***
সুলতান আইউবী রজবকে ভাল করেই জানতেন। তিনি জানতেন, রজব খলীফার আজ্ঞাবহ নায়েব সালার । তাই তিনি আলী বিন সুফিয়ানকে বললেন, রজবের পিছনে একজন লোক সর্বক্ষণ ছায়ার মতো লাগিয়ে রাখুন।
রাতের বেলা। রজব মহলে নেই। সুলতান আইউবীকে হত্যা করার আয়োজন সম্পন্ন করতে বাইরে চলে গেছে সে। হাসান ইবনে সাব্বাহর হাশীশীদের সঙ্গে যোগসাজশ করে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে রজব।
আমোদে মেতে উঠেছেন খলীফা। প্রতিদিনকার ন্যায় আজও তিনি বহির্জগত সম্পর্কে উদাসীন। উম্মে আরারার যাদুময়ী রূপ-দেহে মাতোয়ারা তিনি। জুমার খুতবা থেকে নাম উঠে যাওয়ার সংবাদ এ যাবত কেউ তাকে দেয়নি। সালাহুদ্দীন আইউবীকে হত্যা করার প্রস্তুতি চলছে, সে আনন্দেই তিনি আত্মহারা।
তাড়াতাড়ি ঘুম পাড়ানোর জন্য উম্মে আরারাহ অতিরিক্ত মদ পান করায় তাকে। মদের সঙ্গে নিদ্রাজনক পাউডারও খাইয়ে দেয়। বৃদ্ধের জ্বালাতন থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য সব সময় এ প্রক্রিয়া অবলম্বন করে থাকে উম্মে আরারাহ। বৃদ্ধকে শুইয়ে দিয়ে, বাতি নিভিয়ে কক্ষ থেকে বেরিয়ে যায় মেয়েটি । হাঁটা দেয় নিজের কক্ষের প্রতি। রাতে চুপিসারে এ কক্ষে-ই তার কাছে আসা-যাওয়া করে।–রজব।
উম্মে আরারাহ কক্ষে প্রবেশ করছে। তার এক পা কক্ষের ভিতরে, এক পা বাইরে। এমন সময় পিছন থেকে কে একজন একটি কম্বল ছুঁড়ে মারে তার গায়ে। মুখ থেকে তার একটি শব্দ বের হতে না হতেই দৌড়ে এসে লোকটি আরেকখণ্ড কাপড় দ্বারা বেঁধে ফেলে তার মুখ। মেয়েটিকে কাঁধে তুলে নিয়ে হাঁটা দেয় লোকটি।
তারা ছিলো দুজন। মহলের আঁকা-বাঁকা গোপন পথ সবই যেন তাদের চেনা। অন্ধকার সিঁড়িতে নেমে পড়ে তারা। উপরে লম্বা রশি বেঁধে রেখেছিলো আগেই। সেই রশি ধরে ধরে ঘোর অন্ধকারে চোরা পথ বেয়ে মেয়েটিকে কাঁধে করে নেমে পড়ে একজন। অপরজন হাঁটছে তার পিছনে। মহল থেকে নেমে অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে যায় দুটি লোক।
দূরে দাঁড়িয়ে আছে চারটি ঘোড়া। ঘোড়াগুলোর নিকটে সতর্ক বসে আছে আরো দুজন লোক। আঁধার চিরে সঙ্গীদের আসতে দেখে তারা। আরো দেখে, কাঁধে করে কম্বল পেঁচানো কি যেন নিয়ে আসছে একজন।
চারটি ঘোড়ায় চড়ে বসে চার সঙ্গী। একজন মেয়েটিকে কম্বল মোড়ানো অবস্থায়-ই নিজের সামনে বসিয়ে দেয়। একজন বলে ঘোড়াগুলোকে এখনই দ্রুত ছুটানো যাবে না। ঘোড়র পায়ের আওয়াজে প্রহরীরা সতর্ক হয়ে যাবে। ধীরে ধীরে এগুতে শুরু করে চারটি ঘোড়া। বেরিয়ে যায় শহর থেকে।
***
এটি সালাহুদ্দীন আইউবীর-ই কাজ।
মিসরের গভর্নর ছাড়া এ দুঃসাহস আর কেউ দেখাতে পারে না।
তিনি ছাড়া এ-কাজ আর করতে-ই বা পারে কে?
উম্মে আরারাহ অপহরণের খবর ছড়িয়ে পড়ে রাজমহলে। সকলের মুখে এক-ই কথা, সালাহুদ্দীন আইউবী ছাড়া আর কেউ এ-কাজ করাতে পারে না।
ফিরে এসেছে রজব। মহলের সর্বত্র তন্ন তন্ন করে খোঁজ নেয় সে। রক্ষী বাহিনীর সদস্যদের গালাগাল করছে কমাণ্ডারগণ। স্বয়ং কমাণ্ডারগণ সিপাহীদের ন্যায় থর থর করে কাঁপছে।
মহলের একটি মেয়ে অপহরণ মামুলী ঘটনা নয়। তা-ও আবার সেই মেয়ে, খলীফা যাকে মহলের হীরক মনে করেন।
মহলের পিছনের গোপন পথে একটি রশি ঝুলছে দেখা গেলো। মাটিতে পায়ের ছাপ, যা একটু দূরে গিয়ে ঘোড়ার খুরের চিহ্নে মিলিয়ে গেছে। এতে প্রমাণ পাওয়া গেলো, মেয়েটিকে রশি বেয়ে নীচে নামানো হয়েছে। কেউ কেউ এমন সন্দেহও ব্যক্ত করেছে যে, মেয়েটি হয়তো স্বেচ্ছায় কারো সঙ্গে বেরিয়ে গেছে। খলীফা উড়িয়ে দেন এ সংশয়। বলেন, অসম্ভব, উম্মে আরারাহ স্বেচ্ছায় কারো হাত ধরে উধাও হতে পারে না। সে আমাকে প্রাণ দিয়ে ভালবাসতো।
এ সালাহুদ্দীন আইউবীর কাজ। কসরে খেলাফতের সকলের মুখে এই একই কথা, আইউবী ছাড়া এ কাজ করার সাহস আর কেউ করতে পারে না। খলীফার উদ্দেশে বললো রজব।
কথাটা রজব-ই সকলের কানে দিয়েছিলো। উম্মে আরারার নিখোঁজ হওয়ার সংবাদ শোনামাত্র সে মহলময় ঘুরে ঘুরে প্রত্যেকের নিকট মেয়েটির ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করেছিলো আর বলেছিলো, সুলতান আইউবী-ই এ-কাজ করেছে। রজবের উস্কানিতে মহলের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নিয়ে সাধারণ কর্মচারীদের পর্যন্ত সকলে এই একই কথা আওড়াতে শুরু করে। আর যখন কথাটা খলীফার কানে দেয়া হলো, তখন তিনি একটুও ভাববার প্রয়োজনবোধ করলেন না, এ অভিযোগ ভিত্তিহীন হতে পারে। তাকে আগেই জানানো হয়েছিলো, সুলতান আইউবী নারী-লোলুপ পুরুষ। তিনি মহলের মেয়েদের নিয়ে নিয়ে নষ্ট করছেন। তাই সঙ্গে সঙ্গে খলীফা দূতকে ডেকে পাঠান। দূত আসলে তাকে তিনি বললেন, মিসরের গভর্নরের নিকট যাও। গিয়ে বলো, যেনো গোপনে তিনি মেয়েটিকে ফিরিয়ে দিয়ে যান। তাহলে আমি এর প্রতিশোধ নেবো না।
***
খলীফা আল-আজেদ যখন দূতকে এ পয়গাম প্রদান করছিলেন, ঠিক তখন কায়রো থেকে দশ মাইল দূরে তিনজন উষ্ট্রারোহী ধীরে ধীরে এগিয়ে চলছিলো শহর অভিমুখে। এরা মিসরী ফৌজের টহলসেন। তারা ডিউটি শেষ করে শহরে ফিরছিলো। তাদের সম্মুখে মাটি ও পাথরের বিস্তীর্ণ পাহাড়ী অঞ্চল। তারা একটি উপত্যকা দিয়ে অতিক্রম করছিলো।
হঠাৎ নারীকণ্ঠের এক আর্ত-চীৎকার ভেসে আসে তাদের কানে। সাথে পুরুষালী কণ্ঠও শুনতে পায়। তারা পরিষ্কার বুঝতে পারে, কোন এক হতভাগী নারীর উপর নির্যাতন চলছে। দাঁড়িয়ে যায় তারা। উটের পিঠ থেকে নীচে নামে একজন। একজন টিলার উপরে উঠে চীৎকার-ধ্বনির দিক অনুসরণ করে উত্তীর্ণ হয়ে নীরবে দাঁড়িয়ে যায়। দেখে, টিলার অপর প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে চারটি ঘোড়া। চারজন মানুষও আছে সেখানে। সকলে সুদানী হাবশী। দৌড়ে পালাবার চেষ্টা করছে অপরূপ এক যুবতী। এক হাবশী ধরে ফেলে তাকে। দু বাহু দিয়ে জড়িয়ে ধরে তুলে আনে মেয়েটিকে। সঙ্গীদের মধ্যখানে দাঁড় করিয়ে তার সামনে হাটু গেড়ে বসে পড়ে লোকটি। দু হাত নিজের বুকে চেপে ধরে বলে তুমি পবিত্র মেয়ে। অযথা নিজেকে কষ্টে ফেলে আমাদের গোনাহগার করো না। অন্যথায় দেবতাদের রোষানল আমাদের পুড়ে ছারখার করে দেবে কিংবা পাথরে পরিণত করবে।
