লাশগুলো তুলে খলীফার কাছে নিয়ে চলো। বললেন সুলতান আইউবী।
আগে নিশ্চিত হওয়া দরকার, এরা প্রকৃত-ই খলীফার নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য কিনা। বলেই আলী বিন সুফিয়ান সেখান থেকে চলে যান।
বেশীক্ষণ অতিবাহিত হয়নি। কসরে খেলাফতের এক কমাণ্ডার এসে পড়ে আলী বিন সুফিয়ানের সঙ্গে। লাশ দুটো দেখান হলো তাকে। দেখেই সে লাশ দুটো চিনে ফেলে এবং বলে–এরা তো খলীফার নিরাপত্তা বাহিনীর সিপাহী। গত তিনদিন ধরে এরা ছুটিতে ছিলো। সাত দিনের ছুটি নিয়েছিলো।
আরো কোন সিপাহী ছুটিতে আছে কি? জিজ্ঞেস করেন আইউবী।
আছে আরো দুজন।
তারা কি এদের সাথে এক সঙ্গে ছুটি নিয়েছিলো?
হ্যাঁ, চারজন একত্রে-ই ছুটি নিয়েছিলো।
জবাব দিয়ে কমাণ্ডার আরো এমনি এক তথ্য প্রকাশ করে, যা চমকিত করে তোলে সকলকে। কমাণ্ডার বলে–এরা সুদানের এমন একটি গোত্রের লোক, যারা রক্তপায়ী বলে খ্যাত। ফেরআউনী আমলের কিছু জঘন্য প্রথা এখনো তাদের সমাজে প্রচলিত। প্রতি তিন বছর অন্তর তারা একটি উৎসব পালন করে। উৎসব হয় মেলার মতো। তিন দিন তিন রাত চলে এই মেলা। দিনগুলো তারা এমনভাবে ঠিক করে, যাতে চতুর্থ রাতে পূর্ণিমা থাকে। এ গোত্রের বাইরের অনেক লোকও মেলায় অংশ নেয়। তারা আসে শুধু আমোদ করার জন্য। সুন্দরী যুবতী মেয়েদের বেচা-কেনার জন্য রীতিমত হাট বসে মেলায়। এই মেলা বসার অন্তত একমাস পূর্ব থেকে পার্শ্ববর্তী এলাকা, বরং কায়রোতে পর্যন্ত যাদের ঘরে ঘুরতী মেয়ে আছে, তারা সতর্ক হয়ে যায়। কেউ মেয়েদেরকে ঘর থেকে বের হতে দেয় না। যাযাবর পরিবারগুলো পর্যন্ত এ সময়ে এ এলাকা থেকে অনেক দূরে চলে যায়। এই একমাস চতুর্দিকে মেয়ে অপহরণ হয় আর এ মেলায় বিক্রি হয়। চার সুদানী ফৌজ-ও এ মেলা উপলক্ষ্যে ছুটিতে গিয়েছিলো। আর মাত্র তিনদিন পর মেলা শুরু হচ্ছে।
আচ্ছা, তাদের ব্যাপারে কি একথা বলা যায় যে, তারাই খলীফার হেরেমের মেয়েটিকে অহপরণ করেছে? জিজ্ঞেস করলেন আলী বিন সুফিয়ান।
একথা আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি না। আমি শুধু এতটুকু বলতে পারি, এ দিনগুলোতে উক্ত গোত্রের লোকেরা জীবনের ঝুঁকি নিয়েও মেয়ে অপহরণ করার চেষ্টা করে। তারা এতো-ই রক্তপায়ী যে, যদি কোন মেয়ের অভিভাবক মেলায় গিয়ে নিজ কন্যার সন্ধান পায় এবং তাকে ফিরিয়ে আনতে চায়, তবে নির্ঘাত তাকে জীবন হারাতে হয়। মেয়েদের খদ্দেরদের মধ্যে মিসরের আমীর-উজীর-হাকীমও থাকেন। মেলায় এমন একটি অস্থায়ী পতিতালয় স্থাপন করা হয়, যেখানে সর্বক্ষণ মদ-জুয়া আর নারী নিয়ে আমোদ চলে। এ উৎসব-অনুষ্ঠানের শেষ রাতটি হয় অত্যন্ত রহস্যময়। কোন একটি গোপন স্থানে একটি অস্বাভাবিক সুন্দরী যুবতী মেয়েকে বলী দেয়া হয়। কোন্ স্থানে কিভাবে এই নারী-বলী হয়, তা নির্দিষ্ট কজন ছাড়া আর কেউ বলতে পারে না। হাবশীদের এক ধর্মগুরু–যাকে তারা খোদা বলেও বিশ্বাস করে–এ কাজ সম্পাদন করে। তার সঙ্গে থাকে স্বল্পসংখ্যক পুরুষ আর চার-পাঁচটি মেয়ে। বলী দেয়া মেয়ের কর্তিত মাথা ও রক্ত প্রদর্শন করা হয় সর্বসাধারণকে। কর্তিত মস্তক দেখে গোত্রের মানুষ মাতালের ন্যায় নাচতে-গাইতে ও মদপান করতে শুরু করে।
***
অপহরণ ঘটনার তথ্য উদ্ধার করার জন্য খলীফা নিরাপত্তা বাহিনীর উপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করেন। তথ্য বের করার জন্য সেই ভোর থেকে সমগ্র বাহিনীকে প্রখর রোদে দাঁড় করিয়ে রাখেন তিনি। কমাণ্ডারদের পর্যন্ত এক তিল দানা-পানি মুখে দিতে দেননি সারা দিন। রজব বার বার আসছে আর ঘোষণা করছে–মহলের নিরাপত্তা বাহিনীর সহযোগিতা ছাড়া মেয়ে অপহরণ করা যেতে পারে না। যে-ই এ অপহরণে সাহায্য করেছে, সামনে এসে হাজির হও। অন্যথায় সকলকে এভাবে ক্ষুৎপিপাসায় মেরে ফেলা হবে। যদি মেয়েটি স্বেচ্ছায়ও পালিয়ে গিয়ে থাকে, তাহলেও তো কেউ না কেউ দেখে থাকবে নিশ্চয়। বলো, কে তার অপহরণে সাহায্য করেছ! কিন্তু না, এতোসব হুমকি-ধমকিতে কোন-ই ক্রিয়া হচ্ছে না। সকলের মুখে একই কথা, এ ব্যাপারে আমি কিছুই জানি না, আমি নির্দোষ।
খলীফা রজবকে এক পা দাঁড়াতে দিচ্ছেন না। তাকে তিনি বলেছিলেন–উম্মে আরারার জন্য আমার আফসোস নেই। আমার পেরেশানীর কারণ হলো, যে বা যারা এত কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে মহলের একটি মেয়েকে অপহরণ করে নিয়ে যেতে পারে, তারা আমাকে অনায়াসে হত্যাও তো করতে পারে! তুমি বলেছিলে, এ ঘটনা সালাহুদ্দীন ঘটিয়েছে; আমি তার প্রমাণ চাই।
কিন্তু রজব প্রমাণ দেবে কোত্থেকে? প্রখর রৌদ্রে দাঁড়িয়ে থাকা নিরাপত্তা বাহিনীর নিকট আবার ছুটে যায় সে। রাগে পাগলের মতো হয়ে গেছে লোকটি। সৈন্যদের উদ্দেশে পূর্বের বলা কথাগুলোর পুনরাবৃত্তি করতে শুরু করে। ঠিক এ সময়ে মহলের দরজায় দণ্ডায়মান সান্ত্রীরা দরজা খুলে দেয় এবং চেঁচিয়ে উঠে বলে–ঐ তো আমীরে মেসের আসছেন।
প্রধান ফটকে প্রবেশ করে সুলতান আইউবীর অশ্ব। সামনে তার দুজন । রক্ষীর ঘোড়া। আটজন আরোহী পিছনে। একজন ডানে আর একজন বয়ে। সকলের পিছনে সুলতান আইউবীর একজন উপদেষ্টা আর গোয়েন্দা প্রধান আলী বিন সুফিয়ান।
সুলতান আইউবীর এই বহরের পেছনে চার চাকাবিশিষ্ট একটি গাড়ী। দুটি ঘোড়া টেনে এনেছে গাড়ীটি। গাড়ীতে পড়ে আছে দুটি লাশ। একটি চীৎ হয়ে আর অপরটি উপুড় হয়ে। লাশ দুটির গায়ে বিদ্ধ দুটি তীর। লাশের সঙ্গে আছে তিনজন সিপাহী।
