আমি মুসলিম! আমি তোমাদের দেবতাদের অভিসম্পাত করি। আমাকে ছেড়ে দাও। অন্যথায় আমি খলীফার কুকুর দিয়ে তোমাদের টুকরো টুকরো করাবো। চীৎকার করে বললো মেয়েটি।
তোমার মালিকানা এখন খলীফার হাতে নয়। আকাশের বিজলী, সাপের বিষ আর সিংহের শক্তি যে দেবতার হাতে, তোমার মালিক এখন তিনি। তিনি তোমাকে পছন্দ করে ফেলেছেন। এখন যে-ই তোমাকে রক্ষা করার চেষ্টা করবে, মরুভূমির তপ্ত বালুকারাশি তাকে-ই ভস্ম করে ফেলবে। বললো একজন।
হাবশীদের একজন আরেকজনকে বললো–আমি তোমাকে বলেছিলাম, এখানে থেমো না। কিন্তু তোমার কিনা বিশ্রাম নেয়ার প্রয়োজন। ওকে বাঁধা অবস্থায় লাগাতার এগিয়ে চললে সন্ধ্যার আগে আগেই আমরা গন্তব্যে পৌঁছে যেতে পারতাম।
কেন, ঘোড়াগুলো পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছে দেখতে পাচ্ছো না? তাছাড়া সারাটা রাত গেলো আমরা এক তিল ঘুমুতে পারিনি। আমাদেরও তো একটু। বিশ্রামের প্রয়োজন আছে। যাক, চলো, একে আবার বেঁধে রওনা হই। বললো। দ্বিতীয়জন।
উম্মে আরারাকে ঝাঁপটে ধরে রাখে একজন। হঠাৎ পিছন দিক থেকে একটি তীর এসে বিদ্ধ হয় তার পিঠে। উম্মে আরারাকে জড়িয়ে ধরা হাত শিথিল হয়ে আসে তার। ঝাঁপটা দিয়ে বন্ধন-মুক্ত হয়ে পালাতে উদ্ধত হয় মেয়েটি। সঙ্গে সঙ্গে আরেকজন ঝাঁপটে ধরে টেনে ঘোড়ার আড়ালে নিয়ে যায় তাকে। শা করে ছুটে আসে আরেকটি তীর। বিদ্ধ হয় অপর একজনের ঘাড়ে ছটফট করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে সে-ও। উম্মে আরারাকে ঝাঁপটে ধরে রাখা লোকটি ঘোড়ার বাগ ধরে উম্মে আরারাহ এবং ঘোড়াটিকে নিয়ে নেমে পড়ে নিম্নভূমিতে। চার হাবশীর অপরজনও দৌড়ে নেমে পড়ে নীচে।
উষ্ট্রারোহী সাথীদের যে লোকটি টিলার উপরে উঠে দাঁড়িয়েছিলো, সে-ই নিক্ষেপ করে তীর দুটি। সে জানায়, দেবতার কথা শুনে প্রথমে আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু পরে যখন শুনলাম, মেয়েটি বলছে, আমি মুসলমান; তোমাদের দেবতাকে আমি অভিসম্পাত করি; তখন আমার ঈমান জেগে উঠে। মেয়েটি যখন খলীফার নাম উল্লেখ করে, তখন আমি বুঝলাম, এ তো হেরেমের মেয়ে। তা ছাড়া মেয়েটির পোশাক-পরিচ্ছদ ও গঠন-আকৃতিতে পরিষ্কার বুঝা গেলো, এ কোন সাধারণ মেয়ে নয়। নিশ্চয় মেয়েটিকে অপহরণ করা হয়েছে এবং সুদান নিয়ে গিয়ে তাকে বিক্রি করে ফেলা হবে। সান্ত্রীর জানা ছিলো, অল্প কদিন পর সুদানী হাবশীদের মেলা বসছে। সুন্দরী মেয়েদের বেচা-কেনা হয় সে মেলায়।
সুলতান আইউবী সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দিয়ে রেখেছিলেন, যেন তারা নারীর ইজ্জতের হেফাজত করে। একজন নারীর সম্ভ্রম রক্ষা করতে প্রয়োজনে এক ডজন মানুষ হত্যা করার অনুমতিও দেয়া ছিলো তাদের। এ বিষয়গুলোকে সামনে রেখে সান্ত্রী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো, যে করে থোক মেয়েটিকে উদ্ধার করতেই হবে। দুটি তীর নিক্ষেপ করে দু হাবশীকে খুন করে ফেলে সে।
মেয়েটিকে নিয়ে পালিয়ে যায় দুই হাবশী। সান্ত্রীর তীরের আঘাতে নিহত দুজনের ঘোড়া দুটোও নিয়ে যায় তারা। ফেলে যায় শুধু দুটি লাশ।
সান্ত্রীদের সকলেই উষ্ট্রারোহী। একটি ঘোড়াও নেই তাদের কাছে। উটে চড়ে অশ্বারোহীদের ধাওয়া করা বৃথা। অগত্যা লাশ দুটো উটের পিঠে তুলে নিয়ে কায়রো অভিমুখে রওনা হয় তারা।
অপহৃতা মেয়েটি কে এবং লাশ দুটো কাদের, তা অনুমান করতে সক্ষম হয়েছিলো সান্ত্রীরা। তাই হেরেমের একটি মেয়েকে কারা অপহরণ করলো, তার প্রমাণের জন্য লাশ দুটো নিয়ে যাওয়া আবশ্যক মনে করে তারা।
***
কক্ষে অস্থিরচিত্তে পায়চারী করছেন সুলতান আইউবী। রাগে-ক্ষোভে আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছেন যেন তিনি। তার নায়েব-উপদেষ্টাবৃন্দও কক্ষে উপস্থিত। নতমুখে বসে আছেন সবাই।
সুলতান আইউবী বরাবর-ই সহনশীল মানুষ। নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রেখেই কাজ করেন তিনি। তিনি কখনো আবেগপ্রবণ হন না। রাগের মাথায় কিছু বলেনও না, করেনও না। যত প্রতিকূল পরিস্থিতির-ই শিকার হন না কেন, সর্বাবস্থায় ঠাণ্ডা মাথায় কাজ করা-ই তার অভ্যাস। প্রবল থেকে প্রবলতর রাগ-ও তিনি হজম করে ফেলেন। এমন কঠিন পরিস্থিতিতেও ধৈর্যের পরীক্ষায় তিনি উত্তীর্ণ হয়েছেন, যে পরিস্থিতিতে প্রবল প্রতাপশালী যোদ্ধাও অস্ত্র সমর্পণ করতে বাধ্য হয়। শত্রুর বেষ্টনীতে অবরুদ্ধ হয়েও ঠাণ্ডা মাথায় তিনি লড়াই করেছেন। এমন কঠিন পরিস্থিতিতেও যুদ্ধ চালিয়ে গেছেন, যখন বাহিনীসহ তিনি শত্রুর হাতে অবরুদ্ধ, সাহস হারিয়ে ফেলেছে তার সৈন্যরা, খাবার নেই, পানি নেই। সৈন্যদের তুনীরে একটি তীরও নেই। তার বাহিনী অপেক্ষা করছে, কখন তিনি আত্মসমর্পণ করে তাদের এ কষ্ট থেকে মুক্তি দেবেন, তাদের জীবন রক্ষা করবেন। কিন্তু সুলতান আইউবী নিজের সাহস অটুট রেখে শুধু লড়াই-ই অব্যাহত রাখেননি, তার সৈন্যদের মধ্যেও নবজীবন সৃষ্টি করতে সমর্থ হয়েছিলেন।
কিন্তু আজ আজ তিনি আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছেন। রাগে-ক্ষোভে দু চোখ থেকে আগুন ঠিকরে পড়ছে যেনো তার। চেহারায় ক্ষোভ ও যন্ত্রণার ছাপ। ফলে কথা বলার সাহস পাচ্ছে না কেউ। মাথা নুইয়ে কপালে হাত ঠেকিয়ে নীরবে বসে আছে সকলে।
এই আজ-ই আমি প্রথমবার আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললাম। পায়চারী করতে করতে বললেন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী।
