কিন্তু রজবকে যে আমি এখানে রাখতে চাই। বললেন খলীফা
হুজুরের সমীপে আমার বিনীত নিবেদন, সামরিক কর্মকাণ্ডে আপনি হস্তক্ষেপ করতে চেষ্টা করবেন না। বলেই সুলতান আইউবী আলী বিন সুফিয়ানের প্রতি মনোযোগী হন। আলী বিন সুফিয়ান তখন পাঁচজন হাবশী রক্ষীসেনা নিয়ে এদিকে আসছিলেন।
এরা পাঁচজন ঐ গ্রোত্রের লোক। আমি নিরাপত্তা বাহিনীকে উদ্দেশ করে বললাম, ঐ গোত্রের কেউ এখানে থাকলে বেরিয়ে আসো। সারি থেকে বেরিয়ে আসে এরা পাঁচজন। কমাণ্ডার বললো, এরা আগামী পরশু থেকে ছুটিতে যাচ্ছে। আমি এদেরকে সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছি। মেয়েটির অপহরণে এদের হাত থাকতে পারে। বললেন আলী বিন সুফিয়ান।
সালাহুদ্দীন আইউবী রজবকে ডেকে বললেন, আগামীকাল এখানে অন্য কমাণ্ডার আসছে। আপনি আমার নিকট চলে আসবেন। আমি আপনাকে মিনজানীকের দায়িত্ব দিতে চাই।
শুনে ফ্যাকাশে হয়ে যায় রজবের চেহারা।
***
উম্মে আরারাকে ঘোড়ায় তুলে নিয়ে হাবশী দুজন চলে যায় অনেক দূর। এখন আর কারো পশ্চাদ্ধাবনের আশঙ্কা নেই। ঘোড়া থামায় তারা। মেয়েটি পুনরায় মুক্ত হওয়ার জন্য ছটফট করতে শুরু করে। হাবশীরা তাকে বলে, এই তড়পানি তোমার অনর্থক। আমরা তোমাকে ছেড়ে দিলেও এখন আর এ বালুকাময় প্রান্তর অতিক্রম করে তুমি করে খেলাফতে জীবিত যেতে পারবে না। তারা মেয়েটিকে এই বলে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করে যে, আমরা তোমাকে অপমান করতে চাই না। বাস্তবিক, যদি তাদের উদ্দেশ্য খারাপ হতো, তাহলে এতক্ষণে তারা মেয়েটির সঙ্গে হায়েনার মতো আচরণ করতো। কিন্তু তারা তেমন কিছুই করেনি। এমন একটি চিন্তাকর্ষক সুন্দরী মেয়ে যে তাদের হাতের মুঠোয়, সে অনুভূতি-ই যেন নেই তাদের। তাদের যে দুজন লোক মারা পড়েছে, তার একজন মৃত্যুর আগে উম্মে আরারার সামনে হাটু গেড়ে বসে করজোরে নিবেদন করেছিলো, পালাবার চেষ্টা করে যেন সে নিজেকে কষ্টে না ফেলে। মেয়েটি তাদের জিজ্ঞেস করলো, তোমরা আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছো? জবাবে তারা। বললো, আমরা তোমাকে আসমানের দেবতার রাণী বানানোর জন্য নিয়ে যাচ্ছি।
তারা মেয়েটির চোখে পট্টি বেঁধে ঘোড়ায় বসায়। মেয়েটি পালাবার চেষ্টা ত্যাগ করে। এ চেষ্টা যে বৃথা, তা বুঝে ফেলে সে।
ছুটে চলে ঘোড়া। এক হাবশীর সামনে ঘোড়ায় বসে ফোফাতে থাকে উম্মে আরারা। দীর্ঘক্ষণ চলার পর শীতল বায়ুর পরশে সে বুঝতে পারে রাত হয়ে গেছে। আরো কিছুক্ষণ চলার পর এক স্থানে থেমে যায় ঘোড়া। একটানা পথ চলায় পরিশ্রান্ত হয়ে পড়ে মেয়েটি। সমস্ত শরীর ভেঙ্গে আসে যেনো তার। ভয়ে অকেজো হয়ে গেছে তার মস্তিষ্ক।
ঘোড়া থামতেই আশে-পাশে তিন-চারজন পুরুষ আর জনতিনেক মেয়ের মিশ্র স্বর শুনতে পায় মেয়েটি। অবোধ্য এক ভাষায় কথা বলছে তারা। অপহরণকারী হাবশীরা পথে তার সঙ্গে কথা বলেছে আরবী ভাষায়। কিন্তু তাদের বাচনভঙ্গি আরবী নয়।
চোখের পট্টি খোলা হয়নি উম্মে আরারার। সে অনুভব করে, একজন তাকে তুলে একটি মরম বস্তুর উপর বসিয়ে দেয়। বস্তুটি পালকি। উপরে উঠে যায় পালকিটি। শুরু হয় তার নতুন আরেক সফর। পালকি কাঁধে করে এগিয়ে চলে বেহারা। তার সঙ্গে দফের মৃদু-মধুর গুঞ্জরণ কানে আসতে শুরু করে তার। গান গাইতে শুরু করে মেয়েরা। গানের শব্দগুলো বুঝতে পারছে না মেয়েটি। কিন্তু গানের সুর-লয়ে জাদুর ক্রিয়া। তাতে উম্মে আরারার ভয়ের মাত্রা বেড়ে যায় আরো। এই ভয়ের মাঝে এমনও প্রতিক্রিয়া হতে শুরু করে, যেন নেশা বা আচ্ছন্নতা চেপে ধরছে তাকে। রাতের হীম বায়ু সে আচ্ছন্নতায় এক প্রকার মধুরতা সৃষ্টি করে চলেছে। উম্মে আরারার একবার ইচ্ছা জাগে, পালকি থেকে লাফিয়ে পড়ে পালাবার চেষ্টা করি আর ওরা আমাকে মেরে ফেলুক। কিন্তু পরক্ষণেই সে ভাবে, না, আমি যাদের কজায় আটকা পড়েছি, তারা মানুষ নয় অন্য কোন শক্তি। স্বেচ্ছায় আমার কিছুই করা চলবে না।
উম্মে আরারা টের পায়, বেহারারা একের পর এক সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছে। উঠছে তো উঠছে-ই। অন্তত ত্রিশটি সিঁড়ি অতিক্রম করে এবার তারা সমতল জায়গায় চলতে শুরু করে। কয়েক পা এগিয়ে-ই থেমে যায় পাকি। পালকিটি নামিয়ে রাখা হয় নীচে। উম্মে আরারার চোখ থেকে পট্টি খুলে দুচোখে হাত রাখে একজন। কিছুক্ষণ পর চোখের উপর থেকে হাতের আঙ্গুল সরতে শুরু করে এক এক করে। চোখে আলো দেখতে শুরু করে মেয়েটি। ধীরে ধীরে চোখ থেকে সরে যায় হাত।
চোখ ঘুরিয়ে এদিক-ওদিক তাকায় উম্মে আরারা। হাজার হাজার বছরের পুরনো একটি প্রাসাদে দাঁড়িয়ে আছে সে। একদিকে প্রশস্থ একটি হল। তাতে বিছিয়ে রাখা ফরশ আলোয় ঝম করছে। দেয়ালের সঙ্গে স্থানে স্থানে দাঁড়িয়ে আছে কতগুলো দণ্ড। প্রদীপ জ্বলছে সেগুলোর মাথায় এক প্রকার সুঘ্রাণ নাকে আসে তার, যার সৌরভ সম্পূর্ণ নতুন মনে হলো তার কাছে। দফের মৃদু শব্দ আর নারী কণ্ঠের গানের আওয়াজ কানে আসে উম্মে আরারার। এই বাদ্য-শব্দ আর গানের লয়-তাল অপূর্ব এক গুঞ্জরণ সৃষ্টি করে চলেছে হলময়।
সম্মুখে তাকায় উম্মে আরারা। একটি চবুতরা চোখে পড়ে। চবুতরায় পাথর-নির্মিত একটি মূর্তির মুখমণ্ডল ও মাথা। চিবুকের নীচে সামান্য একটু গ্রীবা। এই পাথরের মুখমণ্ডলটি দীর্ঘকায় একজন মানুষের চেয়েও দেড়-দু ফুট উঁচু। মুখটা খোলা, যা এতো-ই চওড়া যে, একজন মানুষ একটুখানি ঝুঁকে অনায়াসে তাতে ঢুকে পড়তে পারে। ধবধবে সাদা দাঁতও আছে মুখে। দেখতে মনে হচ্ছে, খিলখিল করে হাসছে মুখমণ্ডলটি। উভয় কান থেকে তার বেরিয়ে এসেছে দুটি দণ্ড। প্রদীপ জ্বলছে সেগুলোর মাথায়। হাত দুয়েক করে চওড়া চোখ দুটো তার অকস্মাৎ জুলজুল করে ওঠে। আলো বিচ্ছুরিত হতে শুরু করে তা থেকে। পাল্টে যায় মেয়েদের গানের লয়। তীব্র হয়ে ওঠে দফের বাজনা। আলোকিত হয়ে ওঠে পাথরের অভ্যন্তর। ধপধপে সাদা চোগা পরিহিত দুজন মানুষ ঝুঁকে বেরিয়ে আসে মুখের ভেতর থেকে। লোক দুটির গায়ের রং কালো। মাথায় বাঁধা লম্বা লম্বা রং-বেরংয়ের পাখির পালক। মুখের অভ্যন্তর থেকে বাইরে এসেই একজন ডান দিকে একজন বাঁ দিকে দাঁড়িয়ে যায়।
