তুমি ঠিকই বলছো রজব! এ ব্যাপারে আমাকে কিছু-ই জিজ্ঞাসা করা হয়নি। আর ওদিক থেকে আসা বাহিনীটিকে তত ফেরতও পাঠান হয়নি! বললেন খলীফা ।
ফেরত এ জন্যে দেয়া হয়নি যে, তাদের পাঠানোই হয়েছিলো মিসরে আইউবীর হাতকে শক্ত করার জন্য। মিসরের পুরাতন বাহিনীকে কিষাণ আর ভিখারীতে পরিণত করার জন্য নুরুদ্দীন জঙ্গী এ বাহিনী প্রেরণ করেছেন। নাজি, ঈদরৌস, ককেশ, আবদে ইয়াদান, আবু আজর এবং এদের ন্যায় আরো আটজন সালার এখন কোথায়? হুজুর হয়তো কখনো ভেবে দেখেননি, এদের প্রত্যেককে সালাহুদ্দীন আইউবী গুপ্তভাবে খুন করিয়েছে। তাদের একটি মাত্র অপরাধ ছিলো, তারা ছিলেন রণনায়ক হিসেবে আইউবী অপেক্ষা যোগ্য। আইউবী প্রচার করেছেন, গাদ্দারী ও বিদ্রোহের অপরাধে খলীফা তাদের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। বললো রজব।
মিথ্যে–নির্জলা মিথ্যে। সালাহুদ্দীন আমাকে বলেছিলো ঠিক যে, এরা বিশ্বাসঘাতক। আমি তাকে বলেছিলাম, সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করো, আদালতে মোকদ্দমা দায়ের করো। ঝাঝালো কণ্ঠে বললেন খলীফা।
আর মোকদ্দমা না চালিয়ে তিনি নিজেই সেই রায় প্রদান করেন, খেলাফতের মোহর ছাড়া যার কোন কার্যকারিতা নেই। ঐ হতভাগা সালারদের অপরাধ ছিলো, তারা খৃষ্টান সম্রাটদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিলো খৃষ্টানদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে দেশ ও দশের কল্যাণে আত্মনিয়োগ করা। বললে হয়তো আপনি বিশ্বাস করবেন না; কিন্তু বাস্তব সত্য হলো, খৃষ্টানরা আমাদেরকে শত্রু মনে করে না। নুরুদ্দীন জঙ্গী আর শেরকোহর আক্রমণ-আশঙ্কায়-ই কেবল তারা আমাদের বিরুদ্ধে সামরিক প্রস্তুতি নিয়ে আছে। এখন শেরকোহ নেই ঠিক, কিন্তু তার স্থান দখল করেছে সালাহুদ্দীন আইউবী। এ লোকটি মূলত শেরকোহর-ই হাতে গড়া। শেরকোহ তার সারাটা জীবন খৃষ্টানদের সঙ্গে লড়াই করে, ইসলামের দুশমন সৃষ্টি এবং দুশমনের সংখ্যাই শুধু বৃদ্ধি করেছে। সালাহুদ্দীনের স্থলে অন্য কেউ যদি মিসরের গভর্নর হতো, তাহলে খৃষ্টান সম্রাটগণ আজ আপনার দরবারে বন্ধুরূপে আগমন করতেন। হত্যা-লুণ্ঠন হতো না, আমাদেরকে এতগুলো প্রবীণ ও সুদক্ষ সেনানায়ক হারাতে হতো না। বললো রজব।
কিন্তু রজব! খৃষ্টানরা যে রোম উপসাগর থেকে আক্রমণ করলো? বললেন খলীফা।
এর জন্যেও আইউবী-ই দায়ী। তিনি-ই এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিলেন, যা প্রতিহত করার জন্যে খৃষ্টানরা আক্রমণ করতে বাধ্য হয়েছিলো। সমস্যা যেহেতু তার-ই সৃষ্টি, তাই আক্রমণ যে হবে, তা পূর্ব থেকেই তার জানা ছিলো। সেজন্য তিনি আগাম প্রতিরোধ ব্যবস্থাও করে রেখেছিলেন। অন্যথায় তিনি কি করে জানলেন যে, রোম উপসাগর থেকে খৃষ্টানরা আক্রমণ করবে? তিনি তো অন্তর্যামী নন! এটি ছিলো তার সাজানো নাটক, যে খেলায় এতীম হলো হাজার হাজার শিশু, বিধবা হলো অসংখ্য নারী। আর তার এ কাজে আমার উপস্থিতিতে আপনি তাকে বাহবা দিয়েছিলেন। তারপর তিনি সুদানী ফৌজকে যারা ছিলো আপনার একান্ত অনুগত–সামরিক মহড়ার নাম করে রাতের বেলা বাইরে নিয়ে যান এবং অন্ধকারে তাদের উপর তার নতুন বাহিনীকে লেলিয়ে দেন। পরে প্রচার করেন যে, নাজির ফৌজ বিদ্রোহ করেছিলো; তাই তাদের এই পরিণতি বরণ করতে হয়। আপনি এতো সরল-সহজ মানুষ যে, আইউবীর এই চাল আর প্রতারণা বুঝে উঠতে পারলেন না! বললো রজব।
উম্মে আরারাহ খলীফার বুকে মাথা রেখে এমন কিছু অশ্লীল আচরণ করে যে, খলীফার তীব্র মদের নেশা জেগে ওঠে। খলীফা এখন মেয়েটির হাতের খেলনা। রজবের কোন কথা-ই যেন শুনতে পাচ্ছেন না তিনি। রূপসী কন্যা উম্মে আরারাকে নিয়েই ঘুরপাক খাচ্ছে খলীফার সব ভাবনা।
এই ফাঁকে সালাহুদ্দীন আইউবীর প্রতি নিতান্ত অমূলক আরেকটি আঘাত হানে রজব। বলে–আইউবী আরো একটি প্রতারণামূলক আচরণ শুরু করেছেন। সুন্দরী যুবতী মেয়েদের ধরে এনে তিনি তাদের উপভোগ করেন। কয়েকদিন আমোদ-ফুর্তি করে এই বলে তাদের খুন করান যে, এরা খৃষ্টানদের গুপ্তচর। দেশবাসীর মনে খৃষ্টানদের বিরুদ্ধে ঘৃণা সৃষ্টি করার জন্য তিনি সেনাবাহিনী ও জনগণের মধ্যে প্রোপাগাণ্ডা ছড়িয়ে রেখেছেন, খৃষ্টানরা গুপ্তচরবৃত্তির জন্য তাদের মেয়েদেরকে মিসর প্রেরণ করেছে। খৃষ্টানরা কুলটা নারীদের লেলিয়ে দিয়ে এই জাতির চরিত্র নষ্ট করছে। আমি তো এদেশের-ই নাগরিক। দেশে কী ঘটছে সবই আমার জানা। দেশের পতিতালয়গুলোতে যারা বেশ্যাবৃত্তি করছে, তারা মিসর ও সুদানী নারী। দু চারজন খৃষ্টান থাকলেও তারা, গুপ্তচর নয়, এটা তাদের পেশা।
হেরেমের তিন-চারটি মেয়েও আমাকে জানিয়েছে, সালাহুদ্দীন আইউবী ডেকে নিয়ে তাদের সম্ভ্রমহানি করেছে। বললো উম্মে আরারাহ।
শুনে তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠেন খলীফা। বললেন–আমার হেরেমের মেয়েঃ তুমি এতোদিন আমাকে বলেনি কেন?
বলিনি তার কারণ, এই অসুস্থ অবস্থায় আপনি সে দুঃসংবাদ সহ্য করতে পারতেন না। এখন আমার অলক্ষ্যে কথাটা মুখ থেকে ফসকে বেরিয়ে গেলো। হেরেমে আমি এমন ব্যবস্থা করে রেখেছি যে, এখন আর কোন মেয়ে কারো আহ্বানে মনে চাইলে-ই বাইরে যেতে পারবে না। জবাব দেয় উম্মে আরারাহ।
এক্ষুনি ডেকে এনে ওকে আমি বেত্রাঘাত করবো। আমি এর প্রতিশোধ নেবো! বললেন খলীফা।
