প্রতিশোধ নিতে হবে অন্যভাবে। বর্তমানে দেশের জনসাধারণ আইউবীর পক্ষে। এভাবে সরাসরি প্রতিশোধ নিতে গেলে মানুষ আপনার বিরুদ্ধে ক্ষেপে ওঠবে। বললো রজব।
তবে কি আমাকে এই অপমান চোখ বুজে সহ্য করতে হবে? বললেন খলীফা।
না। আপনার অনুমতি ও সহযোগিতা পেলে আমি সালাহুদ্দীন আইউবীকে এমনভাবে গায়েব করে ফেলতে পারি, যেভাবে গুম করেছিলেন তিনি আমাদের প্রবীণ সালারদের। বললো রজব।
এ কাজ তুমি কীভাবে করবে? জিজ্ঞেস করেন খলীফা।
এ কাজ আমি হাশীশীদের দ্বারা করাবো। তবে তারা বিপুল অর্থ দাবি করছে। বললো রজব।
টাকা যতো প্রয়োজন আমি দেবো। তুমি আয়োজন সম্পন্ন করো। বললেন খলীফা।
***
দুদিন পর জুমার নামায। ঈসা এলাহকারী কায়রোর কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের খতীবকে বলে দিয়েছেন, যেন তিনি জুমার খুতবায় খলীফার নাম উল্লেখ না করেন।
তুরস্কের অধিবাসী এ খতীবের নাম ইতিহাসে উল্লেখিত হয়নি। সাধারণ্যে তিনি আমীরুল ওলামা” উপাধীতে প্রসিদ্ধ ছিলেন। তিনি নিজেও বেশ কবার খুতবা থেকে এ বিদআত তুলে দেয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। এক বর্ণনায় এমনও পাওয়া যায় যে, সালাহুদ্দীন আইউবী এ খতীবের-ই। পরামর্শে খুতবা থেকে খলীফার নাম তুলে দেয়ার নির্দেশ জারি করেছিলেন। তবে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর কথোপকথনের যে সব দলীল-দস্তাবেজ পাওয়া যায়, তাতে প্রমাণিত হয়, এ সাহসী পদক্ষেপের কৃতিত্বের দাবিদার তিনি-ই।
শুক্রবার দিন। খতীব আমীরুল ওলামা খুতবা পাঠ করলেন; কিন্তু খলীফার নাম উল্লেখ করলেন না। মসজিদের মধ্যম সারিতে উপবিষ্ট সুলতান আইউবী। খানিক দূরে অপর এক সারিতে বসা আছেন আলী বিন সুফিয়ান। জনগণের প্রতিক্রিয়া আন্দাজ করার জন্য জনতার মাঝে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসেছেন সুলতান আইউবীর অপরাপর উপদেষ্টামণ্ডলী ও বিশ্বস্ত কর্মকর্তাবৃন্দ। আলী বিন সুফিয়ানের বিপুলসংখ্যক গোয়েন্দা সদস্যও মসজিদে উপস্থিত। খুতবা থেকে খলীফার নাম মুছে ফেলা একটি শক্ত পদক্ষেপ-ই নয়, খেলাফতের আইনে গুরুতর অপরাধও বটে। সুলতান আইউবীর নির্দেশে সে অপরাধ-ই সংঘটিত হলো আজ। খলীফা আল-আজেদ ব্যতীত খেলাফতের বহু কর্মকর্তা সরাসরি প্রত্যক্ষ করলেন সে অপরাধ কম।
নামায শেষ হলো। মুসল্লীরা যার যার মতো চলে গেলো। উঠে দাঁড়ালেন সুলতান আইউবী। ধীরপায়ে এগিয়ে গেলেন খতীবের কাছে। সালাম মোসাফাহার পর বললেন–আল্লাহ আপনার সহায় হোন মহামান্য ইমাম!
খতীব আমীরুল ওলামা বললেন–এ নির্দেশ জারি করে আপনি জান্নাতে নিজের ঠিকানা করে নিলেন।
মসজিদ থেকে বেরুতে উদ্যত হন আইউবী। কয়েক পা অগ্রসর হয়ে হঠাৎ দাঁড়িয়ে যান। আবার খতীবের নিকট গিয়ে বললেন–খলীফার পক্ষ থেকে যদি আপনার ডাক আসে, তাহলে সরাসরি তার কাছে না গিয়ে আপনি আমার কাছে চলে আসবেন। আমি আপনাকে খলীফার নিকট নিয়ে যাবো।
মোহতারাম আমীরে মেসের! যদি গোস্তাখী মনে না করেন, আমি বলবো মিথ্যা ও শেরেকের বিরুদ্ধে কাজ করা ও সত্য বলা যদি অপরাধ হয়ে থাকে, তাহলে সে অপরাধের শাস্তি আমি একাই ভোগ করবো। এর জন্য আমি আপনাকে কষ্ট দিতে যাবো না। খলীফা যদি আমাকে তলব করেন, আমি একাই গিয়ে তার কাঠগড়ায় হাজির হবো। মূলত আপনার নির্দেশে নয়–আল্লাহর হুকুমে আমি খুতবা থেকে খলীফার নাম বাদ দিয়েছি। আল্লাহ আমার সহায় হোন। বললেন খতীব।
***
সন্ধ্যার পর।
আলী বিন সুফিয়ান, বাহাউদ্দীন শাদ্দাদ এবং উপদেষ্টামণ্ডলীর নিকট থেকে দিনের রিপোর্ট শুনছেন সালাহুদ্দীন আইউবী। আলী বিন সুফিয়ান ছদ্মবেশে শহরময় গুপ্তচর ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। নামাযের পর ঘুরে ঘুরে তারা সর্বসাধারণের প্রতিক্রিয়া সংগ্রহ করে। আলী বিন সুফিয়ান আইউবীকে জানান, এমন কোন সংবাদ পাওয়া যায়নি যে, কেউ স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে বলেছে, আজ খুতবায় খলীফার নাম নেয়া হয়নি। জনগণের মুখ থেকে কথা নেয়ার জন্য এক গোয়েন্দা কয়েক স্থানে এমনও বলেছে, জামে মসজিদের খতীব আজ জুমার খুতবায় খলীফার নাম উচ্চারণ করেননি; কাজটা বোধ হয় তিনি ভাল করলেন না। প্রত্যুত্তরে অনেকে এমন ভাব প্রকাশ করেছে, যেন খুতবায় আজ খলীফার নাম উচ্চারণ করা হলো কিনা, তা তারা বলতেই পারে না। যেন খলীফার নাম উল্লেখ করা না করা তাদের নিকট তেমন কোন ঘটনা-ই নয়। বেশ কজন মানুষ এমনও প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে, এতে কি আর আসে যায়! খলীফা আল্লাহ-রাসূল তো আর নন! এসব রিপোর্টে সুলতান আইউবী আশ্বস্ত হন যে, তাকে জনগণের যে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা দেখানো হয়েছিলো, বাস্তবে কোথাও তার প্রতিফলন ঘটেনি।
সে বৈঠকেই সুলতান আইউবী নুরুদ্দীন জঙ্গীর নামে পয়গাম লিখেন। তাতে তিনি লিখেন–জুমার খুতবা থেকে আমি খলীফার নাম তুলে দিয়েছি। জনসাধারণের পক্ষ থেকে অনুকূল প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। আপনিও. খুতবা থেকে কেন্দ্রীয় খেলাফতের আলোচনা তুলে দিন।
এ মর্মে দীর্ঘ এক পত্র লিখে সুলতান আইউবী নির্দেশ জারি করেন, আগামীকাল সকাল সকাল দূতকে রওনা করাও। তারপর আলী বিন সুফিয়ানকে বললেন, খলীফার মহলে গুপ্তচরদের আরো সতর্ক থাকতে বলুন। সেখানে সামান্যতম সন্দেহজনক আচরণ দেখা মাত্র যেন সঙ্গে সঙ্গে তারা আমাদেরকে অবহিত করে।
