সংবাদ পেয়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন খলীফা। সুলতান আইউবী ও তাঁর সঙ্গীগণ নেমে পড়েন ঘোড়া থেকে। সুলতান খলীফাকে যথাযযাগ্য মর্যাদার সাথে সালাম করেন, মোসাফাহা করেন ও হাতে চুমো খান। তারপর কোন ভূমিকা ছাড়া-ই বলে ওঠেন–
আপনার হেরেমের মেয়েকে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য আপনি পয়গাম পাঠিয়েছেন। সে পয়গাম আমি পেয়েছি। আমি আপনার দুই নিরাপত্তা কর্মীর লাশ নিয়ে এসেছি। এই লাশ দুটো-ই আমাকে নির্দোষ প্রমাণিত করবে। আর হুজুরের খেদমতে আমি এই আরজি পেশ করার আবশ্যক মনে করছি যে, সালাহুদ্দীন আইউবী আপনার ফৌজের সিপাহী নয়। আপনি যে খেলাফতের প্রতিনিধিত্ব করছেন, সালাহুদ্দীন সে খেলাফতের-ই প্রেরিত গভর্নর।
সালাহুদ্দীন আইউবীর ভাব-গতিক বুঝে ফেলেন খলীফা। পাপের ভারে কুঁকিয়ে ওঠে এই ফাতেমী খলীফার হৃদয়। সুলতান আইউবীর প্রভাব আর মহান ব্যক্তিত্বের সামনে দাঁড়িয়ে প্রত্যুত্তর করার সৎ সাহস নেই তার। সুলতানের কাঁধে হাত রেখে বললেন–আমি তোমাকে আপন পুত্র অপেক্ষা অধিক স্নেহ করি । ভেতরে এসে বসো সালাহুদ্দীন!
আমি এখনো একজন আসামী। এক্ষুনি আমার প্রমাণ দিতে হবে, হেরেমের মেয়ে অপহরণে আমার কোন হাত নেই। আল্লাহ আমাকে সাহায্য করেছেন, তিনি দুটি লাশ প্রেরণ করেছেন। এই দুটো লাশ কথা বলবে না ঠিক, কিন্তু তাদের নীরবতা, তাদের গায়ে বিদ্ধ হয়ে থাকা তীর-ই সাক্ষ্য দেবে, সালাহুদ্দীন কসরে খেলাফতে সংঘটিত এ অপরাধের সাথে জড়িত নয়। নিজেকে নির্দোষ প্রমাণিত না করা পর্যন্ত আমি ভেতরে যাবো না, আসুন। বলেই সালাহুদ্দীন আইউবী লাশের গাড়ীর দিকে হাঁটা দেন। খলীফাও তার পিছনে পিছনে রওনা হন।
খানিক দূরে দাঁড়িয়ে আছে চার থেকে সাড়ে চার শত নিরাপত্তা বাহিনী। সুলতান আইউবী গাড়ীর লাশ দুটো উঠিয়ে তাদের কাছে নিয়ে রাখেন এবং উচ্চকণ্ঠে বলেন–আট আটজন করে সিপাহী সামনে এগিয়ে আসে এবং লাশ দুটো দেখে বলল, এরা কারা?
প্রথমে আসে কমাণ্ডার ও প্লাটুন দায়িত্বশীলগণ। লাশ দুটো দেখেই তারা নাম উল্লেখ করে বলে–এরা তো আমাদের বাহিনীর সিপাহী ছিলো। তারপর আসে অপর আটজন। তারাও লাশ সনাক্ত করে বলে, এরা আমাদের সহকর্মী সিপাহী। এভাবে আটজন আটজন করে সকল কমাণ্ডার-সিপাহী এসে দেখে লাশ দুটোর পরিচয় প্রদান করে।
সালাহুদ্দীন! আমি মেনে নিলাম, এ দুটো লাশ কসরে খেলাফতের দুই নিরাপত্তা কর্মীর। কিন্তু আমি শুনতে চাই, এদের হত্যা করলো কে? বললেন খলীফা।
টহল বাহিনীর যে সান্ত্রী এদের হত্যা করেছিলো, সালাহুদ্দীন আইউবী তাকে সামনে ডেকে এনে বললেন, সমবেত মজলিসে তোমার কাহিনী পুনর্ব্যক্ত করো।
ঘটনাটি আনুপুংখ বিবৃত করে শোনায় সান্ত্রী। তার বক্তব্য শেষ হলে সুলতান আইউবী খলীফাকে বললেন–অপহরণ করে আপনার মেয়েটিকে আমার নিকট নিয়ে যাওয়া হয়নি–নিয়ে যাওয়া হয়েছে তাকে সুদানী হাবশীদের মেলায় বিক্রি করার জন্য। প্রথা অনুযায়ী হাবশীরা তারা বলীও দিতে পারে।
লজ্জায় ও দুঃখে অথোবদন হয়ে ওঠেন খলীফা। তিনি সুলতান আইউবীকে বললেন, বসুন, ভেতরে আসুন। কিন্তু ভেতরে যেতে অস্বীকার করলেন আইউবী। বললেন, আমি মেয়েটিকে জীবিত হোক, মৃত হোক উদ্ধার করে এনে আপনার খেদমতে হাজির হবো। তবে আপনি মনে রাখবেন, হেরেমের এমন একটি মেয়ের অপহরণ–যে এসেছিলো উপহারস্বরূপ এবং যে আপনার বিবাহিত স্ত্রী নয়–রক্ষিতা আমার কাছে বিন্দু বরাবর গুরুত্ব রাখে না। আল্লাহ আমাকে এর চেয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অর্পণ করেছেন।
আমার পেরেশানীর কারণ এই নয় যে, হেরেমের একটি মেয়ে অপহৃত হয়ে গেছে। পেরেশানীর আসল কারণ, যদি এভাবে নারী অপহরণ চলতে থাকে, তাহলে দেশের আইন-শৃংখলার পরিণতি কী হবে! বললেন খলীফা।
আর আমি পেরেশান এই ভেবে যে, খোদ ইসলামী সাম্রাজ্য-ই অপহৃত হয়ে যাচ্ছে। যা হোক, আপনি এতো অস্থির হবেন না। আমার গোয়েন্দা বিভাগ মেয়েটিকে উদ্ধার করে আনার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাবে। বললেন সুলতান আইউবী।
খলীফা সুলতান আইউবীকে খানিকটা আড়ালে নিয়ে গেলেন এবং বললেন, সালাহুদ্দীন! বেশ কিছুদিন ধরে আমি দেখছি, তুমি আমাকে এড়িয়ে চলছে। তোমার পিতা নাজমুদ্দীন আইউবকে আমি অনেক শ্রদ্ধা করি। কিন্তু তোমার মনে আমার প্রতি সামান্যতম শ্রদ্ধাবোধও নেই দেখছি। তাছাড়াও এই আজই আমি জানতে পারলাম, কায়রোর কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের খতীব আমীরুল ওলামা জুমার খোতবা থেকে আমার নাম তুলে দেয়ার মতো গোস্তাখী করেছে। কাজটা সে তোমার ইন্ধনে করেনি তো?
আমার ইন্ধনে নয়–সরাসরি আমার নির্দেশে তিনি খোতবা থেকে আপনার নাম তুলে দিয়েছেন। শুধু আপনার নাম-ই নয়, আপনার পরে যারা খেলাফতের মসনদে আসীন হবেন এবং তাদেরও পরে যারা আসবেন, সকলের নাম-ই আমি খোতবা থেকে তুলে দিয়েছি। বলিষ্ঠ কণ্ঠে বললেন সুলতান আইউবী।
এ নির্দেশ কি ফাতেমী খেলাফতকে দুর্বল করার জন্য জারি করা হলো? আমার তো সন্দেহ হচ্ছে, ফাতেমী খেলাফতকে উৎখাত করে আব্বাসীয় খেলাফত প্রতিষ্ঠার ষড়যন্ত্র চলছে। বললেন খলীফা।
হুজুর বেশ বৃদ্ধ হয়ে গেছেন। তাছাড়া মদপানের ফলে মস্তিষ্কও দুর্বল হয়ে গেছে। তাই কথাগুলো আপনার প্রলাপের মত শোনা যাচ্ছে ……। বললেন সুলতান আইউবী। তারপর খানিক চিন্তা করে বললেন, আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, কাল থেকে আপনার নিরাপত্তা বাহিনীতে রদবদল হবে। রজবকে প্রত্যাহার করে নিয়ে আমি তার স্থলে নতুন কমাণ্ডার দেবো।
