঁচ হাবশীর একজন আলী বিন সুফিয়ানের সামনে ব্যক্ত করছিলো উপরোক্ত তথ্যগুলো। যে গোত্রের চার সিপাহী উম্মে আরারাকে অপহরণ করেছিলো, এই পাঁচজনও সে গোত্রের লোক। যেহেতু অল্প কদিন পর তাদের মেলা বসছে আর এরা পাঁচজন সে মেলায় অংশ নেয়ার উদ্দেশ্যে ছুটিতে যাচ্ছে, তাই আলী বিন সুফিয়ান ধরে নিলেন, হেরেমের মেয়ে অপহরণের বিষয়টি তাদের জানা থাকতে পারে। সেমতে খলীফার নিরাপত্তা বাহিনী থেকে সঙ্গে করে নিয়ে এসে আলী বিন সুফিয়ান এদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন। প্রথমে পাঁচজন-ই বলে, তারা এ ব্যাপারে কিছুই জানে না। আলী বিন সুফিয়ান তাদের আশ্বস্ত করেন, সত্য কথা বললে তাদের কোন শাস্তি দেয়া হবে না। তবু তারা অজ্ঞতার কথা-ই প্রকাশ করতে থাকে। হায়েনা চরিত্র আর রক্ত-পিয়াসী বলে প্রসিদ্ধ এ গোত্রটি। সাজা-শাস্তির ভয়-ডর নেই তাদের মনে। আলী বিন সুফিয়ানের ধৃত পাঁচজনও বেশ সাহসিকতার সঙ্গে অস্বীকার করে চলে। অগত্যা আলী বিন সুফিয়ান ঐসব পদ্ধতি প্রয়োগ করতে বাধ্য হন, যা পাথরকেও মোমের মত গলিয়ে দেয়।
আলী বিন সুফিয়ান আলাদা আলাদাভাবে পঁচজনকে এমন স্থানে নিয়ে যান, যেখানকার আহ-চীৎকার বাইরের কেউ শুনতে পায় না। বিরামহীন অত্যাচার-নির্যাতনে কোন আসামী মরে গেলেও জানতে পারে না কেউ।
এই পাঁচ সুদানী বড় কঠিন-হৃদয়ের মানুষ বলে মনে হলো আলী বিন সুফিয়ানের কাছে। তারা রাতভর কঠোর নির্যাতন সইতে থাকে। আর আলী বিন সুফিয়ানও রাত জেগে তাদের মুখ খোলানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু কোন স্বীকারোক্তি আদায় করা যাচ্ছে না তাদের মুখ থেকে। অবশেষে সর্বশেষ কঠোর পন্থাটি অবলম্বন করলেন আলী।
কঠোর নির্যাতনের মুখে শেষ রাতে মধ্য বয়সী এক হাবশী আলী বিন সুফিয়ানকে বলে–আমি সবকিছু জানি। কিন্তু বলছি না দেবতার ভয়ে। বললে দেবতা আমাকে নির্মমভাবে মেরে ফেলবে।
এর চেয়ে নির্দয় শাস্তি আর কী হতে পারে, যা আমি তোমাদের দিচ্ছি? তোমার দেবতা যদি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে তোমাকে এই নির্যাতনের যাতাকল থেকে বের করিয়ে নেয় না কেন? মৃত্যুকেই যদি তোমরা ভয় করে থাকো, তাহলে মৃত্যু এখানেও আছে। তোমরা কথা বলো। আমার হাতে এমন দেবতা আছে, যিনি তোমাদেরকে তোমাদের দেবতার কবল থেকে রক্ষা করবেন। বললেন আলী বিন সুফিয়ান।
আলী বিন সুফিয়ানের কঠোর শাস্তির মুখে বেশ কবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলে লোকটি। দেবতা নয়–বার বার মৃত্যু এসে চোখের সামনে হাজির হয় তার। আলী বিন সুফিয়ান তার মুখ খোলাতে সক্ষম হন। প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করে নির্যাতন থেকে মুক্তি দিয়ে পানাহার করিয়ে আরামে শুইয়ে দেন তাকে।
সে স্বীকার করে, উম্মে আরারাকে তার-ই গোত্রের চার ব্যক্তি অপহরণ করে নিয়ে গেছে। তারা খলীফার নিরাপত্তা বাহিনীর সিপাহী। তারা আগেই ছুটিতে গিয়েছিলো। পরিকল্পনা সম্পন্ন করে যাওয়ার সময় আমাদের অপহরণের রাত-ক্ষণ বলে গিয়েছিলো। সে রাতে পাহারায় ডিউটি ছিলো আমাদের পাঁচজনের। প্রধান ফটক দিয়ে তাদের দুজনকে ভেতরে ঢুকতে দেয়ার সুযোগ আমরা-ই করে দিয়েছিলাম। আমরা তাদের অপহরণ ও পলায়নে সার্বিক সহযোগিতা দিয়েছি।
হাবশী জানায়, মেয়েটিকে দেবতার বেদীতে বলী দেয়া হবে। প্রতি তিন বছর পর পর আমাদের গোত্রে চার দিনব্যাপী একটি উৎসব মেলা অনুষ্ঠিত হয়। এই মেলার শেষ দিন মেয়েটির বলীপর্ব সম্পন্ন হওয়ার কথা। আমাদের নিয়ম, বলীর মেয়ে ভিনদেশী, শ্বেতাঙ্গী, উচ্চ বংশের এবং চোখ ধাঁধানো রূপসী হতে হয়।
তার মানে প্রতি তিন বছর পর পর তোমার গোত্র বাইরে থেকে একটি করে রূপসী মেয়ে অপহরণ করে নিয়ে আসে। বললেন আলী বিন সুফিয়ান।
না, এটা ভুল প্রচারণা। তিন বছর পর পর মেলা বসে। আর মেয়ে বলী হয় প্রতি পাঁচ মেলার পর। তবে মানুষ এটাই জানে যে, প্রতি তিন বছর পর মেয়ে বলী হয়। জবাব দেয় হাবশী।
কোন্ স্থানে মেয়ে বলী হয়, হাবশী তাও জানায়। যে জায়গায় মেলা বসে, তার থেকে এক-দেড় মাইল দূরে একটি পাহাড়ী এলাকা। এ এলাকায় দেবতারা বাস করে বলে জনশ্রুতি আছে এবং তাদের সেবার জন্য নিয়োজিত আছে অসংখ্য জিন-পরী। এ এলাকায় ফেরআউনী আমলের একটি জীর্ণ প্রাসাদ আছে। আছে একটি ঝিল, যাতে বাস করে ছোট-বড় অনেক কুমীর।
