খলীফার এ পয়গামকে মস্তিষ্ক থেকে ঝেড়ে ফেলা কি সম্ভব নয়? সাহস সঞ্চয় করে জিজ্ঞেস করলেন নায়েব সালার আন-নাসের।
আমি সে চেষ্টাই করছি। কিন্তু অভিযোগের ধরণটা দেখো । আমি কিনা খলীফার হেরেমের একটি মেয়েকে অপহরণ করিয়েছি। আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করুন। আমাকে অপমান করতে লোকটা কোন পন্থা-ই বাদ রাখলো না। সবশেষে কিনা আমার নামে হেরেমের মেয়ে অপহরণ করানোর অবপদ! পয়গাম–বরং হুশিয়ারী পাঠালেন দূতের মুখে। তা না করে তিনি আমাকে ডেকে নিয়ে সরাসরি কথা বলতেন। বললেন সুলতান আইউবী।
তারপরও আপনাকে আমি পরামর্শ দেবো, আপনি মাথা ঠাণ্ডা করুন, মনের উত্তেজনা দূর করুন। বললেন বাহাউদ্দীন শাদ্দাদ।
সুলতান আইউবী বললেন–আচ্ছা, সত্যিই কি হেরেমের কোন মেয়ে অপহৃতা হয়েছে? আমার তো মনে হচ্ছে, সংবাদটা মিথ্যে। এতক্ষণে হয়তো খলীফা জেনে ফেলেছেন, আমি জুমার খোতবা থেকে তার নাম তুলে দিয়েছি। তার-ই প্রতিশোধ স্বরূপ বোধ হয় তিনি আমার উপর অপবাদ আরোপ করেছেন যে, আমি তার হেরেমের একটি মেয়েকে অপহরণ করিয়েছি। ঈসা এলাহকারীকে উদ্দেশ করে সুলতান বললেন–আজই আপনি মিসরের সব মসজিদে এই নির্দেশনামা জারি করে দিন, আগামীতে যেন কোন ইমাম জুমার খুতবায় খলীফার নাম উল্লেখ না করেন।
আপনি খলীফার নিকট চলে যান; তার সঙ্গে কথা বলুন। তাকে বলুন, খলীফা জাতির মর্যাদার প্রতীক বটে, কিন্তু আঁর আদেশ-নিষেধ এখন অচল। বিশেষত যখন সারাদেশে যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে, তখন তো খলীফার আইন মান্য করার জন্য কেউ-ই প্রস্তুত নয়। শক্রর আশঙ্কা বাইরে থেকে যেমন, ভিতর থেকেও তেমনি। আমি তো আপনাকে এন্দুর পরামর্শও দেবো যে, আপনি খলীফার রক্ষী বাহিনীর সংখ্যা কমিয়ে দিন। সুদানী হাবশীদের বাদ দিয়ে মিসরী সৈন্য নিয়োগ করুন এবং খলীফার মহলের বরাদ্দ হ্রাস করুন। এসব পদক্ষেপের পরিণাম আমার জানা আছে। পরিস্থিতির মোকাবেলা আমাদের করতেই হবে। তবু আল্লাহর উপর ভরসা রেখে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। আন-নাসের বললেন।
আল্লাহ এ অপমান থেকেও আমাকে রক্ষা করবেন। বললেন সুলতান।
এমন সময় কক্ষে প্রবেশ করে দারোয়ান। আলোচনা বন্ধ করে সকলে তাকায় তার প্রতি। সালাম দিয়ে বলে–মরুভূমির টহল বাহিনীর কমান্ডার এসেছেন। সঙ্গে তার তিনজন সিপাহী। তিনি দু জন সুদানীর লাশ নিয়ে এসেছেন।
দারোয়ানের এই আকস্মিক প্রবেশে বিরক্তি বোধ করে সকলে। কারণ, সুলতান আইউবী তখন অতীব গুরুত্বপূর্ণ কথা বলছিলেন। দারোয়ানের অনুপ্রবেশে ছেদ পড়ে সেই আলোচনায়। কিন্তু সুলতান আইউবী দারোয়ানকে বললেন–তাকে ভেতরে পাঠিয়ে দাও। সুলতান আইউবী আগেই দারোয়ানকে বলে রেখেছিলেন, কেউ তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসলে যেন সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে অবহিত করা হয়। রাতে ঘুম থেকে জাগানোর প্রয়োজন হলেও অশংকোচে যেন তাকে জাগিয়ে তোলে।
ভেতরে প্রবেশ করে কমাণ্ডার। ধুলো-মলিন তার চেহারা। দেখে পরিশ্রান্ত মনে হলো তাকে। সুলতান আইউবী তাকে বসতে বলে দাওরায়ানকে বললেন, এর আহারের ব্যবস্থা করো । কমাণ্ডার জানালেন, একটি অপহৃতা মেয়েকে উদ্ধার করার জন্য আমরা চারজন সুদানী হাবশীর দুজনকে তীরের আঘাতে হত্যা করেছি। অপর দুজন মেয়েটিকে নিয়ে পালিয়ে গেছে। নিহত দুজনের লাশ আমরা সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি। কমাণ্ডার আরো জানায়, মেয়েটি যাযাবর কিংবা সাধারণ ঘরানার কন্যা নয়। দেখে তাকে রাজকন্যা বলে মনে হলো। কথা প্রসঙ্গে নিজেকে খলীফার মালিকানাধীন বলে দাবি করতেও শুনেছি।
মনে হয় আল্লাহ আমার সাহায্যে এগিয়ে এসেছেন। বলেই বসা থেকে উঠে সুলতান কক্ষ থেকে বের হয়ে যান। কক্ষে উপবিষ্ট সকলে তার পিছনে পিছনে বেরিয়ে আসেন।
কক্ষের বাইরে মাটিতে পড়ে আছে দুটি লাশ। একটি উপুড় হয়ে। পিঠে বিদ্ধ একটি তীর। অপর লাশের ঘাড়ে একটি তীর গাঁথা। পার্শ্বে দাঁড়িয়ে আছে তিনজন সিপাহী। মিসরের গভর্নর সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীকে এই প্রথমবার দেখলো তারা। পরিচয় পেয়ে সালাম করে পিছনে সরে যায়। সুলতান আইউবী তাদের সালামের জবাব দেন এবং হাত মিলিয়ে বলেন, এ শিকার তোমরা কোথা থেকে মেরে আনলে? যে সান্ত্রী টিলায় দাঁড়িয়ে তীর ছুঁড়ে এদেরকে হত্যা করেছিলো, সে সুলতান আইউবীকে পুরো ঘটনার বিবরণ দেয়।
উপদেষ্টাদের প্রতি তাকিয়ে সুলতান আইউবী বললেন–আমার মনে হয়, মেয়েটি খলীফার সেই রক্ষিতা-ই হবে। আপনারা কী বলেন?
আমারও তা-ই মনে হয়। এদের খঞ্জরগুলো দেখুন– বলেই আলী বিন সুফিয়ান নিহতদের খঞ্জর দুটো আইউবীকে দেখান। সান্ত্রী যখন সুলতানকে ঘটনার বিবরণ দিচ্ছিলো, তখন আলী বিন সুফিয়ান লাশ দুটোর সুরতহাল পর্যবেক্ষণ করছিলেন। পরনে সুদানের কাবায়েলী পোশাক। পোশাকের ভেতরে কটিবন্ধ, যাতে বাঁধা আছে একটি করে খঞ্জর । এগুলো খলীফার নিরাপত্তা বাহিনীর বিশেষ ধরনের খঞ্জর। খঞ্জরের হাতলে কসরে খেলাফতের মোহর, অঙ্কিত।
আলী বিন সুফিয়ান বললেন–এরা যদি খঞ্জরগুলো চুরি করে না থাকে, তাহলে এরা কসরে খেলাফতের নিরাপত্তা বাহিনীর সিপাহী। আপাতত আমরা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, আমাদের সান্ত্রীরা যে মেয়ের ঘটনা জানালো, সে হেরেমের-ই অপহৃতা মেয়ে, যার অপহরণকারীরা খলীফার নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য।
