পরক্ষণেই মুখের ভেতর থেকে আত্মপ্রকাশ করে আরেকজন মানুষ। ঝুঁকে বাইরে বেরিয়ে আসে সে-ও। বয়সে খানিকটা বৃদ্ধ মনে হলো তাকে। পরনে লাল বর্ণের চোগা, মাথায় মুকুট। দু কাঁধে কুণ্ডলী পাকিয়ে ফনা তুলে বসে আছে মিশমিশে কালো দুটি সাপ। সাপ দুটো কৃত্রিম। ভয়ে গা শিউরে উঠে উম্মে আরারার। নির্জীব নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকে সে।
এ লোকটি অত্র গোত্রের ধর্মগুরু বা পুরোহিত। চবুতরার সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে আসেন তিনি। ধীরে ধীরে উম্মে আরারার নিকটে এসে মেয়েটির সামনে হাটু গেড়ে বসে তার দুটি হাত নিজের দুহাতে নিয়ে চুমো খান। আরবী ভাষায় মেয়েটিকে বলেন, তুমি-ই সেই ভাগ্যবতী মেয়ে, আমার দেবতা যাকে পছন্দ করেছেন। আমি তোমাকে মোবারকবাদ দিচ্ছি।
চৈতন্য ফিরে পায় উম্মে আরারা। কাঁদ কাঁদ কণ্ঠে বলে, আমি কোন দেবতা মানি না। তোমাদের যদি দেবতায় বিশ্বাস থাকে, তো আমি তাদের দোহাই দিয়ে বলছি, আমাকে ছেড়ে দাও। তোমরা আমাকে এখানে কেন আনলে!
এখানে যে-ই আসে, প্রথম প্রথম একথা-ই বলে। কিন্তু পরে যখন চোখের সামনে এ পবিত্র ভূখণ্ডের মাহাত্ম্য খুলে যায়, তখন বলে–আমি এখানে চিরদিন থাকতে চাই। আমি জানি, তুমি মুসলমানদের খলীফার প্রেমাস্পদ। কিন্তু যিনি পছন্দ করেছেন, দুনিয়ার সব খলীফা আর আকাশের ফেরেশতাকুল তাকে সেজদা করে। তুমি জান্নাতে এসে গেছে।
পুরোহিত চোগার পকেট থেকে একটি ফুল বের করে। উম্মে আরারার নাকের কাছে ধরে ফুলটি। উম্মে আরারাহ হেরেমের রাজকন্যা। এমনসব আতর-সুগন্ধি ব্যবহার সে করেছে, রাজকন্যারা ব্যতীত কেউ যার কল্পনাও করতে পারে না। কিন্তু এ ফুলের সৌরভ তার কাছে নিতান্তই অভিনব বলে মনে হলো। এ ফুলের সৌরভ হৃদয় ভেদ করে যায় উম্মে আরারার। সঙ্গে সঙ্গে ভাবনার রং-ও পাল্টে যায় তার। পুরোহিত বললেন–এটি দেবতার উপহার। মেয়েটির নাক থেকে ফুলটি সরিয়ে নেন পুরোহিত।
ধীরে ধীরে ডান হাতটা আগে বাড়ায় উম্মে আরারা। পুরোহিতের ফুল-ধরা হাতটা টেনে আনে নিজের কাছে। নাকের কাছে নিয়ে ফুল শুঁকে আবেশমাখা কণ্ঠে বলে–কি মন ভুলানো উপহার দেবেন এটি আমায়?
তুমি কি দেবতার এ উপহার গ্রহণ করেছো? জিজ্ঞেস করেন পুরোহিত। ঠোঁটে তার হাসি।
হ্যাঁ, দেবতার এ উপহার আমি কবুল করে নিয়েছি। বলে উম্মে আরারাহ পুনরায় ফুলটি নাকের কাছে ধরে। নিজের চোখ দুটো বন্ধ করে ফেলে, যেন ফুলের সৌরভে বিমোহিত হয়ে পড়েছে সে।
দেবতাও তোমায় কবুল করে নিয়েছেন। বললেন পুরোহিত। তারপর জিজ্ঞেস করলেন–এতক্ষণ তুমি কোথায় ছিলে?
ভাবনায় পড়ে যায় মেয়েটি। যেন কিছু স্মরণ করার চেষ্টা করছে সে। খানিক পর মাথা দুলিয়ে বলে–আমি এখানেই তো আছি।
–না, না আমি অন্য এক জায়গায় ছিলাম–ধুত্তুরি ছাই! মনে-ই পড়ছে না, কোথায় ছিলাম।
এখানে তোমাকে কে নিয়ে এসেছে?
কেউ নয়। আমি নিজেই এসেছি?
কেন, তুমি ঘোড়ায় চড়ে আসোনি?”
না, আমি উড়ে এসেছি।
কেন, পথে মরুভূমি, পাহাড়-জঙ্গল, বিরাণভূমি দেখোনি?
দেখিনি মানে! কত সবুজের সমারোহ আর কত রং-বেরংয়ের ফুল দেখেছি! শিশুর ন্যায় আপুত কণ্ঠে জবাব দেয় মেয়েটি।
তোমার চোখে কেউ পট্টি বাঁধেনি?
পট্টি? কই না তো! আমার চোখ তো ভোলাই ছিলো! কত সুন্দর সুন্দর মন ভুলানো পাখি দেখেছি আমি!
উচ্চশব্দে কি যেন বললেন পুরোহিত। উম্মে আরারার পিছন দিক থেকে ধেয়ে আসে চারটি মেয়ে। এসেই পরনের পোশাক খুলে বিবস্ত্র করে ফেলে উম্মে আরারাকে। উম্মে আরারাহ হেসে জিজ্ঞেস করে–দেবতা এ অবস্থায় আমাকে পছন্দ করবেন? পুরোহিত বললেন–না, তোমাকে দেবতার পছন্দের পোশাক পরানো হবে। মেয়েরা উম্মে আরারার কাঁধের উপর চাদরের মত দীর্ঘ একটি কাপড় ঝুলিয়ে দেয়। কাঁধ থেকে পা পর্যন্ত লম্বিত চাদরে আপাদমস্তক আবৃত হয়ে যায় তার। চাদরের পাড়ে কতগুলো রঙ্গিন রশির টুকরো বাঁধা। দুই পাড় একত্র করে বেঁধে দেয় মেয়েরা। চমৎকার এক চোগায় পরিণত হয় চাদরটি। উম্মে আরারার মাথার চুল রেশমের মত কোমল। একটি মেয়ে চুলগুলো আচড়িয়ে পিঠের উপর ছড়িয়ে দেয়। আরো বেড়ে যায় উম্মে আরারার রূপ।
পুরোহিত হাসিমুখে তাকায় উম্মে আরারার প্রতি। পাথর-নির্মিত ভয়ঙ্কর মুখমণ্ডলটির প্রতি হাঁটা দেন তিনি। দুটি মেয়ে উম্মে আরারারকে নিয়ে পুরোহিতের পেছনে পেছনে এগিয়ে যায়। রাজকন্যার মত হাঁটছে উম্মে আরারাহ। আশে-পাশে দৃষ্টি নেই তার। রাজকীয় ভঙ্গিমায় চলছে সে। পুরোহিতের অনুসরণে মেয়ে দুটোর হাত ধরে চবুতরার সিঁড়িতে উঠতে শুরু করে। পাথরের পাহাড়সম মুখমণ্ডলের গহ্বরে ঢুকে পড়ে পুরোহিত। উম্মে আরারাও তিনটি সিঁড়ি অতিক্রম করে ঝুঁকে ঢুকে পড়ে মুখের অভ্যন্তরে। মেয়ে দুটো দাঁড়িয়ে থাকে বাইরে। উম্মে আরারার হাত ছেড়ে দেয় তারা; ধরে । পুরোহিত নিজে। মুখের অভ্যন্তরটা যথেষ্ট প্রশস্থ, অনায়াসে সোজা হয়ে হাঁটতে পারছে মেয়েটি। কণ্ঠনালী থেকে নীচে নেমে গেছে কয়েকটি সিঁড়ি। এই সিঁড়ি বেয়ে নীচে নামে দুজন।
আবার একটি কক্ষ। কক্ষটি তেমন প্রশস্থ নয়। বেশ কটি প্রদীপ জ্বলছে। এখানেও ফুলের সৌরভ। কক্ষের ছাদ তেমন উঁচু নয়। দেয়াল ও ছাদ গাছের পাতা ও ফুল দিয়ে ঢাকা। ফরাশের উপর নরম ঘাস। ঘাসের উপর ফুল ছিটানো। এক কোনে মনোরম একটি পিপা ও একটি পেয়ালা। পিপা কাৎ করে দুটি পেয়ালা ভর্তি করেন পুরোহিত। একটি উম্মে আরারার হাতে ধরিয়ে দেন আর অপরটি রাখেন নিজের হাতে। ঠোঁটের সঙ্গে লাগিয়ে পেয়ালা খালি করে ফেলেন দুজনে।
