খলীফাতুল মুসলিমীন! আপনি বড় কোমল-হৃদয় ও মহৎ মানুষ। সে কারণেই সালাহুদ্দীন আইউবী এমন গোস্তাখী করতে পারলো। আপনি ভুলে গেছেন, সালাহুদ্দীন আরব বংশোদ্ভুত লোক নয়, আপনার বংশের লোক নয়। সে কুর্দী। আমি ভেবে অবাক হই, এতো বড় স্পর্ধা তাকে কে দিলো! তার গুণ তো শুধু এটুকুই যে, লোকটা একজন দক্ষ সৈনিক; রণাঙ্গনের শাহ্সাওয়ার। লড়তেও জানে, লড়াতেও জানে। কিন্তু এই গুণ এতো গুরুত্বপূর্ণ নয় যে, মিসরের গভর্নরী। তার হাতে তুলে দিতে হবে! সুদানের এতো বিশাল, এতো সুদক্ষ বাহিনীটিকে এমনভাবে ধ্বংস করে দিলো, যেভাবে শিশুরা তাদের হাতের খেলনা ভেঙ্গে নষ্ট করে দেয়। মহামান্য খলীফা! আপনি একটু চিন্তা করুন, এখানে যখন সুদানী সেনারা ছিলো, নাজি এবং ঈদরৌসের ন্যায় সালারগণ ছিলো, তখন মানুষ আপনার কুকুরের সামনেও মাথা নত করতো। সুদানী বাহিনীর সালার আপনার নির্দেশের অপেক্ষায় আপনার দ্বারে সারাক্ষণ করজোড়ে দাঁড়িয়ে থাকতো। আর এখন? এখন ডেকে পাঠালে একজন অধীন পর্যন্ত আপনার আহ্বান মুখের উপর প্রত্যাখ্যান করে। বললো রজব।
রজব! সব দোষ তোমার। হঠাৎ গর্জে উঠে বললেন খলীফা।
অকস্মাৎ পাংশু হয়ে যায় রজবের মুখ। ভয়ার্ত বিস্ফারিত নয়নে তাকিয়ে থাকে খলীফার প্রতি। খলীফার বন্ধন ছাড়িয়ে চকিতে সরে পড়ে উম্মে আরারাহ। খলীফা পুনরায় তাকে কাছে টেনে পূর্বাপেক্ষা অধিক শক্ত করে জড়িয়ে ধরে চিবুক টিপে সস্নেহে বলেন–কী, ভয় পেয়েছো বুঝি? আমি রজবকে বলতে চাচ্ছি, আজ দু বছর পর সে আমার কানে দিচ্ছে, আমার পুরনো বাহিনী ও তার সালার ভালো ছিলো; সালাহুদ্দীনের তৈরি বাহিনী খেলাফতের পক্ষে কল্যাণকর নয়! কেন রজব! একথা কি তুমি আগেও জানতে? জানলে বললে না কেন? আজ যখন মিসরের গভর্নর তার খুঁটি শক্ত করে ফেলেছে, এখন কিনা তুমি আমাকে বলছো, সে খেলাফতের অবাধ্য!
বিষয়টা আমি পূর্ব থকে-ই জানতাম। কিন্তু হুজুরের তিরস্কারের ভয়ে কখনো বলিনি। সুলতান আইউবীকে নির্বাচন করেছে বাগদাদের খেলাফত। আমি ভেবেছিলাম, কাজটা আপনার পরামর্শেই হয়ে থাকবে। খেলাফতের মনোনয়নের বিরুদ্ধে মুখ খোলার দুঃসাহস আমি দেখাতে পারি না। আজ আমীরে মেসেরের গোস্তাখী আর আপনার মনোকষ্ট আমাকে মুখ খুলতে বাধ্য করেছে। এর আগেও একাধিকবার আমি সালাহুদ্দীন আইউবীকে হুজুরের সঙ্গে গোস্তাখী করতে দেখেছি। বিপদ সম্পর্কে আপনাকে অবহিত করা আমি আমার কর্তব্য মনে করি। বললো রজব।
খলীফার বাহুবন্ধনে আবদ্ধ উম্মে আরারাহ খলীফার হাতের আঙ্গুলে আঙ্গুল ঢুকিয়ে শিশুর ন্যায় খেলছে। এবার দু হাতে খলীফার চিবুক স্পর্শ করে জিজ্ঞেস করে মনটা এবার ঠিক হয়েছে?
খলীফা তার চিবুক টেনে দিয়ে পুলকভরা কণ্ঠে বললেন–ঔষধ-পথ্যে ততোটা কাজ হয় না, যতটুকু কাজ হয় তোমার ভালোবাসায়। আল্লাহ তোমাকে যে রূপ দিয়েছেন, তা-ই আমার সব রোগের মহৌষধ। খলীফা উম্মে আরারার মাথা নিজের বুকের উপর রেখে রজবকে বললেন–কিয়ামতের দিন যখন আমাকে জান্নাতে প্রেরণ করা হবে, তখন আমি আল্লাহকে বলবো, আমি হুর চাই না–আমার উম্মে আরারাকে এনে দাও।
উম্মে আরারাহ শুধু রূপসী-ই নয়–বড় বিচক্ষণও বটে। হুজুরের হেরেম ষড়যন্ত্রের আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছিলো। উম্মে আরারাহ এসে সব কুচক্রীর মুখে ঠুলি পরিয়েছে। এখন আপনার কসরে খেলাফতে আপনার স্বার্থ বিরোধী কোন আচরণ করার সাধ্য কারও নেই। বললো রজব।
উম্মে আরারার প্রেম-পরশে নিজেকে হারিয়ে ফেলছেন খলীফা। নিশ্চল মূর্তির মতো উদাস বসে আছেন তিনি। রজবের এইসব কথার একটি শব্দও যেন কানে গেলো না তার। তাঁর চৈতন্য ফিরিয়ে আনবার চেষ্টা করে উম্মে আরারাহ। বলে–রজব সালাহুদ্দীন আইউবীর প্রসঙ্গে কথা বলছিলো। আপনি মনোযোগ সহকারে তার বক্তব্য শুনুন এবং আইউবীকে বাগে আনার চেষ্টা করুন।
সম্বিৎ ফিরে পান খলীফা। বলেন–এ্যা, কি যেন বলছিলে রজর।
বলছিলাম, আমি এ কারণে এতদিন মুখ বন্ধ রেখেছি যে, আমীরে মেসেরের বিরুদ্ধে কথা বললে আপনি তা মেনে নেবেন না। আর যা হোক, সালাহুদ্দীন আইউবী একজন দক্ষ সেনানায়ক তো বটে! বললো রজব।
সালাহুদ্দীন আইউবীর এই একটি গুণই আমার নিকট পছন্দনীয় যে, যুদ্ধের ময়দানে সে ইসলামের পতাকাকে পদানত হতে দেয় না। তার মত সেনানায়কদের-ই আমার বড় প্রয়োজন, যারা রণাঙ্গনে খেলাফতে ইসলামিয়ার মর্যাদাকে সমুন্নত রাখে। বললেন খলীফা।
গোস্তাখী মাফ করবেন খলীফাতুল মুসলিমীন! সালাহুদ্দীন আইউবী খেলাফতে ইসলামিয়ার মর্যাদার জন্য লড়াই করে না, লড়াই করে নিজের মর্যাদা সুপ্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে। আপনি ফৌজের সালার থেকে নিয়ে একজন সাধারণ সিপাহীকে জিজ্ঞেস করে দেখুন; সালাহুদ্দীন আইউবী তাদের এই দীক্ষা প্রদান করেছে যে, লড়াই করে এমন একটি ইসলামী সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত করবে, যার কোন সীমা-পরিসীমা থাকবে না। এতে পরিষ্কার বুঝা যায়, সে এমন একটি সাম্রাজ্যের স্বপ্ন দেখছে, যার সম্রাট হবে সে নিজে। তার পৃষ্ঠপোষকতা করছেন নুরুদ্দীন জুঙ্গী। আইউবীর হাতকে শক্তিশালী করার জন্য তিনি দু হাজার অশ্বারোহী এবং সমসংখ্যক পদাতিক বাহিনী প্রেরণ করেছেন। আপনি-ই বলুন, তিনি কি এ সৈন্য মিসরের খলীফার অনুমতি নিয়ে প্রেরণ করেছেন? খেলাফতের কোন দূত কি আপনার নিকট পরামর্শ নিতে এসেছিলো যে, মিসরে অতিরিক্ত সৈন্যের প্রয়োজন আছে কি-না? যা কিছু হয়েছে, খেলাফতকে উপেক্ষা করেই হয়েছে। বললো রজব।
